ধোঁয়ায় সব অন্ধকার। কেরোসিনের তীব্র গন্ধ। সঙ্গে সঙ্গে জল ঢেলে আগুন নেবার আগেই পাশের ফ্ল্যাটের সবাই ছুটে এল, ‘বিমানবাবু’। আমরা ভয়ে তালগোল পাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। দরজায় ঘন ঘন ধাক্কা। শেষে আমার স্ত্রীকে দরজা খুলতেই হল। বেরোবার পথ না পেয়ে ঘরের মধ্যে সমস্ত ধোঁয়া ঘুরপাক খাচ্ছিল। দরজা খোলামাত্রই গলগল করে ছুটে গেল বাইরের দিকে। খোলা দরজার সামনে সাত-আটজন হতবাক প্রতিবেশী। তাঁরা একই সঙ্গে ঢুকে পড়লেন ঘরে। সকলেরই উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন, কোথায় আগুন, কোথায় আগুন।
মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস না থাকলে মানুষ কীরকম বোকা বনে যায় সেইদিন বুঝেছিলুম। প্রশ্নটিকেই আমরা উত্তর হিসেবে চালাতে লাগলুম—আগুন! কোথায় আগুন! উপকারী মানুষ কত আন্তরিক হয়! সাত-আটজন ছড়িয়ে পড়ল ভেতরে। একজন এগিয়ে গেল বাথরুমের দিকে। বালতি তখনও ধোঁয়া ছাড়ছে। সে চিৎকার করে উঠল—’একী! কী পোড়াচ্ছিলেন বালতিতে? জামা কাপড়!’
রাত তখন প্রায় তিনটে। সাত-আট জোড়া অপরাধ অনুসন্ধানকারীর সন্দিগ্ধ চোখের সামনে আমরা। কে একজন একালের ভাষায় বললে—’ডালমে কুছ কালা।’ সঙ্গে সঙ্গে যারা প্রতিবেশীর উপকারে ছুটে এসেছিল, তারা হয়ে গেল পুলিশের লোক। একজন কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘বলুন, কী সাক্ষ্যপ্রমাণ লোপাট করছিলেন?’ আমরা চারটে প্রাণী মাথা খাঁটিয়েও বিশ্বাসযোগ্য কোনও উত্তর দিতে পারলুম না। নীরবে মাথা নীচু করে রইলুম। আর একজন বললেন, ‘ইনফর্ম পুলিশ।’ আমার স্ত্রী তখন মাথা খাঁটিয়ে একটা উত্তর বের করেছে। ‘জামাকাপড়ে এমন একটা নোরা লেগেছিল, পোড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না।’ সকলে হেসে উঠল—’তা এই মাঝরাতে! কী এমন নোংরা মশাই!’
মানুষ মানুষের সর্বনাশের জন্যে কত কষ্ট করতে পারে! একদল রয়ে গেল আমাদের পাহারায়, যাতে আমরা বালতিটাকে লোপাট করে দিতে না পারি। আর আর-এক দল চলে গেল পুলিশে খবর দিতে। বাকি রাতটা আমরা বসে রইলুম ঘেরাও হয়ে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন আসতে লাগল। আমাদের দিকে। এক সময় আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলুম—’আপনারা তো পুলিশ ডাকছেনই, যা বলার পুলিশকেই বলব।’
সবাই একটু আশ্বস্ত হলেন, যাক, বলার তাহলে আছে কিছু।
এর পর সবই সরলরেখায় ঘটে গিয়েছিল। পুলিশ এল। তার আগে শেষ রাতে পথের ধার থেকে যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার। যুবকটি এই শহরেরই বড় এক ব্যবসায়ীর সন্তান। থানায় খবর চালাচালি হয়ে গেল। আধাপোড়া পাজামা, পাঞ্জাবি সহ বালতি চলে গেল পুলিশ-হেফাজতে। আমার দু-পাটি চপ্পল। থানায় আমার স্বীকারোক্তি। রূপার ডাক্তারি পরীক্ষা। আমি পড়ে গেলুম ইঁদুরকলে। আমাকে ফাঁসাবার জন্যে সাক্ষীসাবুদের অভাব হল না। কারণ আমি ছিলুম এক নিরীহ মানুষ। আমার কোনও দল নেই। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের আশ্রিত নয়। আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিলে কারওর কোনও বিপদ নেই। আমার পক্ষে কোনও সাক্ষীই পাওয়া গেল না। প্রমাণই করা গেল না, অন্ধকারে তিনটে ছেলে রূপাকে রেপ করতে এসেছিল! ডাক্তারি পরীক্ষায় রূপার শরীরে বলপ্রয়োগের কোনও চিহ্নই পাওয়া গেল না। গালের ক্ষত যে-কোনও কারণেই। হতে পারে। ছেঁড়া ব্লাউজ! নিজেই নিজের ব্লাউজ ছেঁড়া যায়।
