আমার উকিল শেষে প্রশ্ন করলেন, খুনের যে হাতিয়ার ওই পাথর, ওই পাথর আমার মতো চেহারার এক প্রবীণ মানুষের পক্ষে কোনওরকমে তোলা সম্ভব হলেও ছোড়া সম্ভব কি না? তা। ছাড়া ঘটনাস্থলে যেসব সঙ্গীসাথী উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করছেন, তারা ইচ্ছে করলেই প্রবীণ মানুষটিকে একযোগে জাপটে ধরে মেরে ফেলতে পারত। অতএব পুলিশের যুক্তি ধোপে টেকে না। দ্বিতীয় পয়েন্ট, ঘটনা যে থানায় ঘটেছে সেই থানায় অপরাধী নাকি গিয়েছিলেন স্বীকারোক্তি করতে। এটা একজন নিরীহ মানুষকে জড়িয়ে দেবার জন্যে সর্বৈব মিথ্যা কথা, বানানো কথা। কোথায় সেই ডায়েরি! অপরাধী পরে যে স্বীকারোক্তি করেছেন, পুলিশ তা আদায় করেছে জোর করে। মারধোর করে।
কমিশন বসল। সেই কমিশনের সামনে আমাকে বলা হল পাথরটি তুলতে। আমি তুলতে পারলুম না। বিশাল এক সুদেহী এলেন, তিনি যদিও তুললেন, ছুঁড়তে পারলেন না। পাথরটাকে ওজন করা হল। শেষে সিদ্ধান্ত হল, ওই পাথর আমার মতো ক্ষমতার একজন মানুষের পক্ষে ভোলা। অসম্ভব। এরপর আমার উকিল প্রশ্ন তুললেন পাথরটা এল কোথা থেকে? ওই অঞ্চলে ওইরকম পাথর আর দ্বিতীয় নেই। একটি মাত্র পাথর অপরাধীর জন্যে রাখা ছিল। আর সে দৈত্যের শক্তি ধার করে পাথরটা ছুড়বে—গল্পেও এমন অবাস্তব ভাবা যায় না।
জজসায়েব ফিরে এসেছেন এজলাসে। আদালতকক্ষ নিস্তব্ধ। তিনি সকলের দিকে একবার তাকালেন। আমার দিকেও মনে হয় তাকালেন একবার। তারপর পড়তে শুরু করলেন তাঁর দীর্ঘ। রায়। কিছুটা পড়ে একেবারে চলে গেলেন শেষে। পুলিশের কাজের নিন্দা করে বললেন, অপরাধীর অপরাধ প্রমাণে ব্যর্থ পুলিশ। যাকে অপরাধী বলা হচ্ছে, সে নির্দোষ। সে নিরীহ। যুবকটি খুন হয়েছে অবশ্যই, তবে খুনি অন্য কেউ। আবার এমনও হতে পারে, এটি নিছক একটা পথ-দুর্ঘটনা। অতএব আসামি বেকসুর খালাস! ছাড়া আমি পেলুম ঠিকই, কিন্তু আমি এখন অন্য মানুষ। আমার পরিবারে ফাটল ধরে গেছে। রূপার একটা গোপন জীবন, আমার স্ত্রীর একটা গোপন জীবন, আর আমি! আইন প্রমাণ করতে পারলেও, মেয়েকে লাঞ্ছিত হতে দেখে আমার শরীরে সত্যই সেদিন দৈত্য ভর করেছিল।
ফানুস
সেবার কালীপূজায় আমি আর পিন্টু ঠিক করলুম, ঠিক সূর্য্যাস্তের সময় আমাদের বাড়ির দোতলার ন্যাড়া ছাদ থেকে রংবেরং-এর বিশাল একটা ফানুস ছেড়ে সকলকে তাক লাগিয়ে দেব। পিন্টুর বাবাকে আমরা কাকাবাবু বলতাম। কাকাবাবু সব জানতেন। তিনি কেমিস্ট ছিলেন। বাড়িতে একটা ছোট ল্যাবরেটরিও ছিল। ছুটির দিন মাঝে মাঝে মনমেজাজ ভালো থাকলে আমাদের ডেকে ডেকে নানা কেরামতি দেখাতেন। আগের বছর আমাদের একটা হাউইয়ের ফর্মুলা দিয়েছিলেন। ফর্মুলার কোনও দোষ ছিল না। আসলে খোলটা আমরা ঠিকমতো তৈরি করতে পারিনি। পারলে হাউই আকাশের ব্রহ্মতালু ভেদ করত নিশ্চয়ই। খোলের দোষে রকেট আকাশে উঠে বোতলসুদ্ধ ছাদে শুয়ে শুয়েই ফুলকি কেটেছিল। কাকাবাবু বলেছিলেন, টেরিফিক ফোর্স হয়েছে হে, তবে সাধারণ কাগজের খোল বলে কেতরে পড়েছে। যে কাগজে নোট তৈরি হয়, সেই পার্চমেন্ট কাগজের খোল তৈরি করতে পারলে দেখতে কাণ্ডটা হত কী!
