চারদিক অন্ধকার। সার সার আলো জ্বলে উঠছে বাড়িতে বাড়িতে। ঠুস ঠাস, ধুম ধাম—পটকা ফাটছে। মাইকে মাইকে গানের শোরগোল। পাঁচুদা বলছেন, যাক বাবা, মাঠে গিয়ে পড়েছে তবু রক্ষে! আর ঠিক সেইসময় মাঠের দিকে বাড়ির আড়ালে ধপ করে একটা আগুন লাফিয়ে উঠল। মাঠের ওপাশে চিৎকার উঠল—আগুন, আগুন! আমরা ভয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে বসে রইলুম। পুলিশ-কেস হতে পারে, জেল হতে পারে, ধোলাই হতে পারে। অল্প কিছু সময় পরেই দমকলের ঘণ্টা শোনা গেল।
রাত দশটা নাগাদ ছাগলের গলার দড়ি ধরে বগলে একটা পুঁটুলি নিয়ে মানদামাসি আমাদের বাড়িতে এলেন। ফানুস মাঠ পেরিয়ে তাঁর শুকনো খড়ের চালে ল্যান্ড করেছিল। তাঁর জিনিস তাঁরই কাছে ফিরে এসেছিল রাগে আগুন হয়ে। যে ফানুস উড়ল না, সে ফানুসের দাম সাতশো টাকা। মানদামাসির নতুন খড়ে-ছাওয়া বাড়ি করিয়ে দিলেন কাকাবাবু। আমাদের বললেন, ঘাবড়াও মাত। আসচে বার আমি খোল তৈরি করব। এক্সপেরিমেন্ট ইজ লাইফ!
বত্রিশ পাটি দাঁত – সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
চোদ্দো বছরের পুরোনো দম্পতি শুয়ে আছে চোদ্দো বছরের পুরোনো খাটে, চোদ্দো বছরের পুরোনো বিছানায়, ঢাউস একটা লেপ গায়ে দিয়ে। লেপের অন্তঃকরণটি প্রাচীন, বাইরের খোলাটি নবীন, মার্কিন। খুব কম পাওয়ারের নীল একটা আলো পায়ের দিকে দেয়ালের গায়ে জ্বলছে। ক্রিম রঙের দেয়ালের গা বেয়ে সবুজ ধারায় গড়িয়ে এসে একটা ফোটোর কিনারায় আটকে গেছে। তলার দিকে গভীর একটা ছায়া! ছায়া ফেলেছে ওই নিদ্রিত দম্পতি। রাগ রাগ মুখ করে ডান পাশে বিকাশ, বাঁ-পাশে অল্প একটু ঘোমটা টেনে আরতি। আরতির মুখে ঠিক হাসি নয়, হাসির ওয়ারে চাপা বিজয়িনীর মুখ। ফোটোগ্রাফার, বিকাশের বুকের একপাশে আরতির কাঁধটা লেপটে দিয়ে অন্তত ওই ছবিটা যতদিন না ধূসর হয় ততদিন এই প্রমাণ রেখে গেছেন—তোমরা দুজনে দুজনের কাছের মানুষ। কাছাকাছি, পাশাপাশি থেকে লেপটা-লেপটি করে সংসার করো। কমলি যখন পাকড়েছে মিঞা, সহজে নেহি ছাড়েগা। দরকোচা মারা, ফোড়ার গায়ে তোকমারির পুলটিনের মতো আটকে থাকবে। সম্পর্ক যত শুকোচ্ছে তত আঁটোসাটো হবে। ছবিটা বছর সাতেক আগের যে রাতে, যে মেজাজে তোলা তাতে ছবির ফ্রেমে একজন থাকলে আর একজনের থাকা উচিত ছিল না। থাকলেও দুজনে দু-পিঠে থাকলে উচিত বিচার হত। ছবি তোলা নিয়েই সন্ধের ঝগড়া রাত আটটা নাগাদ কাপডিশ ছোড়াছুড়ির পর্যায়ে এসে যখন আরও বড় কিছুর দিকে ঝুঁকছিল, ঠিক তখনই ফ্যামিলি ফ্রেন্ড সমরেশের আগমন। সমরেশ দু-পক্ষকে সংযত করে বিকাশকে ফ্রয়েড শেখাল। ফ্রয়েড সাহেবের কায়দা। দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর একদিনই একটু খিটিমিটি হয়েছিল অতি সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে মুরগির মাংস। তারপর সেই রণক্ষেত্রে সমরেশ নিজের উদাহরণ হাজির করেছিল। সে নাকি প্রতি সপ্তাহের গোটা রবিবারটাই বউয়ের পায়ে জবাফুলের মতো উৎসর্গ করে দিয়েছে। ছোট এক-কামরার ফ্ল্যাটে দুজনে মুখোমুখি বসে থাকে। আদর-টাদর করে। পাকা চুল তুলে দিয়ে সাহায্য করে। উকো দিয়ে গোড়ালি মেজে দেয়। পেটিকোটের দড়ি পরিয়ে দেয়। কখনও গড়ের মাঠে হাওয়া খাওয়াতে নিয়ে যায়। টানা ট্যাক্সিতে লেকে নিয়ে গিয়ে ঝালমুড়ি খাওয়ায়। পিঠের