আহা শুধু লেপ গায়ে দেওয়া যায় নাকি, খারাপ হয়ে যাবে না!
দিনচারেকে কী আর উনিশ-বিশ হবে। খালে ঢোকালেই কি যৌবন ফিরে আসবে!
এমন লেপ পাচ্ছ কোথা, বাবা একটা সেরা জিনিস দিয়ে গেছেন। যেমন গরম, তেমনই নরম, তেমনি বিশাল। ছেলে, মেয়ে, স্বামী প্লাস একটা পাশবালিশ তোফা তলিয়ে যাবে।
আলো নিভিয়ে সে-রাতের মতো সেরা লেপের ধূসর লাল জগতে তলিয়ে যেতে যেতে বিকাশ যে কথাটা ভেবেই ছিল, সোচ্চারে বলতে পারেনি, তা হল, শ্বশুরমশাই সেরা দুটি বাঁশ তাঁর ঝাড় থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন, একটি লেপ আর সেই লেপের তলায় ঢোকার সঙ্গী লেপাক্ষি আরতি। লেপটা অবশ্যই বড়, আশাতীত বড়, লেপ যিনি দিয়েছিলেন তাঁর হৃদয় তাঁরই মেয়ের হৃদয়ের চেয়ে বড়। প্রথম বিয়ের হুটোপাটির তিন মাসে বিকাশ মনে মনে লেপটার প্রশংসা না করে। পারেনি। বেড়ে ফ্যামিলি সাইজ। নতুন বিছানায় ঔরাঙ্গবাদের রেশমি চাদরে দুটো পিচ্ছিল প্রাণী যখন মাছের মতো কিলবিল করত, গড়ের মাঠের মতো বিশাল লেপ তখন বিশ্বাসঘাতকতা করে বাইরের শীতলতায় কোনওদিন তাদের ফাঁস করে দেয়নি। একটি সন্তানের আগমন এবং তার বোধবুদ্ধি হবার পরও লেপ তার অন্তরালে মাঝে মাঝে একটু বেশি কাছাকাছি, একটু বেশি সাহসী হবার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন এই মধ্যবয়েসে সংসার যখন সব নির্য্যাস নিংড়ে নিয়েছে, শরীর যখন সব বাষ্প মোচন করে বাতিল বয়লার হয়ে গেছে, তখন এ লেপ বাঁশ ছাড়া আর কী! মনে তো এখন গুনগুন গান, কম্বলবন্ত, কৌপিনমন্ত; খলু ভাগ্যবন্ত। এই লেপ রোজ সকালে তাকেই তো পাট করে ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখতে হয়। সেই সময় নড়া ছিঁড়ে যাবার উপক্রম। ঘাড়ে করে ছাদে রোদ খাওয়াতে তোলার সময় মালুম হয় সংসারের ভার, একটি স্ত্রীলোককে বহনের ভার। গ্রীষ্মে সিলিং থেকে দোলানো জাফরি কাঠের পাটাতনে ঝোলাতে গিয়ে টাল খেতে হয়। তারপর বৎসরান্তে শীত যখন জানলার কাচে নাক রেখে ধোঁয়াটে নিঃশ্বাস ছাড়ে তখন আবার চেয়ারের ওপর টুল রেখে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে সেই লেপ নামাতে হয়। প্রথমে নামে লেপ, সঙ্গে সঙ্গে নামে ধুলো, মানে বড় মাকড়সা, নেংটি ইঁদুর, তেলাপোকা।
নতুন ওয়াড়ের গন্ধ শুঁকতে সেই লেপের তলায় প্রথমে ঢুকছে বিকাশ। পাশে এসে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়েছে আরতি। সারা বছর একটাই তার শোওয়ার ধরন। বিকাশ চিরকালই বুকে হাত দুটো ভাঁজ করে রেখে চিত হয়ে শোয়। জাগ্রত অবস্থায় ঠোঁট দুটো বোজানো থাকে। ঘুমোলে শরীর যেই আলগা হয়, নীচের ঠোঁটটা বাজে কাঠের জানলার মতো অল্প একটু বেকে ফাঁক-দাঁত হয়ে যায়। তারপর যতই সে ঘুমের ঘোরে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে থাকে ততই সেই ছুঁচো ফাঁক মুখ দিয়ে