ফানুসের খোলা নিয়েও প্রথমে সমস্যা হল। বিশাল একটা খোল চাই এস্কিমোদের ঘরের মতো। ধোঁয়া ঢুকবে সেই খোলে তবেই না তিনি আকাশে উঠবেন হেলে-দুলে। এসব ব্যাপারে চীনেরা ভারি এক্সপার্ট। তারা ড্রাগন করে, লণ্ঠন করে, হাতি করে। কাগজ দিয়ে তারা কী না করতে পারে। আমাদের দৌড় ঠোঙা পর্যন্ত। চীনে গুরু পাই কোথায়, পাড়ায় একটিমাত্র চিনের জুতোর দোকান। হাফা-সায়েব আবার এ-সব জানেন না। তাঁর মা জানতেন, তিনি দু-বছর আগে মারা। গেছেন।
ঠোঙা তৈরির বিদ্যে নিয়েই আমি আর পিন্টু বসলুম খোল বানাতে। ঘুড়ির কাগজ, এক বালতি আঠা আমাদের কাঁচামাল। তৈরি হবে গোলগাল খোল।
পিন্টু বলল, মোহনবাবুর চেহারাটা মনে রাখ। মোহনবাবুর পা-দুটো হেঁটে মাথাটা নীচু করে দিলে যে চেহারাটা হবে, আমাদের খোলটা হবে ঠিক সেই রকম। মোটা মোহনবাবুর জ্যামিতি নিয়ে পিন্টুদের বাড়ির বাইরের ঘরের মেঝেতে থেবড়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ আমাদের গবেষণা চলল।
পিন্টু বলল, আসলে আমাদের একটা গোল জালা বানাতে হবে। গলার দিকটা সরু, মোহনবাবু
চিত হয়ে শুয়ে থাকলে তাঁর ভুঁড়িটা যেরকম দেখায়, ওই রকম দেখতে হবে।
সবই তো বোঝা গেল। হাতের কাছে চার দিস্তে ঘুড়ির কাগজ, কাঁচি, আঠাও রেডি; কাটাকুটি শুরু করলেই হয়। সাহসের অভাব।
পিন্টু বললে, এক কাজ করি চল, মানদামাসির কাছে একবার যাই। ঠোঙা তৈরির কায়দাটা শিখতে পারলেই মোটামুটি যা হয় কিছু একটা দাঁড়াবে।
মানদামাসি সারাদিনে হাজার হাজার ছোটবড় ঠোঙা তৈরি করে সংসার চালান। মাঝে মাঝে তাঁর পেয়ারের ছাগল ঠোঙা খেয়ে ফেলে। ছাগলের নাম বুধি। যদিও তার বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু আছে কি না আমাদের সন্দেহ।
আমরা যখন মাসির বাড়ি গেলুম, বুধিকে নিয়ে মাসি তখন ভীষণ ব্যস্ত। বুধি একবাটি আঠা সহযোগে একদিস্তে খবরের কাগজ দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে চোখ উলটে পড়ে আছে। ঘটনাটা ঘটিয়েছে দড়ি ছিঁড়ে, মাসি যখন পুকুরে, তখন।
মাসি বুধিকে বলছেন ওঠ, বাবা ওঠ, যোয়ানের আরকটুকু খেয়ে নে মা, ঠিক হজম হয়ে যাবে। ও বুধি, বুধি!
