‘আজ্ঞে, আদালতেও পায়রা আছে। রাজভবনে আছে। পায়রা কোথায় নেই!’
মদনদা ভারায় উঠছে আর বলছে, ‘নিজেকে কীরকম যেন চোর-চোর মনে হচ্ছে।’
জ্যাঠামশাই বললেন, ‘বকবক না করে ইট খোলো।’
একশো-দেড়শো পায়রা কার্নিশে সার দিয়ে বসে আছে। অসহায়-ছবি। মদনদা তাদের কাছাকাছি পৌঁছোতেই সব ছুটে এল যেন আদর করতে। মাথায় বসছে, কাঁধে বসছে। ডানার ফটফট শব্দ। মদনদা ওপর থেকে বললে, ‘মেজোবাবু! আদরের বহরটা একবার দেখুন। এরা মানুষের চেয়ে ঢের ভালো।’ পাশের পাঁচিলে নন্দদের সেই খুনি গোদা বেড়ালটা ঘাপটি মেরে পাতার আড়ালে বসেছিল। ম্যাও শব্দ করে জানিয়ে দিল, মদন, ঠিক ঠিক।
কাজ যখন শেষ হল, ঘড়িতে তখন তিনটে। পুব আকাশে আলো ফুটছে। সূর্যদেব আসছেন। বিরাট একটা রুপোর থালা চাঁদ। পশ্চিমে গঙ্গার জল ছুঁয়েছে। শেষ রাতে চাঁদের চান। ঝিলিমিলি আলোর পথ এপারে চলে এসেছে।
মদনদা ভারা থেকে নেমে এল ধুপুস করে। গঙ্গার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। নিজের মনেই বলছে, ‘বাপরে। পৃথিবীটা কী সুন্দর! জানাই ছিল না শেষ রাতে এত সব কাণ্ড হয়। চাঁদটাকে আকাশ থেকে পেড়ে এনে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলেই হয়।’
‘ভালো একটা দেয়াল চাই’, জ্যাঠামশাই বলছেন, ‘যে দেয়ালে চাঁদ ঝুলবে। আজই তোমাকে আমি গঙ্গার ধারে তিনকাঠা জমি রেজিস্ট্রি করে দেব, বাড়িটা তুমি করে নেবে। রাজমিস্ত্রি! অন্যের বাসস্থান করে দিয়ে জীবন কাটালে, নিজের জন্যে কিছুই করা হল না।’
মদনা জ্যাঠামশাইয়ের পায়ে সাষ্টাঙ্গ। ওপরে পায়রারা ডানার তালি বাজাচ্ছে।
পুরুষ বাদ
মানুষের পুরুষ প্রজাতির জীবনে গভীর এক সংকট ঘনাইয়া আসিতেছে। আসিতেছে বলি কেন, আসিয়াই গিয়াছে। নিজেদের নিয়তি তাহারা হাজার হাজার বছরের প্রচেষ্টায় নিজেরাই রচনা করিয়াছে। বহু প্রচলিত প্রবাদেই আছে কাষ্ঠ ভক্ষণ করিলে অঙ্গার রূপ মল ত্যাগ করিতেই হইবে। পক্ষতন্ত্রে কথিত হইয়াছে, যেমন কর্ম তেমন ফল।
সেদিন এক গ্রন্থে মানবজাতির অতীত ইতিহাস পাঠ করিতেছিলাম। উক্ত গ্রন্থে একটি চিত্র মুদ্রিত দেখিলাম। দেখিয়া লজ্জায় অধোবদন হইলাম। কিয়দুরে আমার আধুনিকা স্ত্রী রাত্রির আহারের। জন্য ‘মাগি’ নামক ‘চটজলদি’ একটি আহার্য প্রস্তুত করিতেছিলেন। সুস্বাদু না হইলেও উদরপূর্তির পক্ষে যথেষ্ট। স্বসঞ্চালিত পিচ্ছিল কিঞ্চলুক জাতীয় পদার্থ।
জিহ্বাগ্রে স্থাপন করিবামাত্র হড়াস করিয়া হড়কাইয়া উদরে সাঁদ হইয়া যায়। অতীতে আমার মাতার কালে বহু জাতীয় অপ্রয়োজনীয় ব্যঞ্জনে তিতিবিরক্ত হইতাম। অতি সুস্বাদু সেই পদ আমাদিগকে জিহ্বার দাসে পরিণত করিয়াছিল। প্রাতে নিদ্রাভঙ্গ হইতে রাত্রে শয়নের পূর্ব পর্যন্ত কেবলই আহার কেবলই আহার। বাল্যকাল হইতেই যুগপৎ আহার ও বেধড়ক প্রহারের পথ ধরিয়া যৌবন প্রাপ্ত হইয়াছি। তৎকালে আমার পিতৃদেব সুযোগ পাইলেই আমার মাতাকে মসৃণ করিবার জন্য বলিতেন—’সুধাকে আমি একটি মাত্র কারণে বিয়ে করেছি, সে হল ওর রান্না। মহাভারতের কুন্তী মরে সুধা হয়ে জন্মেছে।’
