রাজামশাই কান খাড়া করে কথাটা শুনলেন। ভয়ংকর একটা ধিক্কার এল রাজার মনে। আমি একটা ছাগলেরও অধম। নারীর প্রতি প্রবল আসক্তির ফলে আজ আমার এই অবস্থা। যে রানিকে আমি এত ভালোবাসি, সে আমার প্রাণ নিতে চাইছে, আর আমি বোকার মতো আমার মূল্যবান। জীবন নষ্ট করতে চলেছি। আমি ছাগলেরও ছাগল।
‘রাজা স্নান সেরে ফিরে মন্ত্রীমণ্ডলী ও রানিকে ডেকে বললেন—কথাটা হল এই, আমি সেই গোপন কথাটি বলে পাথর হয়ে যাব, মানে সরে যাব, তা রানি তুমি কি তাই চাও! রানি বললেন, মহারাজ! আপনার যাই হোক আমি রহস্যটা জানতে চাই।
‘রাজামশাই তো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। ছাগলের কথায় তাঁর বোধোদয় হয়েছে। তাঁর মনে পড়ে গেছে, কবির কথা, সন্তানের জন্ম দিয়ে নারী মা হয়, বালিকা অবস্থায় সহবাস, কখনও সে দেবী, পূজিতা, আবার কখনও সেই নারীই স্বয়ং মৃত্যু, জীবন ছিনিয়ে নেয়। রাজা কিছু আগেই নিজেকে ধিক্কার দিয়েছেন, এত নির্বুদ্ধি আমি! শত ধিক্কার সেই রমণীকে যে মিষ্টি কথায় পুরুষকে ভেড়া বানায়, ধিক্কার সেই পুরুষকেও যে সব খুইয়ে দুষ্ট নারীর কথায় দাসে পরিণত হয়।
‘রাজা বললেন, রানি এইবার তাহলে দেখো আমি কী করি। একটা চাবুক চেয়ে নিয়ে প্রিয় রানিকে বেধড়ক পেটাতে লাগলেন। রানি পায়ে ধরে তখন ক্ষমা চাইছেন। রাজার তখন পৌরুষ জেগেছে। কোটালকে ডেকে বললেন, একে নিয়ে যাও, চোখ দুটো তুলে নিয়ে বনে ছেড়ে দিয়ে এসো।
শুক বললে, ‘ময়নাসুন্দরী আমার যা বলার তা বলা হয়ে গেল। মোদ্দা কথা হল, নারী জাতিকে বিশ্বাস করা কখনওই উচিত নয়, করেছ কী মরেছ। এই গল্পটি বলিবার উদ্দেশ্য, নারীরা পুরুষকে বাদ দিবার জন্য ঘোরতর আন্দোলনে নামিয়াছেন, মাগি-রন্ধনে নিযুক্ত আমার অধ্যাপিকা স্ত্রীও সেই আন্দোলনে শামিল হইয়াছেন। কাগজের মণ্ড হইতে প্রস্তুত বীভৎস একটি রাক্ষসের মুখোশ আনিয়া বসিবার ঘরের দেয়ালে। ঝুলাইয়া বুঝাইতে চাহিতেছে উহা আমারই ভিতরের মুখ। পুরুষকে তাঁহারা কী বাদ দিবেন, বহু পূর্ব হইতেই পুরুষ তাহার জীবন হইতে নারীকে বাদ দিবার জন্য বহুবিধ প্রচেষ্টা চালাইতেছে। পারিতেছেন না, কারণ ষণ্ডের স্বভাব উপদেশের মণ্ডা খাইলেও শোধরাইবার নয়। পূর্বে যখন শহরে ষণ্ডদের অবাধ বিচরণের সুযোগ ছিল তখন দেখিয়াছি, বাঁধাকপির পাতা চিবাইতে চিবাইতে বিশাল ষণ্ড ধিতিং ধিতিং করিয়া গাভীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়াছে। লাজলজ্জা নাই। স্মরণে নাই, কোন দেবতার বাহন!
তাহা হইলে সমর সেন মহাশয়ের ‘বাবু বৃত্তান্ত’ হইতে কিয়দংশ উদ্ধৃত করিতে হয় পুরুষের মানসিকতা স্পষ্ট করিবার জন্যে। ‘উত্তরদিকে অস্বচ্ছল ব্রাহ্মণ পরিবারের একটি মেয়েকে দেখার জন্যে সন্ধেবেলায় আমাদের চারতলার নেড়া ছাদে ভিড় হতো। মেয়েটির নাম ইতি, পাকা সোনার মতো রং, দেহের গড়ন দেখার মতো, বিশেষ করে সাঁঝের বেলায় গা ধোওয়ার পর যখন শাড়ি মেলে দিতে আসতো। দাদার বন্ধু বড়লোক ব্রাহ্মণ যুবক বিয়ের প্রস্তাব পাঠান, কিন্তু কৌলীন্যের দাপটে কন্যাপক্ষ রাজী হননি। পশ্চিম দিকের বাড়িতে তেতলা ঘরে রাত্রে নীল আবছা আলোয় একজন অ্যাটর্নি তার নধর স্ত্রীর সঙ্গে ভারতচন্দ্রীয় রতিরঙ্গে মত্ত হতেন, বড়োরা বলতো, ‘rolling stone gathers no moss.’
