হাজত দৃশ্য
পকেটমার : কী করেছিলে গুরু? চেহারা দেখে তো ভদ্দরলোক বলেই মনে হচ্ছে?
শিক্ষক : আমি শিক্ষক।
পকেটমার : ও বাবা! সে তো গুরুর গুরু। শিক্ষাগুরুরা তো আমার গুরুর চেয়েও বড়। জাল মার্কশিট, জাল ডিগ্রি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, পদক, পাণ্ডুলিপি চুরি, স্কুল তহবিল হাপিস, ছাত্রীকে রেপ। গুরু, গুরু। তা তোমার ডিগ্রি কোত্থেকে কিনেছিলে? শিকাগো? দেখো আমি পকেট মেরে হাজতে আর তুমি ডিগ্রি কেঁপে আমার পাশে! লাও একটা বিড়ি ধরো।
শিক্ষক : বিড়ি খাই না।
পকেটমার : আরও ওপরে উঠে গেছ? গাঁজায় আছ বুঝি?
শিক্ষক : না গোঁজায় আছি।
পকেটমার : আহা। গোঁসা করছ কেন? কেসটা কী?
শিক্ষক: ক্লাস সেভেনের ছেলে তাসের জুয়া খেলছিল, ধরে ঠাস করে এক চড়, হাজতে।
পকেটমার : অমানুষের দেশে মানুষ তৈরি করতে গেছ। হা, হা, তুমি কেমন অমানুষ হে?
শিক্ষক : তোমার মতে আমার কী করা উচিত?
পকেটমার : আমি আর কী বলব স্যার, আপনি শেয়াল পণ্ডিতের কাছে যান। গুরুর গুরু মহাগুরু। স্যার, একটা অ্যাডভাইস। শুধু মানিব্যাগই পকেটমার হয় না, ইজ্জতও মার হয়ে যায়। সামালকে। যেরা দেখকে চলো, আগে ভি দেখো, পিছে ভি দেখো।
পলাশ
ছেলেটা ভীষণ একগুঁয়ে। অঙ্কে প্রত্যেকবার যা পায় তার চেয়ে পাঁচ নম্বর কম পেয়েছিল বলে বাবা খুব বলেন, তোমার ওপর অনেক আশা ছিল। ভেবেছিলুম তোমাকে আমি বিদেশে পাঠাব। আমি নিজে একশোর মধ্যে একশো পেতুম। আমার ছেলে হয়ে অন্যের কাছে হেরে গেলে!
পলাশ মাথা নীচু করে শুনে গেল। সেদিন রাতে সাধ্যসাধনা করেও তাকে খাওয়ানো গেল না। পলাশের মা বললেন, নব্বই তো পেয়েছে। কেন তুমি ছেলেটাকে শুধু শুধু বকলে?
তোমার বোঝার ক্ষমতা নেই। এই সাংঘাতিক প্রতিযোগিতার যুগে একটা নম্বর এদিক-ওদিক হলে অন্যে মেরে চলে যায়। আমাদের ছেলে হেরে যাবে! আমার বাবা কখনও কোনও পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। স্কুলে ডবল প্রোমোশন পেতেন।
পলাশের মা চুপ করে রইলেন। ছেলে খায়নি, সে রাতে তিনিও খেলেন না। পলাশ সারা রাত ভালো করে ঘুমোতে পারল না। পাঁচটা নম্বরের জন্যে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উন্মেষ এবার ফাস্ট হয়েছে, পলাশ সেকেন্ড। ভোরবেলা পলাশ যখন বিছানা ছেড়ে উঠল তখন সে অন্য ছেলে। ভীষণ গম্ভীর। বয়স যেন দু-বছর বেড়ে গেছে। নিজের মাথাটাকে সে কাল রাতে ভেতর থেকে দেখেছে। সবই সেখানে গোছানো আছে, শুধু সময়মতো টেনে বের করা। পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা মানুষ জানতে পারে না, বুঝতে পারে না। আসলে ভয়। ভয়ই মানুষকে দুর্বল করে দেয়। মানুষের মাথা হল কম্পিউটার। এই কম্পিউটারের কাছে কোনও কিছুই কিছু নয়।
পলাশ পরের পরীক্ষায় শুধু প্রথম হল না, সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে রেকর্ড করল। সবেতেই ফার্স্ট। সবাই বললে, সবসময় বই মুখে করে বসে থাকলে ভালো রেজাল্ট কেন হবে না। ওর তো কোনও খেলাধুলো নেই, গল্পগুজব নেই। বন্ধুবান্ধব নেই।
পলাশ মনে মনে হাসল। পরের বছরই দেখা গেল, পলাশের মতো ভালো ক্রিকেট কেউ খেলতে পারে না। যেমন তার মার, তেমনি তার বল। দেখা গেল, কখন সে পড়ে তার কোনও ঠিক নেই, সারাদিন আড্ডা মারছে। গান শুনছে। আবার ছবি আঁকার নেশা ধরেছে। সুন্দর সুন্দর ছবি এঁকে একে-তাকে দিয়ে দিচ্ছে। পড়ার বইয়ের বাইরে গাদাগাদা বই এনে বাড়িটাকে প্রায় লাইব্রেরি করে ফেলেছে। সবাই ভাবলে, দেখা যাক, এইবার পরীক্ষায় কী হয়!
