বিকাশ এইবার লেপটা উলটে আরতির মুখটা বের করল। শব্দটা বেশস্পষ্ট আর সুরেলা হল— ঊরে, ঊরে। দু-হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে ‘দ’-আরতি আর্তনাদ করছে। বিকাশ হাত দিয়ে বস্তুটিকে সোজা করল। নীল আলোয় মুখের যন্ত্রণা স্পষ্ট, চোখে জল। কী হল কী? অ্যাাঁ, কী হল? বলবে তো কী হল?
দাঁত, উরে বাবারে দাঁত।
দাঁত আবার কী হল?
ভীষণ যন্ত্রণা।
পাশ ফিরে শোও। কিছুক্ষণ দমবন্ধ করে রাখো, কমে যাবে। মাঝরাতে দাঁতের যন্ত্রণায় এর চেয়ে ভালো দাওয়াই বিকাশের জানা ছিল না।
পাশ ফিরে শুলে কী হবে গোঁ! কী গোঁ গোঁ করছ তখন থেকে। ভূতে ধরল নাকি! বিকাশ বিরক্তিটা ঠিক চেপে রাখতে পারল না। বেশ নরম গরম বিছানায় দিব্যি ঘুম দিচ্ছিল, কোনও ভালো স্বপ্নও হয়তো দেখছিল। আরতির আবার রাগ আর অভিমান দুটোই বেশি, প্রকাশ চোখের জলে। অস্বাভাবিক মুখের ধরনে। বেশ তোলো হাঁড়ির মতো মুখ হলেই বুঝতে পারে বিকাশ খেপী খেপেছে। ছেলেবেলায় আরতির আদুরে ডাকনাম ছিল খেপী। বিয়ের পর বিকাশ অন্যান্য লুক্কায়িত তথ্যের সঙ্গে এটা জেনেছে। বিকাশের খোঁচা খেয়ে, আরতি ঘুরে বিকাশের দিকে পিছন ফিরে শুলো। চোখে দাঁতের যন্ত্রণায় জলের সঙ্গে অভিমানের ডোজ যুক্ত হল। বিকাশ বুঝতে পারে না বিপদে পড়েও মানুষ কী করে রাগতে পারে! বিপদের প্ল্যাটফর্ম হল বন্ধুত্বের, সমর্পণের, হাত মেলাবার। বিকাশ বালিশে আধশোয়া হয়ে বললে, একেই তুমি রাগপ্রধান, এখন দাঁতের ব্যথায় একেবারে কালোয়াতি। যখন সাবধান করেছিলুম তখন শোনোনি কেন? এখন মরো। লেপের ভিতর থেকে উত্তর এল, কী সাবধান করেছিলে? উঁহুহু। সরি।
প্রথম হল চিনি চায়ে সাধারণ মানুষ ক’চামচ চিনি খায়? ম্যাক্সিমাম দু-চামচ। তুমি! তিনে গিয়েও তোমার থামতে আপত্তি, চার হলেই ভালো হয়। ভাবছ আমাকে বাঁশ দিচ্ছ, আজ্ঞে না, নিজেকেই নিজে দিচ্ছ বাঁশ। আমার কী হবে? কাঁচকলা! খাও না মাসে বিশ কিলো চিনি খাও। যতদিন। চাকরি আছে দিয়ে যাব, সেভিংস নিল! চোখ বুজলেই হাতে হ্যারিকেন! চিনি, চকোলেট, রসগোল্লা, সন্দেশদাঁতের যম। এখন সামলাও ঠ্যালা।।
বিকাশদম নেবার জন্যে থামল। যদিও ভীষণ যন্ত্রণা তবু আরতি চিনির খোঁটার উত্তর না দিয়ে পারল না।
—বিশ কিলো করছ। গতমাসে ওঁরে বাবারে, রেশন ছাড়া দশ কিলো বাড়তি এসেছে, তা-ও এক কিলোমনুর মার কার্ড থেকে ম্যানেজ করেছি। উঁহুহু।
–দশ কিলো চিনির দাম জানো? দু-কিলো চায়ের দাম জানো? একটা বড় কফির দাম জানো? শালা গৌরী সেন রে? ভেবে ভেবে চুল পেকে গেল। জানার মধ্যে জানো, ড্রেস সার্কেল, ব্যালকনি, স্টল।
—ঠিক আছে, দিনে দুবার চা খেতুম, কাল থেকে তাও খাব না। পারি নিজে রোজগার করে খাব।
—মাসে পকেট মেরে রোজগার তো কম হয় না!