বিভিন্ন গ্রন্থাদি পাঠ করিয়া নিজেকে আবিষ্কার করিবার চেষ্টা করিয়াছি। নারীর আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। পজেটিভ ও নেগেটিভের ব্যাপার। প্লাস ঘুরিতেছে মাইনাসের জন্যে। প্লাস ষণ্ড, মাইনাস প্রকৃতি। যতক্ষণ না মাইনাস জুটাইতে পারিতেছে ততক্ষণ নানা অনাসৃষ্টি করিয়া বেড়াইবে। ছাতে উঠিয়া রমণীর স্নানদৃশ্য দেখিবে, বাসে চড়িয়া ঘনিষ্ট হইবার চেষ্টা করিবে। বন্ধুর বিবাহে বরযাত্রীর সঙ্গী হইয়া বিবাহবাসরে নেগেটিভ দেখিয়া আবোলতাবোল বকিবে। শেকসপিয়ার তথার্থই লিখিয়াছিলেন—
She’s beautiful and therfore to be wood/ she is a
woman, therfore to be won.
আমি আমার স্ত্রীকে জয় করিবার জন্য যাহা করিয়াছিলাম তাহা ভাবিতে এই প্রবীণ বয়সে কামরাঙা হইয়া যাই। ময়দানের বিশাল বৃক্ষমূলে বসিয়া সোহাগের কথা বলিতাম। কবিতা আবৃত্তি করিতাম। ঘষড়াইয়া তাহার সহিত ঘোঁতঘোঁতে অবস্থায় আসিবার চেষ্টা করিতাম। পুলকে আমার শরীর শিহরিত হইত। আবেগে চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হইত। ভাবিতাম—
Love is an activity, not a passive affect; it is ‘standing in’, not a ‘falling for রাসেল হইতে উদ্ধৃত করিতাম, I regard love as one of the most important thing in human life, and I regard any system as bad which interferes unnecessarily with to free development. বলিয়াই তাহার হাত খামচাইবার চেষ্টা করিতাম, আর সে সঙ্গে সঙ্গে বলিত, ‘ছিঃ ছিঃ, কমিট নো নুইসেন্স ইন দি পাবলিক প্লেস।’ তখনই আমার বোঝা উচিত ছিল, ওই নারীর মধ্যে নারীবাদ সুপ্ত আছে। কালে উগ্ররূপ ধারণ করিবে। তথাপি শেকসপিয়ার যাহা বলিয়াছেন, Love looks not with the eyes, but with the mind / And therefore is cupid painted blind. মন ওই রমণীতে এমনই মগ্ন হইল যেন কালীদহের কে হাতি পড়িয়াছে। বৃক্ষমূলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়া, থাকিয়া। থাকিয়া বলিতাম, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাসো!’ প্রত্যুত্তরে রমণী কিছুই বলিত না। দন্ত্যাগ্রে দুর্বাদি তৃণখণ্ড কাটুসকুটুস করিয়া কাটিত ও থুকুস থুকুস করিয়া ছিটাইত। কখনও বলে নাই, ইয়েস, আই অলসো লাভ ইউ। আমার সুহৃদরা আমাকে এই বলিয়া আশ্বস্ত করিয়াছিল, রমণীরা মুখে প্রেম শব্দটি উচ্চারণ করিতে লজ্জা পায়। লাভ ও টয়লেট-দুটি শব্দই তাহাদের কাছে। সমার্থক। তাহাদের ভিতরে প্রেম থাকে, যেমন কচুরির মধ্যে ডালের পুর থাকে। বাহির হইতে ফসকা লুচি মনে হইলেও রমণীরা আসলে কচুরি জাতীয় প্রাণী। স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, সেবা, আনুগত্য, সহমর্মিতার পুঁটলি। যথা নিয়মে ব্যবহার করিতে পারিলে অপার শান্তি। উলটো দিকে ঘর্ষণ করিলেই অনর্থ। স্বামী বিবেকানন্দ বলিলেন, ‘একটি পবিত্র নূতন। জীবকে জগতে আনিবার জন্য স্বামী ও স্ত্রী-র মিলন—সুতরাং ভগবানের নিকট উহা তাহাদের এক সৰ্বোচচ মিলিত প্রার্থনা।’ এ কি কৌতুক? এ কি শুধু ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তি না পশুপ্রবৃত্তির চরিতার্থতা? হিন্দু বলে, ‘না, না, কখনওই না।’