অসহায় আমি কাঠগড়ায় বসে বসে কত কী শুনে গেলুম। যে ছেলেটিকে আমি মেরেছিলুম সে ছিল এক ব্যবসায়ীর সন্তান। অঢেল টাকার মালিক। রাস্তায় শিকার ধরা ছিল তার হবি। তার পিতাটি অর্থের জোরে ভোগ আর রোগ দুটোরই মালিক। তিনি আমার বিরুদ্ধে তাঁর সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। আমার হয়ে লড়ছিলেন নড়বড়ে এক অ্যাডভোকেট। বয়সে নবীন। তিনি আমাকে খালাস করিয়ে আনার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ছেলেটি আদর্শবাদী। আমার মুখে সব শুনে বলেছিলেন, আপনি ঠিক করেছিলেন। নরখাদক বাঘ মারলে মানুষকে যদি পুরস্কার দেওয়া হয়, আপনাকেও পুরস্কার দেওয়া উচিত, সাজা নয়। কিন্তু কী করা যাবে? আইন হল আইন।
আদালতে বসে আমার মেয়ের সম্পর্কে কত কী শুনলুম। নিজের সম্পর্কেও। আমার মেয়ের চরিত্র! সে না-কি ছেলেধরা! সত্যি সত্যিই সাক্ষীর কাঠগড়ায় পুলিশ তিনটে লপেটা মার্কা। ছেলেকে একের পর এক তুলে দিল। প্রত্যেকেই তাদের কাছে লেখা আমার মেয়ের দু-দশটা প্রেমপত্র আদালতে দাখিল করে গেল। সেই সব চিঠি আদালতে পড়া হল জোরে জোরে। আমাকে শুনতে হল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমার মেয়েকে স্বীকার করতে হল, চিঠিগুলো তারই লেখা।
সরকার পক্ষের আইনজ্ঞ প্রমাণ করতে চাইলেন, আমি আমার মেয়েকে দিয়ে দেহব্যবসা চালাতুম, তা না হলে কেমন করে আমার জীবনযাত্রার মান আমার উপার্জনের চেয়ে বেশি হয়! কী করে আমি সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনি! কেনার পরেও কী করে আমার অত টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স থাকে। আদালতে বসেই আমি জানলুম, আমার স্ত্রী থিয়েটারে অভিনয় করত। তার অনেক প্রেমিক ছিল! এমনকী এ-ও প্রমাণ করার চেষ্টা হল রূপা আমার মেয়েই নয়। তার পিতা আমার কর্মস্থলের এক প্রাক্তন বড়কর্তা! স্ত্রীকে ভেট হিসেবে ব্যবহার না করলে একটা। লোকের তিন বছরে চারটে প্রোমশান হয় কী করে?
কিছুতেই প্রমাণ করা সম্ভব হল না, ঘটনার দিন রাতে আমি আমার এক বন্ধুর বাড়িতে ভোজ খেতে গিয়েছিলুম। কারণ আমার সেই বন্ধু ভোরের বিমানে সপরিবারে আমেরিকা চলে গেল। তার বৃদ্ধা মা সরাসরি আমাকে চিনতে অস্বীকার করলেন। আমার বন্ধু আমেরিকা থেকে আমার উকিলের একটা চিঠিরও জবাব দিলেন না। সরকার পক্ষের উকিল নাটকীয় কায়দায় হাত-পা নেড়ে প্রমাণ করে দিলেন, আমি অসৎ উদ্দেশ্যে ওই সময় ওই অঞ্চলে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরছিলুম। ছেলেটি ছিল আমার মেয়ের প্রেমিক। সে সেদিন আমাকে ধরবে বলে দাঁড়িয়েছিল। পরপর তিনজন সাক্ষী দিয়ে গেল, ছেলেটি সত্যিই আমার মেয়ের প্রেমিক। ওরা দুজনে সিনেমায় যেত। রেস্তোরাঁয় মিলিত হত। এক রেস্তোরাঁর মালিক এসে আমার মেয়েকে শনাক্ত করে। হলফনামা দিয়ে গেল। প্রমাণ হয়ে গেল, আমার মেয়েকে বাঁচাবার জন্যে আমি খুন করিনি বরং প্রেমিকাকে বাঁচাতে এসে আমার হাতে খুন হল ছেলেটি।