—শেষে মাসে তো সবই হাতিয়ে নাও। চিনি, চিনি, চিনি, নিজে তো দিনে বারদশেক চায়েতে কফিতে খাও। তাও একে রামে রক্ষে নেই দোসর লক্ষ্মণ। বন্ধুবান্ধবের তো অভাব নেই। তারপর রোজ চাটনি।
—চাটনির জন্যে বড়বাজার থেকে ভেলি এনে দিই পাঁচ কিলো, চাটনিতে চিনি ঢোকাচ্ছ কি? আর নিজের বন্ধুদের কথা ভুলছ কী করে? রামের মা, রমাদি, ভুলো, কল্যাণী, বাপের বাড়ি। তারা ন’মাসে-ছ’মাসে আসে, এর উপর চুরি আছে।
—চুরি! বিকাশ শুয়ে পড়েছিল, আবার আধশোয়া হল। চুরি-টুরি, মিথ্যে কথা, ধাপ্পাবাজি এসব সহ্য করতে পারে না। পৈতৃক গুণ। বিকাশ বললে, মনুর মা’র কাল সকালেই ডিসচার্জ। শেষ মাস। হাতে টাকা নেই। যেখানে থেকে পারি ধারধোর করে এক মাসের মাইনে নাকের ডগায় ছুড়ে দিয়ে গেট আউট, তোমার অসুবিধে হয় যতদিন না লোক পাচ্ছি নিজে বাসন মাজব।
—ঊঁরে বাবারে? পুরোটা না শুনেই উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে। মনুর মা তোমার মার আমলের লোক, সে সব থাকতে চিনি চুরি করতে যাবে কোন আককেলে? চোর তোমার ছেলে আর মেয়ে। সারাদিন মুঠো মুঠো চিনি ধ্বংস করে।
বিকাশ সোজা উঠে বসল গ্যাঁট হয়ে। বড় বড় মাথার চুল খামচে ধরে কিছুক্ষণ এমনভাবে বসে রইল যেন বজ্রাঘাত হয়েছে। মুখে ছি-ছি শব্দ। ছি-ছি ছি, ছি, তুমি তো আগে কখনো বলোনি। চোর, চুরি! এত খাচ্ছে, তবু চুরি, ইস ইস! এই নীচতার তো একটা ব্যবস্থা করতে হয়। ইমিডিয়েটলি একটা ব্যবস্থা করতে হয়। বিকাশ কোল থেকে লেপটা ফেলে দিল।
কী ব্যবস্থা তুমি করবে! এই রাত আড়াইটের সময়? ধরে ঠ্যাঙাবে?
ঠ্যাঙাঠেঙি আমার কোষ্ঠীতে নেই, বুঝলে। ওসব মধ্যযুগের জিনিস, আধুনিক কালে অচল, আমার হল অন্য টেকনিক। সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট। একমাস আর কিছুনা, স্রেফ চিনি খাইয়ে যাব মুঠো মুঠো কিলো কিলো।
আরতি যন্ত্রণায় আর একবার কুঁই কুঁই করে উঠে বলল—দাও না। যদি তোমার কাছে কোনও বড়ি-মড়ি থাকে।
—থাকলেও দেব না। কথায় কথায় তোমার বাড়। আট প্রহর হরিনাম সংকীর্তনের মতো, তোমার মাথা ধরা, না হয় বুক ধড়পড়, না হয় পেটে ব্যথা, এখন গোদের ওপর বিষফোঁড়া দাঁতের যন্ত্রণা! শরীর নিয়ে ইয়ারকি! গোটা গোটা সুপুরি খাবার সময়ে মনে ছিল না, কাঠ খেলেই আঙরা দাস্ত হয়।
—বাগানে এতগুলো সুপুরি গাছ, আমি না খেলে খাবেটা কে?
—গাছগুলো বেড়া দেবার পারপাসে পূর্বপুরুষেরা করেছিলেন। তোমার সুপুরি বিলাসের জন্য করা হয়নি। বেশি সুপুরি খেলে কী হয় জানা আছে? দাঁত যায়, কিডনিতে স্টোন হয়, ক্যানসার হয়। ইমপোটেন্ট হয়ে যায়।
