মনু নারী সম্পর্কে কী কহিলেন!–
বালয়া বা যুবত্যা বা বৃদ্ধয়া বাপি ঘোষিতা।
ন স্বাতন্ত্রোণ কর্তব্যংকিঞ্চিং কার্যং গৃহেস্বপি।।
বাল্যে পিতুর্বশেতিষ্ঠেৎ পাণিগ্রাহস্য যৌবনে।
পুত্ৰাণাং ভর্তরি প্রেতে না ভজেৎ স্ত্রী স্বতন্ত্রতাম।।
আমি ব্যাখ্যা করিতেছি, ‘নারী বালিকাই হউন, যুবতিই হউন, বৃদ্ধাই হউন, গৃহের কোনও কার্যে স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিবেন না। নারী বাল্যে পিতার বশে, যৌবনে স্বামীর বশে এবং স্বামী মৃত হইলে পুত্রের বশে থাকিবে-কদাচ স্বাতন্ত্র অবলম্বন করিবে না। অন্যত্র এই একই কথা পুনরায় আবার বলিলেন অন্যভাবে–
পিতা রক্ষতি কৌমারে, ভর্তা রক্ষতি যৌবনে।
রক্ষতি স্থবিরে পুত্রান স্ত্রী স্বাতন্ত্রমহতি।।
নারীকে কৌমারে পিতা, যৌবনে পতি, এবং স্থবিরে পুত্রেরা রক্ষা করিবে। স্বাতন্ত্র নারীর পক্ষে ভালো নহে।
ধোলাইকৃত এই মগজ লইয়া পরিবারে পরিবারে কন্যাদেরও মগজ ধোলাইয়ের ব্যবস্থা প্রবাহের মতোই চলিয়া আসিতেছে। আশ্চর্যের বিষয় মাতারাই কন্যাকে সর্বাধিক শাসন করিয়া থাকেন। নারী স্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী মাতারাই। বাল্যে দেখিয়াছি আমার জ্যেষ্ঠা ভগিনী পেয়ারাতরুতে আরোহণ করিয়া ডালপালা ভাঙিয়া, কোনও একটি শাখায় শাখামৃগীর মতো পদদ্বয় প্রলম্বিত করিয়া মনের সুখে কষকষ করিয়া পেয়ারা চিবাইয়া থুথু করিয়া ফেলিত, তখন আমার মাতা রণরঙ্গিনী মূর্তি ধারণ করিয়া বলিতেন, ‘মনে রাখিস শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। মদ্দা মেয়েকে কেউ নেবে না। বছর না ঘুরতেই নড়া ধরে বাপের বাড়িতে বসিয়ে দিয়ে যাবে।’ পরবর্তীকালে সবিস্ময়ে লক্ষ করিলাম দিদি মা হইবার পর তাহার কন্যাকে ধিঙ্গি বলিয়া তিরস্কার করিতেছে ও ভবিষ্যতে শ্বশুরালয়ে তাহার কী দুরবস্থা হইবে, তাহা ভাবিয়া কপাল চাপড়াইতেছে। পব্রিতা পতিরতা অবিরত সুশীলতা এই ছিল নারীর আদর্শ।
প্রসঙ্গে ফিরিয়া আসি, যে পুস্তকটি উলটাইতেছিলাম, তাহা হইল মানুষের ইতিহাস। যে চিত্রটি দেখিয়া অধোবদন হইয়াছিলাম, তাহা এইরূপবল্কলধারী এক ভয়ংকর অমার্জিত পুরুষ, অর্ধোলঙ্গ এক নারীর কেশ আকর্ষণ করিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিয়া লইয়া চলিয়াছে। রমণী ভূপাতিত। পুরুষটি বন্য। শ্মশ্রু, গুম্ভ ও কেশের জটাজালে মুখ প্রায় অদৃশ্য। দুইটি দন্ত বাহির হইয়া আছে। এক হস্তে প্রস্তরনির্মিত কুঠার। প্রস্তর যুগের দৃশ্য। পুরুষটির শরীরের বন্য দুর্গন্ধ। আমার ঘ্রাণে আমি পাইতেছি। কোলনযুক্ত আধুনিক সাবানে গাত্রমার্জনা করিয়া একটি জিন্সের প্যান্ট ও ঢিলাঢালা টি-শার্ট পরাইয়া হাতে একটি গিটার ধরাইয়া দিলে একালের বিটলস হইতে পারিত। রমণীটিকে তেমনভাবে সাজাইতে পারিলেই একালের ব্লকবাস্টার হিন্দি ছায়াছবির ধর্ষিতা নায়িকা। সামান্য রকমফের করিতে পারিলেই