ছাগলের চোখ এমনিই কী রকম ড্যাব ড্যাবা মরামানুষের মতো, তায় কাগজ খেয়ে মনে হচ্ছে যেন বোল্ড-টাইপে ছাপা শ্রাদ্ধের চিঠি।
মাসির কাছে কাজ আদায় করতে এসেছি, মাসির কাজে সাহায্য করলে, মনটা যদি একটু ভেজে।
আমরাও বুধির সেবায় লেগে গেলুম। পিন্টু চোয়াল ধরে হাঁ করাবার চেষ্টা করছে। আমি আস্তে আস্তে গায়ে হাত বুলিয়ে তোয়াজ করার চেষ্টা করছি। জুতোর চামড়ায় কি আর সুড়সুড়ি লাগে, বুধির চোয়াল ফাঁক করে কার পিতার সাধ্য! অথচ মাসিকে ছাগল-ছাড়া না করলে আমাদের কাজ বন্ধ। বুধি হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে আমাদের সব কটাকে চার ঠ্যাঙের মোক্ষম লাথি। ঝেড়ে, আরকের বাটি উলটে দিয়ে, মাসির শোবার ঘরে ঢুকে গেল।
মাসি ধুলো ঝেড়ে মাটি থেকে উঠে আমাদের হাত ধরে তুলতে তুলতে বললেন, লাথির জোর দেখলি? তারপর একমুখ হেসে বললেন, আমার দুষ্টু মেয়ে। পিন্টুর কপালের কাছটা লাল হয়ে ফুলে উঠেছে।
মাসি বললেন, তোদের লাগল নাকি?
আমরা দুজনেই কাঁদো কাঁদো গলায় বললুম, বড় লেগেছে মাসি, ফ্যাকচার হয়ে গেছে। আহা বাছা রে! কী করতে পোরা এইছিলিস?
তোমার কাছে শিখতে। হায় কপাল! আমি কী জানি যে তোদের শেখাব রে! না জানি লেখাপড়া, জানি নাচগান। আমি যে তোদের মুখ মাসি রে।
তুমি যা জানো, আমরা জানলে আজ বর্তে যেতুম।
ধুর পাগল। তোদের মাসি একটা অপদার্থ।
ওসব বোলো না মাসি, আমরা কিন্তু রেগে যাচ্ছি। তুমি আমাদের ফানুসের খোল তৈরি করে দেবে। ঘুড়ির কাগজ কিনেছি, আঠা তৈরি করেছি, তুমি ছাড়া আমাদের কে আছে মাসি!
গ্রামের একপাশে মানদামাসির একলা আস্তানা, একটা ছোট্ট আটচালা, একটা ছাগল, একটা পেয়ারা গাছ—ব্যস আর কিছু নেই। ত্রিভুবনে মাসির কোনও আত্মীয়ও নেই। আমরা যেই বলেছি তুমি ছাড়া আমাদের কে আছে মাসি, মাসির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, ওরে আমার সোনা রে—বলে পিন্টু আর আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, নিয়ে আয় তোদের কাগজ। তা বাবা, আমি তো ঠোঙা তৈরির ইসপার্ট, আমি কি তোদের ফানুস মানুষ পারব রে?
খুব পারবে মাসি। দেখতে হবে ঠিক মোহনবাবুর মতো।
পাজি ছেলে! আচ্ছা নিয়ে আয় তোদের কাগজ আর আঠা।
তৈরি হল ফানুস। মন্দ হল না। তবে ঠিক গোল না হয়ে একটু লম্বাটে হয়ে গেল, বিশাল একটা ঠোঙার মতো।
কাকাবাবু বললেন, থাক গে যা হয়েছে। একটু বেঢপ হল বটে, তবে ধোঁয়াটা ধরে রাখা নিয়ে কথা। তা হবেখন।
খোলা দিকটায় একটা তারের গোল রিং লাগানো হল, মাঝখানে আড়াআড়ি দুটো তারে পাটে পাটে জড়ানো হল কেরোসিন তেলে ভেজানো কাপড়ের ফালি আর রজন।
পিন্টু বলল, যতটা পুরু করে পারিস জড়া। যত বেশি ধোঁয়া হবে তত উঁচুতে উঠবে, উঁচু, একেবারে স্বর্গে চলে যাবে রে!
কল্পনা ফানুসের আগে উড়ছে। লক্ষ্য একেবারে চাঁদে গিয়ে পৌঁছোনো। জিনিসটা বেজায় ভারী হয়ে গেল। এত ভারী উড়বে তো রে?
