শ্রীরামকৃষ্ণই একালের আমাদের ‘ফাইন্যাল সলিউশান’। ইহা আমি মনে করিয়া থাকি সেই। কারণেই বলিলাম। তিনি সন্ন্যাসী হইতে বলেন নাই। সংসারে থাকিয়া স্ত্রী-পুত্র-পরিবারের প্রতি সমস্ত কর্তব্য সম্পাদন করিতে বলিয়াছেন; কিন্তু একটি রক্ষাকবচ ধারণ করিতে হইবে। মাগের দাস হইয়ো না। স্বরূপ ভুলিও না। নারীর দুই রূপ—বিদ্যারূপিণী আর অবিদ্যারূপিণী। ইহার পর তিনি আমাদের চৈতন্যকে এই বলিয়া খোঁচাইতেছেন, ‘দেখ না, মেয়েমানুষের কি মোহিনী শক্তি, অবিদ্যারূপিণী মেয়েদের (বিদ্যারূপিণী নয়)। পুরুষগুলোকে যেন বোকা অপদার্থ করে রেখে। দেয়। যখনই দেখি স্ত্রীপুরুষ একসঙ্গে বসে আছে, তখন বলি আহা! এরা গেছে—হারু এমন সুন্দর ছেলে, তাকে পেতনীতে পেয়েছে! ওরে হারু কোথা গেল, ওরে হারু কোথা গেল, আর হারু কোথা গেল। সব্বাই গিয়ে দেখে হারু বটতলায় চুপ করে বসে আছে। সে রূপ নাই, সে তেজ নাই, সে আনন্দ নাই! বটগাছের পেতনীতে হারুকে পেয়েছে। স্ত্রী যদি বলে, ‘যাও তো একবার’—এমনি উঠে দাঁড়ায়, ‘বসো তো’—অমনি বসে পড়ে।
তাঁর বিখ্যাত সেই উক্তি এই প্রসঙ্গে, ‘গোলাপকে ধর।’ বড়বাবুকে ধরিলে কাজ হইবে না, ধরিতে হইবে তাঁহার রক্ষিতা গোলাপকে। খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজার বৎসরে লিখিত ‘গিলগামেশ’ উপাখ্যানে দেখা যাইতেছে, শাসক গিলগামেশ বন্যবীর এনকিভুর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইবার পূর্বে, তাহার। শক্তি হরণের জন্য এক রূপসিকে পাঠাইল। তাহার পর! যাহা হইবার তাহাই হইল, the whore untied her lion-cloth and spread her legs, and her tooks possesion of her beauty. ছয়দিন ছয়রাত এনকিভু তাহাকে সম্ভোগ করিল। ইহার পর সে যখন উঠিয়া দাঁড়াইল যুদ্ধের জন্য, তাহার পদদ্বয় কাঁপিতেছে, দেহ টলিতেছে, নয়নে সরিষার ফুল দেখিতেছে। আজীবন ব্রহ্মচারী ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি, যিনি কখনও নারী দর্শন করেন নাই, নিরন্তন সাধনায় ব্রতী, অঙ্গদেশের রাজা লোমোদ প্রেরিত চিত্তোম্মাদক ইন্দ্রিয়ভোগ্য বারাঙ্গনার রূপে মুগ্ধ হইয়া নাচিতে নাচিতে আশ্রম, সাধনা, সব ভুলিয়া অঙ্গরাজ্যে চলিয়া গেলেন। পরে কৌপিন ছাড়িয়া, বিবাহ করিয়া, স্কন্ধে বাচ্চা চড়াইয়া ঘুরিতে লাগিলেন। তপস্যার বারোটা বাজিয়া গেল।
