স্ত্রী হিসেবে তাহাকে অর্জন করিয়া সংসারে প্রবেশের মুহূর্তে স্বামীজিকে আর একবার পাঠ করিলাম চেতনাবাণী হিসাবে, ‘ভারতের দুই মহাপাপ—মেয়েদের পায়ে দলানো, আর জাতি জাতি করে গরিবগুলোকে পিষে ফেলা। শাক্ত মানে ঈশ্বরকে সমস্ত জগতে বিরাজিত মহাশক্তি বলে জানেন এবং সমগ্র স্ত্রী জাতিতে সেই মহাশক্তির বিকাশ দেখেন।…মনু মহারাজ বলিয়াছেন যে, যত্র নার্যস্তু পূজন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ—যেখানে স্ত্রীলোকরা সুখী, সেই পরিবারের ওপর। ঈশ্বরের মহাকৃপা। এরা (পাশ্চাত্যের লোকেরা) তাই করে। আর এরা তাই সুখী, বিদ্বান, স্বাধীন, উদ্যোগী। আর আমরা স্ত্রীলোককে নীচ, অধম, মহা হেয় অপবিত্র বলি। তার ফল—আমরা পশু, দাস, উদ্যমহীন, দরিদ্র। আমাদের দেশ সকলের অধম কেন, শক্তিহীন কেন? —শক্তির অবমাননা সেখানে বলে।’
দেখিয়াছি, প্রেমিক এক জীব আর স্বামী আর এক জীব। স্বামী শব্দটি ‘ভালগার’। তাহার মধ্যে লুঙ্গি ও স্যান্ডো গেঞ্জি পরা লোমওলা একটি দানব বসিয়া দাঁত খুঁটিতেছে ও মাংসজাতীয়। ভুক্তাবশেষের ‘ফাইবার’ বাহির করিতেছে। সচেতন আমি চিরপ্রেমিক থাকিবার চেষ্টা করিলাম। সংসারটিকে ময়দানের সেই বৃহত্যক্ষ ভাবিলাম। দুজনে পাশাপাশি বসিয়া আছি তাহার মূলে। সুমিষ্ট স্বরে, কবিতার ভাষায় কথা বলিতেছি। দিবা আটটা পর্যন্ত বিছানায় গোঁত্তা মারিয়া পড়িয়া থাকিয়া নিদ্রাজড়িত কণ্ঠে ক্ষণে ক্ষণে বলিতেছি না—’হ্যাঁ গা চা কি হল!’কখনওই বলিতেছিনা, ব্যঞ্জন নুনে যবক্ষার, কি ঝালেপোড়া। সম-মর্যাদা বিশিষ্ট দুই প্রাণী। একই পক্ষীর দুইটি ডানা, পুরুষ ও প্রকৃতি। অনুমতি ভিন্ন কোনও কাজই করি না। হায়! উলটা বুঝিলি রাম! আমার স্ত্রীই আমাকে একদিন মধ্যরাত্রে অতিশয় তিরস্কার করিলেন, ‘তোমার আদিখ্যেতা আর ন্যাকামিটা কমিয়ে একটু পুরুষ হওয়ার চেষ্টা করো না। পায়ে পায়ে ল্যাজ খাড়া করে বেড়ালের মতো ঘুরো না। মা বলছিলেন, ছেলেটাকে আঁচল চাপা দিয়ে রেখেছে, উঠতে বললে ওঠে, বসতে বললে বসে। মেনিমুখো পুরুষ মেয়েদের অসহ্য লাগে।’
তৎক্ষণাৎ আমার বিল্বমঙ্গলের কথা মনে পড়িয়া গেল। প্রেমিক এইভাবেই প্রেমিকার দ্বারা তিরস্কৃত হয়। যাহার জন্য চুরি করা হয়, সেই বলে চোর। আমি ইচ্ছা করিলেই হাঁড়িমুখো হুলো হইতে পারিতাম কিন্তু। প্রথম রাত্রেই বিড়াল কাটিবার পরামর্শ উপেক্ষা করিবার ফল ফলিতে বিলম্ব হইল না। সংসার বলিতে লাগিল স্ত্রৈণ, স্ত্রী বলিতে লাগিল, পার্সোনালিটি নাই।
ইদানীং নারীবাদে উদ্বুদ্ধ হইয়াছেন। জ্বালাময়ী প্রবন্ধাদি পাঠ করিয়া তিনিই এখন স্বামী আমি এখন সপ্তম্ভ স্ত্রী। ক্ষীণ কণ্ঠে বলিয়াছিলাম, সেই শৃগালটির মতোই, ‘আমি তো তোমার জল ঘোলা করিনি।’ উত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তুমি করো নাই সত্য, কিন্তু তোমার বাপ তো করিয়াছে।’
জিগ্যেস করিলাম, আমাকে তাহলে বিবাহ করিলে কেন! ঝাঁক হইতে প্রেমের বঁড়শিতে গাঁথিয়া এই মাছ অথবা মালটিকে তুলিলে কেন? জবাব শুনিয়া গলদেশেরঙ্কু পাইবার বাসনা হইল। এমত উত্তর শুনিবার চেয়ে উদবন্ধনে প্রাণত্যাগই শ্রেয় ছিল। তিনি স্পষ্টই কহিলেন, মেয়েরা মর্কট পুষিতে ভালোবাসে।