চরিত্র দুটি আর্টের মর্যাদা পাইত অবশ্যই। আমাকেও অধোবদন হইতে হইত না; কিন্তু উহা তো আর্ট নহে। আদি মানবের জীবন। ক্ষণকাল পূর্বে কাঁচা শূকরের মাংস ভক্ষণ করিয়াছে। তাহার পরে কাম তাড়িত হইয়া কোনও এক গোষ্ঠীর স্ত্রীলোকটিকে বাহুবলে ঘষড়াইতে ঘষড়াইতে লইয়া চলিয়াছে। ইহা রিরংসা। ওই পুরুষটিই তো কালের পথ ধরিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে নরসুন্দর সেলুনে আসিয়া চুলে ‘দশ আনা ছ আনা’, অথবা স্ট্র কাট মারিতে বলিতেছে। ‘টুইন ব্লেড’ দিয়া দাড়ি কামাইয়া ‘আফটার শেভ’ মাখিতেছে। ‘ব্যাগি’। চড়াইয়া ‘মোটর বাইক’ হাঁকাইয়া বহুতল বাড়ির উচ্চতলে, শীতল কক্ষে বসিয়া ‘কম্পুটার’ নামক যন্ত্রে দশ আনা, ছ আনা করিতেছে। ওই পুরুষটিই তো মাঘের শুভসন্ধ্যালগ্নে যদিদং মদিদং বলিয়া কোনও এক তন্বী শ্যামা শিখরী দশনাকে কেশাকর্ষণে না হউক গাঁটছড়া বাঁধিয়া যন্ত্রনে গাদাই করিয়া ‘ফ্ল্যাট’ নামক খাঁচায় আনিয়া চিরকালের জন্য বন্দি করিতেছে। ‘লক-স্টক ব্যারেল’ সহ উৎপাটন। সমস্ত ‘আইডেনটিটির’ উৎসাদন। দত্ত বসু হইয়া যাইতেছে, বসু বন্দ্যোপাধ্যায় হইতেছে। পূর্বের পরিবেশ ভুলিয়া শ্বশুরালয়ের পরিবেশে অভ্যস্ত হইবার কসরত চালাইতেছে। সঙ্গে আনিয়াছিল ভরি ভরি স্বর্ণালঙ্কার তাহা শাশুড়ি নামক এক আপাত মধুর কিন্তু আসলে একটি ‘বিষকুম্ভ পয়োমুখম’-এর কবজায় চলিয়া গিয়াছে। নগদ কেতার নোট সমূহে। বাবাজীবন সানাইয়ের ফাটা রেকর্ড বাজাইয়া ভূতভোজন করাইয়া ফুলশয্যা করিয়াছেন। জুই ও রজনীগন্ধার মালা শুকাইতে না শুকাইতেই নিজ অরণ্যমূর্তি ধারণ করিয়া, এই লে আও, সেই লে। আও, বলিয়া হুংকার ছাড়িতেছেন। বিএ পাঠরতা কুঁদুলে ননদিনী লাল পিঁপড়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়া দংশন করিতেছে। ব্যবসায় আরও টাকা ঢালিতে হইবে, অতএব আইস। কন্যাটিকে আচ্ছা করিয়া ধোলাই দেওয়া যাউক তাহা হইলে শ্বশুমহাশয় সোনার ডিম্ব পাড়িবেন। যদি দেখা যায় তাঁহার ‘কনস্টিপেনশান’-এর ফলে ডিম্ব বাহির হইতেছে না কিছুতেই, তখন একপাত্র কেরোসিন বধূর গায়ে ঢালিয়া দেশলাই মারিয়া দাও, উল্লাস নৃত্য করো—আজ। আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল। আদিম মানব প্যান্ট-শার্ট পরিয়াছে মাত্র, স্কচ সহযোগে বোনলেস খাইতেছে মাত্র, বায়ুযানে চড়িয়া বিলাতেও যাইতেছে, অঙ্গে বিলাতি পারফিউম ফ্যাঁস করিতেছে, ট্রেনের আপার বাঙ্কে শুইয়া ইংরেজি পেপারব্যাক পড়িতেছে, চিবাইয়া ইয়াঙ্কি ইংরেজি বলিতেছে, কিন্তু জিপ ফাস্টনার’ টানিলেই বিপদ, বরাহ বাহির হইয়া। পড়িবে। সংস্কার যাইবে কোথায়! রাক্ষসরা সাধে বলিত, হাঁউ মাঁউ খাঁউ মনিষ্যি গন্ধ পাঁউ। পুরুষ প্রজাতির মনুষ্যের উগ্র পাশব গন্ধ ইরানের সহস্র গোলাপের নির্যাসেও যাইবার নহে। বরাহ ‘ডকটরেট’ হইলেও ডক্টর বরাহ ভিন্ন কিছু নহে। অবতার হইলেও বরাহ বরাহই।
