ময়না বললে, এরও জবাব আছে। শুক বললে, দাঁড়াও, আমার গল্প এখনও শেষ হয়নি। রাজা প্রাসাদে ফিরে এসে ভাবছেন, কী করা যায়! মরতে যখন হবে তখন মরতেই হবে, তবু দেখে যাব ব্রাহ্মণের দেওয়া দ্বিতীয় কাগজের নির্দেশ পালন করে কী হয়! শত্রুকে সম্মান জানাতে বলেছেন। সাপই এখন পরম শত্রু। সকালে প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। রাজা বললেন, আজ রাত দশটার সময় একটা সাপ আসবে আমাকে কামড়াতে। শিবমন্দিরের পাশের বটগাছের কোটরে সাপটা থাকে। সেই গর্ত থেকে আমার বিছানা পর্যন্ত গোটা পথটা আপনি আপনার কর্মচারীদের দিয়ে পরিষ্কার করান। আতর ছড়িয়ে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ঢেকে দিন, আর পথের দু-পাশে সারি সারি সুন্দর বাটিতে সুগন্ধী দুধ রাখুন।
‘রাত দশটার কিছু আগে সাপ বেরিয়ে এল গর্ত থেকে। ভীষণ তার রাগ। পূর্বজন্মের হত্যাকারীর আজ শেষ দিন। কিন্তু সাপ তো অবাক। এ কী ব্যাপার! যেদিকেই তাকাচ্ছে, গোলাপ আর গোলাপ, সুগন্ধ। সার সার বাটিতে সুগন্ধী দুধ। শত্রুকে কি এইভাবেই সম্মান জানাতে হয়!
‘রাজবাড়ির ঘড়িতে ঠিক রাত দশটা। সাপ এসে ঢুকল রাজার শয়নকক্ষে। বিছানায় প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন রাজা। সাপকে দেখে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আপনার অপেক্ষাতেই বসে আছি, আসুন দংশন করুন।
‘সাপ সমস্ত শত্রুতা ভুলে রাজাকে বললে, মহারাজ! সব শত্রুতা আমি ভুলে গেছি। এমন উদার, অপূর্ব ধার্মিক রাজা পৃথিবীতে সম্ভব! ধন্য আপনার পিতামাতা। আপনি সুখে রাজত্ব করুন। সাপ তুষ্ট হয়ে রাজাকে ক্ষমা করে চলে গেল।
‘রানি তখন অবাক হয়ে জিগ্যেস করছেন—মহারাজ! আপনি আগেই কীভাবে জানলেন, সাপ আপনাকে কামড়াতে আসবে! রাজা বললেন, রানি সেই কথাটা তুমি জানতে চেয়ো না। আমি যদি তোমাকে বলি, তাহলে আমি পাথর হয়ে যাব। রানি কিন্তু নাছোড়বান্দা। ভীষণ তাঁর কৌতূহল। রাজাকে বলছেন, সে আপনি পাথর হোন আর যাই হোন, আপনাকে বলতেই হবে। তা হলে, আমি আত্মহত্যা করব।
রাজা বললেন, বেশ, তাই যখন তোমার ইচ্ছে, তখন সকাল না-হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে থাকো। পাথর আমাকে হতেই হবে। কাল সকালে গঙ্গার ধারে পবিত্র জায়গায় দাঁড়িয়ে তোমাকে বলব। সেইখানেই আমি পাথর হয়ে থাকব।
‘রানিকে সবাই খুব বোঝালে, রাজা যদি পাথরই হয়ে যান, তাহলে শুনে আপনার লাভটা কী হবে! ক্ষতিই তো হবে! রানি বলে আপনাকে কে আর তখন সম্মান করবে! রাজাকেও বোঝানো হল। তিনিও বুঝতে চাইলেন না। রানির প্রেমে অন্ধ। রানিকে ছেড়ে তিনি এক মুহূর্তও থাকতে পারবেন না। তার আত্মহত্যার চেয়ে নিজের পাথর হয়ে যাওয়া ভালো। রানিকে তিনি বলতেই পারলেন না, কেন তুমি এমন অবুঝ হচ্ছ। আসক্তি এমনই জিনিস, বুঝেছ ময়না।
‘সকালবেলা গঙ্গার ধারে দৃশ্য প্রস্তুত। রাজ্যসুদ্ধ লোক সেখানে এসে গেছে। তাদের প্রিয় রাজার কী হয় দেখার জন্যে। পাথর হয়ে যাওয়া মানেই রাজার মরে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী তখনও রানিকে বোঝাচ্ছেন, পাথর হয়ে গেলে এমন সুন্দর রাজা কি আর দুটো হবেন, তিনি তো সিংহাসনে। বসেই আপনাকে দূর করে দেবেন। জেদি, একগুঁয়ে মেয়েদের জীবনে কিন্তু অনেক দুঃখ লেখা থাকে।