সম্প্রতি এমন সব কথা বলিতেছেন, যাহার প্রতিবাদে আমার কিছু বলার নাই। সেদিন প্রশ্ন করিলেন, ‘নারী কাহাদের চক্রান্তে এই দেশে বারো হাত শাড়ি পরিয়া তলায় সায়া পরিয়া। জড়ভরত হইতে বাধ্য হইয়াছে। ইহা পুরুষেরই আদিম চক্রান্ত। দ্রৌপদী যদি জিনস পরিয়া কৌরব সভায় প্রবেশ করিত, তাহা হইলে দুর্যোধন দুঃশাসনের বাপের ক্ষমতা থাকিত বস্ত্রহরণ করিবার! বুদ্ধিমতী পশ্চিমী রমণীরা সেই কারণে কেহ হরণ করিবার পূর্বে নিজেরাই নিজেদের পোশাক হরণ করিয়া ফেলিয়াছে। ক্ষুধার্ত পুরুষসমাজকে তাল ঠুকিয়ে বলিতেছে, দ্যাখ ব্যাটারা দ্যাখ, শরীর কত দেখবি দ্যাখ। দেখিতে দেখিতে ক্লান্ত হইয়া, তাহারা আর দেখিয়াও দেখে না। সমর সেন কথিত সেইব্রাহ্মণ যুবতিটিকে চক্ষুদ্বারা লেহন করিবার জন্য তাহার চারতলার ন্যাড়া ছাতে’ গুঁতোগুতি করে না। শয়নকক্ষে নীল আলোতে অ্যাটর্নি চন্দ্রের ভারতচন্দ্রীয় প্রেম দেখেনা। সমুদ্রসৈকতে সারি সারি বিবসনা শায়িত, যেন ‘হোলোকেস্টে’ মৃতা নগরীর যত সুন্দরী।
পাশ্চাত্যের কোথাও সেকরার ঠুকঠক নাই, কামারের এক ঘা। তাহারা মিনমিনে প্রেমিকার ছদ্মবেশে সুচ হইয়া প্রবেশ করিয়া ফল হইয়া বাহির হয় না। তাহাদের পৌরুষ অন্য ধরনের। যাহা নাই, অথবা ছিল কোনও কালে, মরিয়া ভূত হইয়াছে, সেই প্রেম নামক ন্যাকামিটি জীবন হইতে ছাঁটিয়া ফেলিয়া দিয়াছে। এদেশের রমণীরাও জানে প্রেম নাই, ছিল না কোনওদিন। আছে প্রয়োজন। কচি কচি মেয়েরা প্রথমে প্রেমে পতিত হয় তাহার পর অধিকাংশ পতিতা হইয়া যায়। হইয়া বুঝিতে পারে To us, all customers are pretty much alike. Always the same categories। পাশ্চাত্যের পুরুষরা ‘ধর তক্তা মার পেরেক’ মন্ত্রে বিশ্বাসী। মুক্তিপ্রাপ্তা নারী। বলিতেছেন, আমার প্রয়োজন হইলে, তু তু করিয়া ডাকিব, প্রয়োজন ফুরাইবা মাত্র লাথ মারিয়া। বিদায় করিব। কয়েক ঘণ্টার প্রয়োজনের নিমিত্ত গাঁটছড়া বাঁধিয়া দামড়াটির সহিত দরমার খাঁচায় প্রবেশ করিব ও হুঁকোমুখো শ্বশুর, থ্যাবড়া নাকি শাশুড়ি, খোন্ত-দাঁতী ননদিনী, দলপাকাইয়া নিপীড়ন যন্ত্র চালু করিবে, তাহা হইতে দিব না। এতকাল ফাঁদ দেখাইয়াছ, এইবার আমরা ঘুঘু দেখাইব। পাশ্চাত্যের মানসিকতা আমদানি করিয়া এই সিদ্ধান্তে আসিয়াছি—ক্ষুধা পাইলে মানুষ আহার করিবে, ধূমপান করিবার ইচ্ছা হইলে ধূমপান করিবে, গান গাহিবার ইচ্ছ হইলে আ-আ করিবে, পড়িবার ইচ্ছা হইলে বই খুলিবে, করিবার ইচ্ছা হইলে করিবে। তাহার জন্য স্ত্রী নামক ব্যবহারযোগ্য সম্পত্তিটিকে চিরস্থায়ী মোকরুরী ব্যবস্থায় আনিবার কোনও প্রয়োজন নাই। যখন আমরা সন্তানধারণ আর পরিবার পালনের শিক্ষা ছাড়া আর কোনওরূপ শিক্ষা পাইতাম না, তখন পতি পরম গুরু জ্ঞানে হেঁচকি তুলিতাম। এখন গা-এর তলা হইতে উ-টি উৎপাটিত করিয়াছি। এলিস সাহেব আমাদের পুরুষের স্বরূপ বুঝাইয়া দিয়াছেন—