এই সামান্য শুল্ক প্রশংসায় আমার মাতৃদেবী মার্জারের মতো ঘড়ঘড় শব্দ করিতেন ও কঠিন কোনও বিশেষ একটি পদ প্রস্তুত করিয়া এই প্রশংসার প্রতিদান হিসাবে আমাদের রসনাকে। উল্লসিত করিতেন। উদাহরণস্বরূপ বলিতে পারি, সামান্য পটলের অসামান্য রূপান্তর। পটলের আকৃতি ‘মিনিয়েচার’ মৃদঙ্গের মতো। আপনারা অবশ্যই লক্ষ করিয়া থাকিবেন। তাহার একটি দিক সামান্য ছেদন করিয়া গর্ভস্থ আবর্জনাদি শলাকা সহায়ে বাহির করিয়া, অত্যন্ত সুকৌশলে। সেই শূন্য উদরে বিশেষ কায়দায় প্রস্তুত পুর ভরিতেন। এই পুর ডাল অথবা মৎস্য দ্বারা তৈয়ার হইত। পুর ভরিবার পর পটলের কর্তিত অংশে সেই কর্তিত চাকলাটিই ‘প্লাস্টিক সার্জারি’-র কায়দায় সংযুক্ত করা হইত। অতঃপর কড়াইয়ে সরিষার তৈলের উত্তপ্ত প্রস্রবণে নিমজ্জিত ভর্জনে মুচমুচে করিয়া পাতে পাতে পরিবেশন করিতেন। এক-একজনে প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করিয়া, দুই-দশটা খাইয়া ফেলিতেন। দুই কুড়ি দশ এই প্রকার অ্যাটমবোমা তৈয়ার করিতে আমার। মাতাকে কী পরিমাণ শ্রম ও সময় নিয়োগ করিতে হইত তাহা সহজেই অনুমান করা যায়।
পটলের গর্ভ উৎপাটন করিয়া গর্ভ স্থাপন। ‘হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট’-ও বলা যাইতে পারে। আমাদের পরিবারস্থ সকলের এবম্বিধ সুখ সঞ্চারে নিজেকে অকাতরে নিবেদনের ফলে নৈবেদ্যটি অকালে অসুস্থ হইয়া সকাল সকাল পরলোকে প্রস্থান করিলেন। মাতৃহীন শোকসন্তপ্ত পরিবার অতঃপর চরম বিশৃঙ্খলার শিকার হইয়া স্বীকার করিল রবার টানিলে বর্ধিত হয় অবশ্যই; কিন্তু বেশি টানিলে ফটাং করিয়া ছিড়িয়া যায় ও ভিটায় মহানন্দে ঘুঘু চরিতে থাকে।
মনু মহারাজ একালের, জিনস স্ন্যাক্স ফতুয়া পরিহিতা, ওষ্ঠে সিগার ধারিণী বিদূষী রমণীদের আগমন বার্তা শ্রবণ না করিয়া মহানন্দে এক বিধান দিয়া আমাদের গালাগালি খাইবার পথ আরও প্রশস্ত করিয়া গেলেন। মনু ব্যক্তি বিশেষের নাম নয়। একাধিক মনুকে লইয়া দূর দূর। অতীতে একটি সংস্থা স্থাপিত হইয়াছিল। ‘It is the designation of an office.’ তাঁহারাই অরণ্যের অনগ্রসরতায় বসিয়া যাবতীয় বিধান দিতেন। আর তৎকালের মানুষ ‘ঋষিরুবাচ’। বলিয়া মানিতে বাধ্য হইতেন। যেমন একালের গ্রামপঞ্চায়েতের বিধানে নারীকে ডাইনি আখ্যা দিয়া কিলাইয়া, ঢিলাইয়া, পুড়াইয়া মারার সংবাদ দৈনিকে প্রকাশিত হয়। আইনের প্রতিবাদ একালেও মহা অপরাধ বলিয়া গণ্য হয়।