‘রানি বললেন, তেমন কোনও উদাহরণ আমার জানা নেই মহামন্ত্রী।
‘মন্ত্রী বললেন, তাহলে শুনুন, সুরসেন নামে এক নগরের রাজার নাম ছিল রূপদত্ত। তিনি নিজে যেমন সুন্দর ছিলেন, তাঁর স্ত্রী চন্দ্রকান্তাও ছিলেন ভীষণ সুন্দরী। সুন্দরী হলে কী হবে। মেয়েটির স্বভাব-চরিত্র মোটেই ভালো ছিল না। বিয়ের আগে থেকেই তার একজন প্রেমিক ছিল। চন্দ্রকান্তা সেই প্রেমিককে হিজড়ে সাজিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে এল। রাজা রূপদত্তের কোনও সন্দেহ হল না। রানির সেবার জন্যে একজন হিজড়ে আসতেই পারে। কিন্তু তা তো নয়। রাজা রাজকার্যে বাইরে গেলেই চন্দ্রকান্তা তার প্রেমিকের সঙ্গে রপ্টারপ্টি কাণ্ড করে। দু-নম্বরী তো বেশি দিন চাপা থাকে না। রূপদত্ত একদিন জড়াজড়ি অবস্থায় দুজনকে ধরে ফেললেন। বউকে বললেন, একে তুমি ছাড়তে পারবে? বউ বললে অসম্ভব! ওকে আমি আমার হৃদয় দিয়েছি। রূপদত্ত বললেন, বহত আচ্ছা! তুমি তাহলে আমাকে তোমার নাক আর কান দুটো দিয়ে বনে চলে যাও। নাক-কান কাটা চন্দ্রকান্তা গেল বনে, আর তার সোহাগের প্রেমিককে চড়ানো হল শূলে।
‘প্রধানমন্ত্রী কাহিনি শেষ করে বললেন, তা হলে একবার ভেবে দেখুন, শাস্ত্র বলছে, রাজা আর যোগী, আগুন আর জল বিপরীতধর্মী, যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ তাদের পিরিতি খুব অনিশ্চিত।
‘মন্ত্রীর কথায় কোনও পাত্তাই দিলেন না রানি। যা হয় হবে, আমি জানবই। রানির প্রেমে রাজা অন্ধ। শেষ মুহূর্তে অনেকেই অনেক রকম বোঝাল! মন্ত্রীরা বলতে লাগলেন, মহারাজ! আপনি এমন বিচক্ষণ, প্রজাদরদি, জ্ঞানী, ধার্মিক, আপনি একটি মেয়ের কথায় নাচছেন! এই রানি আত্মহত্যা করলে, এর চেয়ে ভালো আরও দশটা রানি আপনাকে এনে দেব। আপনি বিবেচকের মতো কাজ করুন। রাজা রানির মোহেবুদ। পরিষ্কার বললেন, ওকে ছাড়া আমার বেঁচে থাকা অসম্ভব! সবাই তখন হাল ছেড়ে দিলেন। যা হতে চলেছে তাই হোক।
‘রাজা গেলেন গঙ্গাস্নানে। স্নান করে পবিত্র হয়ে চিরকালের মতো পাথর হয়ে যাবেন। শেষবারের মতো গঙ্গাদর্শন করবেন প্রাণ ভরে। তাই বসলেন তীরে। এমন সময় কোথা থেকে একপাল। ছাগল এল জল খেতে। সব ছাগলই জল খেয়ে চলে যাচ্ছে, কেবল একটা ছাগল জলের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়েই আছে। তখন দলের কর্তা ছাগলটা এসে জিগ্যেস করছে, তোর আবার কী হল! ছাগলীটা স্রোতে একটা ফল ভেসে যাচ্ছে দেখছে। সে বললে, ওই ফলটা আমাকে না এনে দিলে যাব না। ছাগল কর্তা বলছে, এনে তো দেব; কিন্তু আমি যদি ডুবে যাই! ছাগলীর। বায়না, তোমার যাই হোক, ফলটা না এনে দিলে আমি নড়ব না। ছাগল কর্তা তখন খেপে আগুন। চোখ দুটো জবাফুলের মতো লাল। কর্তা ছাগল বলছে, শোন, আমাকে তুই রাজা অঙ্গধ্বজের মতো বোকা পাঁঠা ভাবিসনি, যে বউয়ের কথায় নাচতে নাচতে চলে এল গঙ্গার ধারে জীবন। দিতে। তুই তাহলে এখনও আমাকে ঠিকমতো চিনতে পারিসনি। ওই সব ছেনালি রাখ। চল। দামড়া ছাগল ছাগলীটাকে গুতোতে গুতোতে দলের দিকে নিয়ে চলল।