শিসের মতো এক ধরনের হিস-হিস শব্দ বেরোতে থাকে। দুজনের এই দু-ধরনের শোয়া নিয়ে মাঝে দিনকতক দুজনের মধ্যে দক্ষযজ্ঞ হয়েছে। আরতির ঘুম পাতলা। ভাঙা বাটির ফাটলে হাওয়ার শব্দের মতো বিকাশের ঘুমন্ত সাইরেনে ঘুমোতে না পেরে আরতি বিকাশকে ঠ্যালা মেরে জাগিয়ে দিয়ে প্রথম প্রথম অনুরোধ করেছে—পাশ ফিরে শোও। অনুরোধ যখন বিফল হয়েছে তখন বালিশ নিয়ে মেঝেতে নেমে শোবার ভয় দেখিয়েছে। অবশ্য নেমে শোয়নি কখনও। মেঝেতে বড় রিপু ভয়—ইঁদুর, আরশোলা, বিছে। বিকাশ আবার ‘দ’ হয়ে শোয়া পছন্দ করে না। এইভাবে যারা শোয় তাদের চরিত্র ভয়প্রবণ। মনে মনে তারা অসহায়, অবলম্বন খুঁজছে। অবলম্বন হিসেবে বিকাশ তো পাশেই রয়েছে, তবে কেন ‘দ’ হয়ে শোয়া? তার মানে বিকাশের। ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয় সে। তা ছাড়া শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। সোজা হয়ে শোও। আরতি আদেশ মান্য করার চেষ্টা করেছে। চিত হয়ে শুয়েছে। তারপর ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শুয়ে আবার যে কে সেই। ঘুমন্ত আরতির দুটো পা টেনে সোজা করতে গিয়ে বিকাশ অবাক হয়ে গেছে —দারা সিং-এর কাঁকড়া প্যাঁচ। টেনে খোলা যায় না। হিস্টিরিয়া রোগীও দাঁতি লাগা চোয়ালে। অবশেষে দুজনেই দুজনকে মেনে নিয়েছে। জাগরণের ইস্টিশান না পৌঁছোনো পর্যন্ত বিকাশের ইঞ্জিন স্টিম ছাড়বে। কটাস করে আরতির পায়ের খিল খুলবে না।
দূরে রাস্তার বাঁকে শীতের রাতের কুকুর ঝাপসা কুয়াশার ভূত দেখে কাঁদছে। দেয়াল ঘড়ির পেন্ডুলাম ঘরের বাইরের প্যাসেজে হাইহিল জুতো পরে পায়চারি করছে। বিকাশের মুখ দিয়ে হাওয়া শিসের শব্দে অক্সিজেন কার্বন ডাই অক্সাইড আদান-প্রদান করছে। আরতি হাঁটু দিয়ে। নিজের হজম যন্ত্র চেপে বদহজমের সাধনা করছে। কোথাও কোনও গোলমাল নেই। ছেলে আর মেয়ে আলাদা ঘরে বেহুশ। খাবার ঘরের মিটসেফে ইঁদুর পাঁপড় চিবোচ্ছে। বাথরুমের কলে। টিনের বালতিতে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির উত্তরের জানলার ভাঙা কাচ দিয়ে অন্ধকারের সঙ্গে আলো আর সাদা কুয়াশার মিশেল তৈরি হচ্ছে।
বিকাশের ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। এক ঘুমে রাত কাবার করার মতো পরিশ্রম সে এখনও করে। কোথায় যেন একটা বেড়াল ডাকছে ম্যাও, ম্যাও করে। না, পাশাপাশি কোনও বাড়িতে নবজাতক শীতে ওঁয়া ওঁয়া করছে। না, দূরে নয়তো! ঘরে ঘরে বেড়াল! ঢুকল কী করে? জানলা-দরজা সবই তো বন্ধ! মনে হচ্ছে বিছানায়! লেপের তলায়! কে রে! বিকাশ কান খাড়া করে শুনল। তার ডান পাশে লেপের মাথাটা জড়িয়ে গোল আর সেই গোল বস্তুটির তলা থেকে শব্দটা আসছে—ঊরে বাবারে! ঊরে ঊরে ঊ উ। বিকাশ গোটানো লেপটাকে আরতির মাথার তলা থেকে টেনে সোজা করল। লেপের সঙ্গে কিছু উসকো চুল লেপের বাইরে বেরিয়ে এল।