শ্রীরামকৃষ্ণ আদৌ নারীবিদ্বেষী ছিলেন না। তিনি পুরুষকে পথে আনিতে চাহিয়াছিলেন। শূকরের সংসারকে শিবের সংসার, বিদ্যার সংসার করতে চাহিয়াছিলেন। পুরুষ যদি আত্মবোধে জাগ্রত হয়, তাহা হইলে নারী ভোগ্য সামগ্রীই হইয়া থাকিবে। মিনিটে একটি করিয়া ধর্ষণ হইবে। তিন হইতে তিয়াত্তর কোনও মহিলাই রেহাই পাইবে না, বিলাতে যাহা হইতেছে। আর কয়েক বৎসরের মধ্যেই অর্থে না হউক, যৌন অপরাধ সংঘটনে ভারত আমেরিকা হইয়া যাইবে। দাসত্বের যন্ত্রণা হইতে পুরুষকে মুক্তি দিবার জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ প্ল্যানড ফ্যামিলির কথা অবিরত বলিয়া গিয়াছেন। চোখে আঙুল দিয়া দেখাইতেছেন—’দেখ অত পাশ করা, কত ইংরাজি পড়া পণ্ডিত, মনিবের চাকরি স্বীকার করে তাদের বুট জুতার গোঁজা দুবেলা খায়। এর কারণ কেবল কামিনী। বিয়ে করে নদের হাট বসিয়ে আর হাট তোলার জো নাই। তাই এত অপমানবোধ, অত দাসত্বের যন্ত্রণা।’তুলসীদাস এই একই কথা বলিলেন,—’তিন বাতসে লটপাট হেয়, দামড়ি চামড়ি পেট।’
মাতা যেমন শিশুপুত্রকে বলিয়া থাকেন, ‘চকোলেট খাচ্ছ খাও, পেছন চুলকু করলে, মাঝরাতে কেঁদো না।’ তাহার ব্যাখ্যা এই নহে, মাতা চকোলেট বিদ্বেষী। ভিষক যখন বলেন, ‘খাওয়াটা একটু কমান, ফ্যাট না কমালে হার্টটা যাবে।’ তাহার অর্থ এই নহে যে, অনাহারে শুষ্ক হইয়া যান। মাতা যখন যুবতি কন্যাকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ওই লোফার ছেলেটার পাল্লায় পড়লি’ তাহার অর্থ এই নহে যে তিনি পুরুষবিদ্বেষী! পুরুষদের মধ্যে যাহারা লোফার, তিনি তাহাদের বিদ্বেষী। পুরুষ প্রজাতির আধ্যাত্মিক মানবেরা, নিজ প্রজাতির গৌরব বর্ধনের জন্যই কামকে সংযত করিবার শত উপদেশ, শত কাহিনি বলিয়া গেছেন। নিজ কন্যার সহিতও একই শয্যায় শয়ন করিতে নিষেধ করিয়াছেন। মুনিদিগেরও মতিভ্রম হইয়া থাকে। বরাহনগর মঠে বসিয়া রাখাল মহারাজ মাস্টার মহাশয়কে একদিন কথা প্রসঙ্গে বলিতেছেন—’অনেকে মনে করে মেয়েমানুষ না দেখলেই হল। মেয়েমানুষ দেখে ঘাড় নীচু করলে কী হবে? নরেন্দ্র কাল রাত্রে বেশ বলল, যতক্ষণ আমার কাম, ততক্ষণই স্ত্রীলোক, তা না হলে স্ত্রী-পুরুষ ভেদবোধ থাকে না।’
কামটিকে ঝাড়মূলে বিনষ্ট করিতে না পারিলে নারীদের দুর্গতি বাড়িতেই থাকিবে। আমরা পারিলাম না। তুলসীদাস বলিয়াই গিয়াছেন :
শাকট সূকট কুকুরা, তিনেক মত এক।
কোটি ভাঁতি সমঝাও, তৌ ন ছোড়ে টেক।।
পাষণ্ড, শূকর ও কুকুর এই ত্রিবিধ প্রাণীই এক জাতির। উহাদিগকে কোটি কোটি সদুপদেশপূর্ণ নম্র প্রিয়বাক্য বলল, তথাপি কোনও মতেই নিজ স্বভাব সংশোধন করিবে না। এরিক ফ্রম বলিলেন, Most people see the problem of love primarily as that of being loved rather than that of loving, of one’s capacity to love. আমরা ভালোবাসা চাহিলাম। পাইলাম। খামচাইয়া-খুমচাইয়া শেভ করিলাম। ভালোবাসিতে পারিলাম না। এখন পদাঘাতে জর্জরিত অপমানিত। নারীরা পুরুষকে বাদ দিবেন। উত্তম প্রস্তাব। জীবন হইতে সরিয়া