মাশরুম স্পঞ্জ দিয়ে সাফ করে দেয়। সামান্য একটি ছবি নিয়ে দক্ষযজ্ঞ! মিটসেফ থেকে নতুন কাপডিশ বের করে তিনজনে চা-চানাচুর খেয়ে রাত ন’টা নাগাদ আই ভি স্টুডিয়োতে গিয়ে বিকাশ বউ নিয়ে ফ্লাশলাইটের সামনে বসেছিল। ফোটোগ্রাফার কানু পকেট থেকে চিরুনি বের করে দিয়েছিল। দুজনের সেই মুহূর্তে সাগর প্রমাণ মানসিক ব্যবধান থাকলেও দৈহিক ব্যবধান কমতে কমতে রুটির বুকে কৃপণের মাখন করে দিয়েছিল। একটুও হাসি হাসি মুখ হয়নি। দেরিতে আসা কেরানির দিকে অফিসের বড়বাবুর তাকানো মুখের মতো হয়ে গিয়েছিল।
সেই মাল দুটি এখন লেপের তলায়। মশারির বাইরে মেঝের ওপর পৌষের শীত হামা দিচ্ছে। বন্ধ জানলার বাইরে শীত হি-হি শব্দ করছে। বিকাশ এমনিই একটু ঘুমকাতুরে, তার ওপর শীত। তার ওপর লেপটা সারাদিন ছাদে রোদ খেয়ে আরতির প্রথম যৌবনের মতো মোলায়েম গরম হয়েছে, তার ওপর নতুন ওয়াড় পড়েছে। আগের রাত পর্যন্ত যে ওয়াড় ছিল তাতে সারারাতে। পালা করে হয় স্বামী না হয় স্ত্রী হারিয়ে যেত! দরকারের সময় গলা শুনতে পেলেও কেউ কাউকে খুঁজে পেত না। বেশ ঘুলঘুলি সাইজের গোটা কতক ফর্দাফাঁই ছেঁড়া। সেই গবাক্ষ দিয়ে ঘুমের ঘোরে হয় বিকাশ না হয় বউ লেপের খোলের গভীর জগতে সেঁদিয়ে বসে থাকত। কখনও সখনও খোলের মধ্যে দুজনের দেখা হয়ে যেত। সেটা অবশ্য বাই চান্স। বেশির ভাগ একপক্ষ। বাইরে, একপক্ষ ভেতরে। কয়েক রাত আগে আরতি গিয়েছিল লেপের উদাম লাল টকটকে বুকে উষ্ণতা খুঁজতে। তারপরে দুঃস্বপ্ন দেখেই হোক কি লেপ আর ওয়াড়ের যৌথ আদরে দম আটকে গিয়ে হোক, গোঁ গোঁ শব্দ করে বিকাশের ঘুম চটকে দিয়েছিল। বিকাশ ফায়ার ব্রিগেডের কায়দায় একটানে ঘুলঘুলি-মুলঘুলি ফর্দাফাঁই করে গোঁ গোঁ—আরতিকে লেপের গভীরের জগৎ থেকে। উদ্ধার করে এনে ভেবেছিল—খোলের মধ্যে মানুষের ঢোকার মতো লেপ ঢোকানোটা যদি সহজ হত। মুক্ত আরতির ব্যাপারটা ছিল অন্য। আলো দেখতে না পেলে তার দম আটকে যোবা লেগে। যায়। হঠাৎ চোখ খুলে দেখি নীল আলো নেই, কেউ নেই, কেউ নেই, গোঁ গোঁ। কালই তুমি ওয়াড়ের কাপড় কিনে আনবে। কী রাক্ষুসে ওয়াড় রে বাবা, কোনদিন দেখব দুজনেই ওর মধ্যে মরে কাঠ হয়ে আছি। ভাগ্যিস তুমি বাইরে ছিলে, লর্ডল্যানসেলেট। তোমাকে উদ্ধার করার জন্য লেডি অফ দি শ্যালট। সদ্য উদ্ধারপ্রাপ্ত রাজকন্যা আরতি এরপর যা করেছিল আরও সুন্দর। ওয়াড়ের একটা ঘুলঘুলির মধ্যে দুটো পা ঢুকিয়ে দোলায় শুয়ে সেয়ানা শিশু যেভাবে খলখল করে পা ছোঁড়ে, বিছানায় আধ শোয়া হয়ে সেইভাবে পা ছুড়ে ছুড়ে লেপের খোলটাকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে একটা তৃপ্তির হাসি হেসে বলেছিল, শত্রুর শেষ রাখতে নেই, দাও এক গেলাস জল গড়িয়ে দাও। এতবড় একটা কাজের পর যে-কোনও স্বামীরই উচিত স্ত্রীকে এক গেলাস জল কেন, এই শীতের রাতে লেমনেড মিশিয়ে কি লাইম জুস দিয়ে জিন কলনিস ঠোঁটের ডগায় তুলে ধরা। জলের গেলাসটা ঠক করে কোণের টেবিলে রেখে আরতি আদেশের সুরে বলেছিল, কালই ছ’মিটার পুরু লংক্লথ কিনে আনবে। স্ত্রীর এঁটো গেলাস কে আর এই শীতে ধুতে যায়! সেই গেলাসেই জল ঢেলে স্ত্রীর না চুমুক দেওয়া অংশটা আন্দাজ করে জল খেতে খেতে বিকাশ বলেছিল—মাসের শেষ, তলানি গোটা দশেক টাকা পড়ে আছে, মাসটা কাবার করে ওয়াড়ের কাপড় আনা যাবে।
