‘Frailty, thy name is woman’ বিশ্বস্ত না থাকাটাই নারীর ধর্ম। ইহা অবশ্য নারীর কথা নহে; পুরুষের দর্শন।
একটি লোককাহিনি এই প্রসঙ্গে মনে আসিতেছে। অনেকটা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী অথবা শুক-শারির কাহিনির মতোই। হিন্দি ভাষায় প্রচলিত এই নামে—কিসসা তোতা ময়না। সারা দিবস ওড়াউড়ি করিয়া, ক্লান্ত শুক একটি বৃক্ষশাখায় আসিয়া রাত্রির বিশ্রামের জন্য বসিল। সেই বৃক্ষে একটি স্ত্রী। ময়না বসবাস করিত ও সেই পক্ষীটি ছিল ঘোরতর নারীবাদী, যাহাকে একালে আমরা বলিতেছি, ‘ফেমিনিস্ট’। ময়না গালগলা ফুলাইয়া, পুরুষ শুককে বলিল, ‘ওহে শুক, এখান থেকে কেটে পড়ো। মদ্দাদের আমি সহ্য করতে পারি না। তারা অসভ্য, ইতর, চামার, নিষ্ঠুর, অবিশ্বাসী। দেখলেই আমার পিত্তি চটে যায়, গা রি রি করে। তোমার সঙ্গে একই গাছে রাত কাটাতে আমার ঘেন্না করবে।’
শুক তখন পুরুষদের পক্ষে লড়াই করিবার জন্য বলিল, ‘ময়নাসুন্দরী, মেয়েরাও কিছু কম যায় না, তাহলে শোনো বলি, ‘কাঞ্চনপুরায় অঙ্গধ্বজ নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর রানির নাম ছিল চন্দ্রপ্রভা। রানি খুব ধার্মিক আর পতিপরায়ণ ছিলেন। একদিন এক ব্রাহ্মণ কোথা থেকে এসে রাজা অঙ্গধ্বজকে দু-টুকরো কাগজ দিয়ে চলে গেলেন। একটাতে লেখা রয়েছে যে রাজা সারারাত জেগে থাকতে পারে, সে খুব ভালো ফল পায়। দ্বিতীয় টুকরোয় লেখা আছে—যে। শত্রুকে সম্মান জানাতে পারে তার সমস্ত অপরাধ খণ্ডন হয়ে যায়।
দিন যায়, হঠাৎ রাজার মনে হল, দেখাই যাক ব্রাহ্মণের নির্দেশ পালন করলে কী হয়! ঠিক করলেন, সারা রাত জাগবেন সেদিন। রাজপ্রাসাদে জেগে বসে আছেন রাজা। গভীর রাত। হঠাৎ কানে এল, প্রাসাদের বাইরে কোনও মহিলা কাঁদছে। আমি মানুষের দুঃখ দূর করতে পারিনি। আমি ব্যর্থ। রাজা ছুটলেন। কান্নার শব্দ অনুসরণ করে গিয়ে দেখলেন, এক বৃদ্ধা কাঁদছে। রাজা দুঃখের কারণ জানতে চাইলেন। বৃদ্ধা বললেন, পথিক তুমি যেখানে যাচ্ছ যাও, ভগবানেরও ক্ষমতা নেই আমার দুঃখ দূর করেন। শেষে রাজার ঝোলাঝুলিতে বৃদ্ধা বললেন, একটি শর্তে তোমাকে বলতে পারি, তুমি যা শুনবে কারও কাছে বলবে না। যদি বলো, তাহলে তুমি পাথর হয়ে যাবে। রাজা বললেন, ঠিক আছে মা, তুমি বলো, আমি কারওকে বলব না। বৃদ্ধা তখন। বললেন, পুত্র! আগামীকাল রাত দশটার সময়, রাজা অঙ্গধ্বজকে সাপে কামড়াবে। রাজা মারা যাবেন। এমন ধার্মিক রাজা আর আমরা পাব কোথায়। তাই আমি কাঁদছি পুত্র! রাজা জিগ্যেস করলেন, মা সাপটা আসবে কোথা থেকে? বৃদ্ধা বললেন, এই নগরের পশ্চিমদিকের সিংহদুয়ারের বাইরে যে শিবমন্দির আছে, তার পাশেই আছে একটা বটগাছ। সেই বটের কোটরে সাপটা থাকে। সাপটার সঙ্গে রাজার পূর্বজন্মের শত্রুতা। এইবার সে বদলা নেবে! রাজা প্রশ্ন করলেন, মা, সাপের সঙ্গে রাজার কীসের শত্রুতা? বৃদ্ধা তখন রাজার পূর্বজন্মের বৃত্তান্ত বললেন। পুত্র! আমাদের রাজা পূর্বজন্মে এক বণিক ছিলেন, নাম