পলাশ কোনও পরীক্ষাতেই আর দ্বিতীয় হল না। স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা চলে গেল। ছবছর পরে পলাশ ফিরে এসেছে। ছবছরে সে আমেরিকা কাঁপিয়ে দিয়ে এসেছে। নতুন সব থিওরি বের করেছে। প্রমাণ করে এসেছে, মানুষের মাথার চেয়ে বড় কম্পিউটার এখনও তৈরি হয়নি। আমেরিকা তাকে ধরে রাখতে চায়। পলাশ চলে এসেছে ভারতে। এখানেই সে আরও গবেষণা করবে।
সবাই বললে, এখানে তোমার কেউ দাম দেবে না। ওখানে কত টাকা, কত ভালো জায়গা! কত সুখ!
পলাশ হাসল। বলল, এই আমার দেশ। ডাল, ভাত আর শাকপাতার অভাব হবে না। ওদেশে যেতে চাইলে এই মুহূর্তে যাওয়া যায়, তবে সায়েব হবার ইচ্ছে নেই।
পলাশের বাবা-মা বৃদ্ধা হয়েছেন। আত্মীয়রা বললেন, ছেলেটা এ কী করছে! আমরা ভেবেছিলুম একটা মোটর কিনবে, তার বদলে কিনেছে একটা সাইকেল! আগে যদিও বা প্যান্ট-শার্ট পরত, এখন ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া কিছুই পরে না। ভাবা গিয়েছিল, পুরোনো সাবেক বাড়িটা ভেঙে নতুন বিলিতি ধরনের বাড়ি করবে। কোথায় কী!
পলাশের বাবা-মা হাসেন। সব শুনে যান। সবাই জিগ্যেস করলেন, পলাশ তুমি কি সাধু হয়ে যাবে?
পলাশ বললে, না, মনে মনে আমি তো চিরকালই সাধু। আমি আমার বাবা-মায়ের সেবা করব।
সে আবার কী! সেটা একটা কাজ হল!
এ যুগের সেইটাই সবচেয়ে বড় কাজ।
সবাই বললে, ছেলেটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
দুটো বড় কোম্পানি, তারা কম্পিউটার তৈরি করে, পলাশকে মোটা টাকার চাকরি নেবার জন্যে ঝোলাঝুলি করতে লাগল। পলাশের বাবা বললেন, চাকরিটা তুমি নিয়ে নাও। অত টাকা মাইনে!
চাকরি আমি করব না। চাকরি মানে দাসত্ব। আমার ঠাকুরদা চাকরি করেননি, তুমিও করোনি, আমিও করব না।
তাহলে কী করবে?
আমি আমার স্কুলে মাস্টারি করব।
তুমি জানোনা, সেই স্কুল আর আগের স্কুল নেই। সেখানে দু-বেলা শিক্ষকে শিক্ষকে হাতাহাতি হয়। ছাত্ররা ছাত্রদেরই বোমা মারে। লেখাপড়া হয়-ইনা। তুমি চাকরিটাই নাও।
