নারীবিদ্বেষী পুরুষবাদী বন্ধুটি যাহা বলিয়াছিল তাহা আংশিক সত্য। নারীরা তাহাদের রিপাবলিকে প্রস্থান করিলে অসুবিধা তো কিছু নাই। কামার, কুমার, ছুতোর, মজুর, মিস্ত্রি সবই তো পুরুষের কর্ম। এ দৃশ্য তো ভাবিতে পারি না, ভারা বাঁধিয়া চার তলার ছাতে উঠিয়া নারী রাজমিস্ত্রি সেন্টারিং করিতেছে, কী ধপাং ধপাং করিয়া ঢালাইয়ের মশলা পিটিতেছে।
যাহাই হউক তাহারা ভিন্ন হইয়া গেলে তাহাদের অসুবিধা অবশ্যই হইবে। বলা হয় অসুস্থ। পুরুষের পার্শ্বে সারারাত্রি নারীই জাগিয়া থাকিয়া সেবা করেন। সুধীরলাল আবেগভরা কণ্ঠে গাহিলেন—’মধুর আমার মায়ের হাসি’। প্রশ্ন করিলেন, ‘কে জেগে রয় দুখের রাতে!’ অতীতের চিত্র। বর্তমানের ব্যবস্থা অন্যরূপ। পয়সা থাকিলে নার্সিংহোম, তাহা না থাকিলে সাধারণ হাসপাতাল। সেখানে সেবিকাদের সেবার নমুনা ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। আজ বেডপ্যান। চাহিলে, পরের মাসে পাওয়া যাইতে পারে। রোগী ‘ট্রাবলসাম’ হইলে কিলাইবার ব্যবস্থাও আছে। বাস্তব দেহত্যাগ করিতেছেন, পুরাকালের চিত্র। মা-জাতি অন্তর্ধান করিয়াছে। যামিনী রায়ের চিত্র। মাসির কোলে বাচচা রাখিয়া হাত নাড়িতে নাড়িতে ‘ফ্লাইং কিস’ ছুড়িতে ছুড়িতে, স্বামীর স্কুটারের পশ্চাদ্দেশে তাহার ভূঁড়িতে আঁকড়াইয়া ধরিয়া বসিয়া, অফিসে যাইতেছে। মস্তকে একটি উপুড় করা গামলা।
মানবগোষ্ঠী স্ত্রী পুরুষে সত্যই যদি বিভক্ত হয়, তাহা হইলে দেবী সকলকে প্রমীলা রাজ্যেই পাঠানো হইবে। দুর্গা, মা কালী, চণ্ডী, মনসা, শীতলা সব ওই দিকে। নারীকে দেবী রূপে আরাধনা করিয়াও আমাদের স্বভাব পালটাইল না। নারীশূন্য শ্মশানে আমরা ভোলা মহেশ্বরকে লইয়াই থাকিব। তিনিও প্রথম সতীদাহে খণ্ড বিখণ্ড হইতে দিয়া আমাদের পুরুষবাদ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন।
আমাদের প্রধান সমস্যা হইবে নারীর প্রতি আগ্রাসী আকর্ষণ। ইরেজিস্টেবল। হরমোন ঘটিত হাঙ্গামা। কণ্ঠে ‘বয়সা’ ধরিয়া মাত্র নারীসঙ্গের জন্য ধড়ফড় করিবে প্রাণ। করিবেই করিবে। ছবি দেখিতে ইচ্ছা করিবে। প্রেমের উপন্যাসে মগ্ন হইতে ইচ্ছা করিবে। ইহার হাত হইতে রক্ষার উপায় খুঁজিতে হইবেই। হিন্দি ছবির ডায়ালগ উদ্ধৃত করিলে বলিতে হইবে—ইজ্জত কা সওয়াল।
শাস্ত্রের শরণ লইতে হইবে। আকর্ষণকে বিকর্ষণে আনিবার জন্য ঘৃণা উক্ত হইবে। সাধকগণ দুইটি পথ অবলম্বন করিতেন, একটি পথ পূজার পথ। নারী মাতা, নারী দেবী, বেদিতে বসাইয়া পূজা করো। বলল, স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু।
নারীর মুখপানে তাকাইও না। পদদ্বয়ে দৃষ্টি রাখখা। মনে কু-ইচ্ছা আসিলেই কুস্তি করো। মহাত্মা গান্ধি বলিতেছেন—মনে কুবাসনা জাগিলেই, জোর করিয়া তাড়াইবার চেষ্টা না করিয়া অন্য কর্মে ব্যাপৃত হও, অধ্যয়ন করো, অথবা শ্রমসাধ্য এমন কোনও কর্ম করো, যাহাতে মন নিবিষ্ট হয়। দৃষ্টিকে প্রবণতার পথে যাইতে দিয়ো না। নারীর প্রতি পতিত হইলে তৎক্ষণাৎ সরাইয়া লও। সরাসরি কোনও মহিলা বা পুরুষের দিকে তাকাইবার প্রয়োজন কী!