ছিল মণিসেন। তাঁর স্ত্রী-র নাম ছিল কেশর। কেশরের বয়েস তখন কুড়ি, আর পরমাসুন্দরী। মণিসেন একদিন বাণিজ্যে গেলেন। স্ত্রীকে রেখে গেলেন আঠেরো বছর বয়সের এক ভৃত্যের তত্বাবধানে। মণিসেন বাণিজ্যে গেলেন। বাড়িতে কেশর আর গৃহভৃত্য। হঠাৎ কেশরের একদিন ভীষণ দেহ-বাসনা জাগল। কিছুতেই নিজেকে। আর ধরে রাখতে পারে না। শেষে শোবার ঘরে ভৃত্যকে ডেকে বললে, বিছানায় বোসো। আমার পাশে বোসো। তারপর পরিষ্কার বললে, আমি তোমাকে চাই। এখুনি চাই। ভৃত্য প্রস্তাব শুনে কেঁদে ফেলেছে, হাতজোড় করে বলছে, আমি পারব না। আপনি আমার মা। আমি বড়দের কাছে শুনেছি, যিনি অন্নদাতা তিনিই পিতা অথবা মাতা। প্রভুপত্নীর সঙ্গে গর্হিত কাজের পরিণাম, নরকবাস। কেশর তো তখন ভীষণ কামার্ত। ভৃত্যকে বলছে, যা বলছি, তা যদি না করি, তাহলে ফল কিন্তু খুব খারাপ হবে। ছেলেটিকে খুব ভয় দেখাল, সে কিন্তু কিছুতেই রাজি হল না। কিছুদিনের মধ্যেই বণিক মণিসেন ফিরে এলেন। কেশরের খুব চিন্তা হল, ছেলেটা যদি স্বামীকে সব কথা বলে দেয় তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। এমন একটা কিছু করতে হবে, যাতে ছেলেটার মুখ বন্ধ হয়, আর তাকে প্রত্যাখানের জন্যে যেভাবে অপমানিত হয়েছে তার উচিত সাজা পায়। ছেলেটা কেশরকে অপমান করেছে।
‘মণিসেন বিষণ্ণ স্ত্রীকে জিগ্যেস করলেন, প্রিয়ে! তোমার কী হয়েছে, ফিরে এসে দেখছি, সদাই বিষণ্ণ, কীসের দুঃখ তোমার, আমাকে বলো।’ কেশর বলছে প্রভু! তোমার বাড়িঘর তুমি বুঝে। নাও, আমি আত্মহত্যা করব। মণিসেন বলছেন, সে কী! কী হয়েছে! তুমি আমাকে খুলে বলল। কেশর একেবারে উলটো কথাটি বললে, আপনি যখন ছিলেন না, তখন একদিন রাতে, ছাতে বিছানা পেতে শুয়ে আছি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, দেখি, আপনার চাকর আমার বুকে চেপে বসে আসে। আর বেশি দূর এগোবার আগেই আমার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এল। আমি লজ্জায় তাদের আর কিছু বলিনি। বলেছিলুম, ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠেছি। মণিসেন সেইরাতেই। ভৃত্যকে খুন করে মাটিতে পুঁতে দিলেন। এই জন্মে সেই মণিসেনই অঙ্গধ্বজ, আর সেই গৃহভৃত্যই সাপ হয়ে জন্মেছেন।
‘বৃদ্ধার কথা শুনে রাজা অঙ্গধ্বজ প্রাসাদে ফিরে এলেন। শুক বললে, তাহলে দেখো ময়না, মেয়েরা কী সাজ্জতিক। নিরপরাধ, প্রকৃত ধার্মিক একটি ছেলের মৃত্যুর কারণ হল। ময়না বললে, মানতে পারলুম না। তোমার এই কাহিনিতে, নারী ও পুরুষ দুজনেই সমান অপরাধী। মণিসেন স্ত্রৈণ ছিল। সুন্দরী স্ত্রী-র ভেড়ুয়া। তার উচিত ছিল স্ত্রী-র কথা যাচাই করা। শুক বললে, তোমার এই কথায় আমার কথাই জোরদার হচ্ছে। মেয়েরা কত ভয়ংকর বোঝো একবার। কীভাবে মোহজাল বিস্তার করে। পুরুষকে কীভাবে বশ করে ফেলে বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। গলা জড়িয়ে ধরে, মিষ্টি কথা বলে, দেহের ফাঁদে ধরে যে-কোনও কাজই করাতে পারে।’