কী যে বলিস! আগেকার দিনে ফানুসে মানুষ উড়ত।
তেল-ভেজানো একটা দশ হাত কাপড় উড়বে না? —পিন্টুর অকাট্য যুক্তি কাকাবাবুও সমর্থন করলেন।
সন্ধে তখন হয় হয়। দীপাবলী, পশ্চিম আকাশ লালে লাল করে সূর্য ডুবছে। সমস্ত বাড়ির ছাদে ছাদে দিনের আলো নেভার আগেই আলসেতে মোমবাতি ফিট করার শব্দ হচ্ছে। এদিক-সেদিক থেকে ঠুসঠাস কয়েকটা পটকা ফাটার শব্দ হচ্ছে। নগেন একটা উড়োন-তুবড়ি টেস্ট করল। প্রথম ফানুস উঠল কামারপাড়ার দিক থেকে। কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হুস হুস করে আকাশে উঠে গেল। নভেম্বরের মাঝামাঝি। দমকা উত্তরের হাওয়ায় মাতালের মতো টলতে টলতে ফানুস নিরুদ্দেশ।
আমাদের দলবল ছাদে উঠেছে। পিন্টুর হাতে লম্ভ, আমার হাতে প্যাকাটি। কাকাবাবু পাশে আছেন, অ্যাডভাইসর। আর আছেন পাঁচুদা, লম্বা মানুষ তিনি, দু-হাতে ফানুসটা মাথার ওপর তুলে ধরে থাকবেন। ধোঁয়া ঢুকে খোলটা ফুলে উঠবে। টান টান হয়ে উড়ে যাবার টান ধরবে, তারপর আপনা থেকেই আকাশের জিনিস আকাশে উড়ে যাবে।
পাঁচুদা লম্বা মানুষ। দু-হাত তুলে ফানুসে ধোঁয়ার টান ধরাচ্ছেন। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। খোলটাই না পুড়ে যায়! কাকাবাবু বললেন, রজন বড্ড বেশি হয়ে গেছে রে। যাক, দেখা যাক কী হয়! ভগবানকে ডাক।
আশ-পাশের বাড়ির ছাদে কৌতূহলী মুখ। উড়বে ফানুস, উড়ছে ফানুস। রোগা মানুষ পাঁচুদা মোটা ফানুস ওড়াচ্ছেন। মাথার ওপর দু-হাত তুলে কতক্ষণ দাঁড়াবেন! হাত টনটন করছে। তার ওপর আগুনের আঁচ! মুখ-চোখ লাল। ফানুসটা একটু দুলে উঠতে তিনি তোললাই মেরে ঠেলে দিলেন। প্রথমে বেশ হাত পাঁচেক উঠে, উত্তরের দমকা হাওয়ায় ছাদের সীমানা পেরিয়ে গেল। তারপরই শুরু হল তার আসল খেল। সামনেই একটা একতলা বাড়ি। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড টলতে। টলতে সেই বাড়ি টপকে গেল, তারপরই একটা পোড়ো দোতলা বাড়ি। ভাইয়ে-ভাইয়ে মামলা চলছে, কেউই মেরামত করে না। ভাঙা ছাদে লম্বা লম্বা ঘাস গজিয়ে ছিল। শীতের মুখে শুকিয়ে ঝনঝন করছে। ফানুসটার ইচ্ছে সেইখানেই শুয়ে পড়ে।
কাকাবাবু বললেন, সর্বনাশ করেছে। ঘাসে আগুন লেগে গেলে লঙ্কাকাণ্ড হবে যে! তোরা সব উইল ফোর্স প্রয়োগ কর। আমরা চোখ বুজিয়ে, জয় কালী, জয় মা কালীজপতে শুরু করলুম। একটু যেন কাজ হল। ফানুসটা পাখির মতো বসতে গিয়েও ঝিকি মেরে হাতখানেক উঠে শুকনো ঘাসে আগুনের তাত লাগিয়ে চিলেকোঠা পেরিয়ে গেল। আমরা ভয়ে কাঠ! ফানুসের এ কী বাঁদরামি, অনেকটা মানুষের মতো ব্যবহার! পোড়া বাড়িটার পর খেলার মাঠ। মাঠ দেখে যেন ফানুসের খেলতে ইচ্ছে করল। ওপরে না উঠে, একপাশে কেতরে ফানুস নামতে শুরু করল। এর পর আমরা আর কিছু দেখতে পেলুম না, বাড়ির আড়ালে আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে তার শয়তানি চলছে।