তুলসীদাসজিকে স্মরণ করিতে পারি। তিনি বলিতেছেন,
রাজা করে রাজা বশ, যোদ্ধা করে রণ জই।
আপনা মনকো বশ করে সো, সবকো সেরা ওই।
পথটি সহজ নয়। লোলচর্ম বৃদ্ধ যুবতি দেখিয়া হাঁচড় পাঁচড় করিয়া মরিল। রাজা দশরথের কী হইয়াছিল। যাঁহার ‘হার্টের অবস্থা শোচনীয়, ‘বাইপাস’ করিলেই হয়, তিনি টঙ্কার মারিয়া চক্ষু। উলটাইলেন। মহাভারতের মুনিদের কথা স্মরণ করিতে লজ্জা হয়। ধূম্রজাল বিস্তার করিয়া রমণী রমণ করিতেছেন। স্নান করিতে গিয়া লিত রেতঃ হইতেছেন।
দ্বিতীয় পথ, আত্মরক্ষার পথ। নারী আমাদের দুশমন। পিয়ারী দুশমন। রাজা অঙ্গধ্বজের কাহিনি পূর্বেই বলিয়াছি। তুলসীদাস পুরুষের স্বীয় আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তিকে উসকাইয়াছেন। তোমাকে তিল তিল করিয়া মারিবার চেষ্টা করিতেছে ছলনাময়ী মোহময়ী। সেই গ্রাস হইতে নিজেকে মুক্ত করো। সাবধান হও। ‘সাইলেন্স কল’। সংযমের মাস্তুলে নাবিককে বাঁধিয়া রাখা।
তুলসী বলিতেছেন—
দিনকা মোহিনী, রাতকা বাঘিনী পলপলক লহ চোষে।
দুনিয় সব বাউরা হোকে, ঘর ঘর বাঘিনী পোষে।।
এই ঘৃণার ভাব আরও দৃঢ় করিবার মানসে শাস্ত্র পুরুষকে ‘পোস্টমর্টেম’-এর ডাক্টর হইতে বলিতেছে। বিশ্বসুন্দরীকে ছুরি দিয়া ফালা করো। দেখো লালায়িত হইবার মতো কিছু আছে কি?
অমেধ্যপূর্ণে কৃমিজালসঙ্কুলে স্বভাব দুর্গন্ধ নিরন্তকান্তারে।
কলেবরে মূত্রপুরীষভাবিতে রমন্তি মূঢ়া বিরমন্তি পন্ডিতাঃ।।
ইহার মধ্যে নারীবিদ্বেষ নাই। এই সবই নারীর অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ হইতে দুর্বল পুরুষের বাঁচিবার প্রয়াস, রক্ষাকবচ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিচারের পথ দেখাইয়াছেন, বলিতেছেন, বস্তুবিচার—’সুন্দর দেহেই বা কি আছে! বিচার কর, সুন্দরীর দেহতেও কেবল হাড়, মাংস, চর্বি মল, মূত্র।’ তিনি গৃহীদের পৌরুষ জাগাইবার জন্য যৎপরোনাস্তি গালমন্দ করিতেন, বলিতেন সব মাগের দাস। ‘লোকে মাগ ছেলের জন্য একঘটি কাঁদে, ঈশ্বরের জন্যে কে কাঁদছে বল!’ বিজয়কৃষ্ণকে একদিন বলিয়েছেন, ‘কামিনী কাঞ্চনে জীবকে বদ্ধ করে। জীবের স্বাধীনতাই যায়। কামিনী থেকেই কাঞ্চনের দরকার। তার জন্য পরের দাসত্ব। স্বাধীনতা চলে যায়। তোমার মনের মতো কাজ করতে পার না।’
