আমার কথাতেই আবার ফিরিয়া আসি।
আমার ভবিতব্য স্ত্রী-র সহিত বিশ্ববিদ্যালয়ে একদা পঠিতব্য অবস্থায় ছিলাম। যৌবনের স্বাভাবিক ধর্মে প্রথমে চক্ষুতে চক্ষুতে ঠোকাঠুকি, তৎপরে ঠোঁটের কোণে কোণে ফিচিক ফিচিক হাসি। অবশেসে সাহস কিঞ্চিত বাড়িবার পর ‘ক্লাসে প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় অঙ্গে অঙ্গ ঘর্ষণ।
বলিতে দ্বিধা নাই কসরত আমিই অধিক করিয়াছিলাম। জীবজগতের তাহাই নিয়ম। এক বর্ষার দ্বিপ্রহরে শান্তিনিকেতনে এক ময়ূরকে সারাবেলা পেখম মেলিয়া নাচিতে দেখিয়াছিলাম। নাচিতে নাচিতে তাহার পেখম খুলিয়া পড়িতেছিল, ময়ূরী কিন্তু দৃকপাত করিতেছিল না। নিষ্ঠুর রমণী ‘চিউইংগাম’ চিবাইতেছিল। ময়ূরের কষ্ট দেখিয়া আমিই বারকতক বলিলাম—’আই লাভ ইউ।’ উদ্যানপালককে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘মহাশয়! কবে মিলন হইবে! আদৌ হইবে তো!’
তিনি বলিলেন, ‘হবে না মানে। আলবাত হবে। ছলা, কলা, ছোমা—এই হল মেয়েদের ধর্ম। না হলে ময়ূর, বাঘ, সিংহ, বেড়াল, সব তো লোপাট হয়ে যেত। জন্তু শ্রেণির স্ত্রী জাতির উদ্দেশে উদ্যানপালকের এবম্বিধ মন্তব্যে একটি ক্ষোভ ছিল। পরে আমি রহস্য উদ্ধার করিতে সক্ষম হইয়াছিলাম। তাঁহার এই আকাট উত্মার লক্ষ্যে ছিলেন এক নারী। গত তিন বছর ধরিয়া সেই মোহিনী ল্যাজে খেলিতেছেন, বিবাহবন্ধনে ধরা দিতেছেন না। সন্নিকটে আসিয়া আবার সরিয়া যায়। সন্ধ্যাকালে পেটে দু-একপাত্র পড়িবামাত্র তাঁহার হৃদয়ের দুয়ার খুলিয়া গেল। তাঁহার প্রেমিকার নাম রোহিণী। আমি সেই নায়িকাকে দর্শনও করিয়াছিলাম। বলিতে দ্বিধা নাই, দেহবোধে আমিও অতিশয় কাতর হইয়াছিলাম। তখন আমার ঠোঁটে কবিতার পর কবিতা খেলা করিত। তখন আমিও প্রেম নামক দ্বাপরীয় দুর্বলতায় কাতর। নারীকে চিনিতে ও গ্রহণ করিতে শিখিয়াছি। এই বোধে উপনীত হইয়াছি—পৃথিবী মানে শ্যামল, সবুজ বৃক্ষরাজি, কলস্বনা নদী, নীল আকাশ, চন্দ্রকিরণ ও নারী। প্রেমের কারণেই আগমন। জমিয়া গেলে সংসার, ভাঙিয়া। গেলেই আত্মহত্যা অথবা সমাজসেবা। সেই কারণেই রোহিণীকে দর্শনমাত্রেই রাম বসুর এক চরণ কবিতা ভিতরে গুড়গুড় করিয়া উঠিল, ‘দেখল ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ফলসা রঙা মেয়ে।’ সেই মেয়েটি কেমন! না, ‘জোয়ার-লাগা নদীর মতো ভরাট কূলে কূলে।’ আমার মনে হইতেছিল, উদ্যানপালক গাজন মালীকে দ্বৈরথে পরাস্ত করিয়া রোহিণীকে লইয়া পলায়ন করি, পর্বতের সানুদেশে কুটীর নির্মাণ করিয়া, মেষপালন করি ও বজরার রুটি খাই। তাহার কবরীবন্ধন, ‘দাওয়ার খুঁটি দুহাতে ধরে স্বপ্ন দেখা মেয়ে।’ শরীরের তরঙ্গ ভঙ্গ। তির ছুড়িবার কায়টা, মদ্য না পান করিয়াও দেহসুরায় মাতাল হইলাম,
‘বুকের মধ্যে পেঁকির পাড়, বাজল দূরে শাঁখ
নদীর বাঁকে শুনতে পেল চোদ্দ জয়ঢাক।
চমকে দিয়ে বললে তারে, ‘কনে,
চন্দ্রহার গড়িয়া দেব পৌষ-পারবণে।
নদীর কাছে দান চাইলাম, তোমায় পেলাম বৌ
তুমি আমার পদ্মবিলের মৌ।’
আমার সহপাঠিনীর প্রতি অন্যান্য সহপাঠীদেরও খর দৃষ্টি ছিল। থাকিতেই পারে। পুরুষ জাতি মক্ষিকার ন্যায়। কর্তিত ফল অথবা নিবেদিত মিষ্টান্ন অথবা মুদির দোকানে ভেলি গুড়ের বস্তার চারিপার্শ্বে ভ্যান ভ্যান করিবেই। এই মক্ষিকাদের অনেকেই পুঁজির জোর বেশি থাকায় আমার ওপর ‘অ্যাডভানটেজ’ লইবার চেষ্টায় ত্রুটি করে নাই। জোড়া জোড়া কাটলেট, ডবল ডবল আইসক্রিম ও অন্যান্য উপহার সামগ্রী সহায়ে তাহারা একটা কিছু করিতে চাহিতেছিল। একটি এলোকেশী বার্তাকু, অথবা অলাবতে, কিংবা পেয়ারায় কীট প্রবেশ করিবেই। করিয়া, প্রেম। করিবে না, কুরিয়া কুরিয়া খাইবে। ভোগ করিবে। নারী পুরুষদের এবম্বিধ লম্পট প্রকৃতির কথা সৃষ্টির মুহূর্ত হইতেই অকাত আছে। একালের নারীবাদী কবিরা প্রাবন্ধিকরা যাহা লিখিতেছেন তাহা শতকরা একশো ভাগ সত্য। পুরুষ শুণ্ডধারী জলশুক্তির ন্যায়, রোঁয়াধারী শুককীটের ন্যায়, গুম্ভ বাহিয়া, পদদ্বয়ের মসৃণ ত্বক বাহিয়া কিলিবিলি করিতে করিতে, জঘনে আসিয়া যাবতীয় জঘন্যকার্য করিবার জন্য আকুলিবিকুলি করিতে থাকে। দুর্গন্ধী রোমশ ঋক্ষের ন্যায় দেহকাণ্ড জড়াইয়া ধরিয়া অন্ধ উল্লুকের ন্যায় নাভিদেশে, গ্রীবায়, কর্ণমূলে ঠোকরাইতে থাকে। উল্লুকের ন্যায় উকু উকুশব্দে কোমল বক্ষদেশ খাবলাইতে থাকে। কমঠের ন্যায় যত্রতত্র দংশন করিতে করিতে একসময় ক্লান্ত সারমেয়ের ন্যায় ল্যাতকাইয়া পড়ে। নগরপাল, ধর্মপাল, রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপাল, ক্ষেত্রপাল—সকলেরই এক অবস্থা। রমণীর রমণীয় শরীর দেখিবামাত্র ‘দুই চক্ষু জিনি নাদান ঘুরের যেন কড়ি ভাঁটা।’ ডেমোস্থেনিস উত্তম বলিয়াছিলেন, আমারও বলিতে বাসনা হইতেছে,
Man has the hetaire for erotic enjoyment, concubines
for daily use, and wives of his own rank to bring up
childern and to be faithful housewives.
পাঠদ্দশায় আর যাহাই হউক, কনকুবাইনই বা কোথায় ওয়াইফই বা কোথায়! পাশ করিব, চাকরি করিব, তৎপরে পিতামাতা আমার জন্য বধূ ধরিয়া আনিবেন। চড়াই পাখির মতো সামান্য প্রেমই ভরসা। আমার ভবিতব্য স্ত্রীকে ঘিরিয়া যখন হলুদ বোলতারা উড়িতেছিল, তখন প্রশ্ন আসিয়াছিল, রমণীরা কি সত্যই প্রেমে পড়েন? একই সঙ্গে এতগুলি ছাগলকে যিনি চরাইতে পারেন, তিনি তো রাখাল। রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। উচ্চাঙ্গের একটি উপমা মনে আসিয়াছিল—যথা, ‘নারী কি সরোবর?’ জলে মানুষ পড়ে। পড়িয়া, সন্তরণবিদ্যা আয়ত্তে না থাকিলে, হাবুডুবু খাইয়া, পেট ফুলিয়া, লাংস ফাটিয়া মরিয়া যায়। জল কি কখনও মানুষে পড়ে! তখন শেকসপিয়ার পড়িতেছিলাম, দেখিলাম ক্ষুব্ধ হ্যামলেট বলিতেছেন,
