খুব ইচ্ছে করছে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি। ভীষণ উত্তেজনা হচ্ছে। বাবাকে ছেড়ে উঠতে পারছি না তাই। ডাকটা ক্রমশই গঙ্গার দিকে চলে যাচ্ছে, ‘কানাই, কানাই, বনমালী, বনমালী, হারাধন, হারাধন।’ শেষে আর শোনা গেল না। বাতাসের শাঁ-শাঁ শব্দ। গঙ্গায় শেষ রাতের। স্টিমারের ভোঁ। ডাকটা কি আবার এদিকে ঘুরে আসবে! এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।
পরের দিন বেশ বেলায় ঘুম ভাঙল। বাইরের রাস্তায় লোকজন, হইচই। রাতের অত বড় ঘটনার কোনও চিহ্নই পড়ে নেই। আরও একটু বেলা বাড়তেই পবিত্রদের বাড়ি ছুটে গেলুম। ওইখানেই আমাদের আড্ডা বসে। তারপর ওইখান থেকেই কোমরে গামছা বেঁধে আমরা গঙ্গায় গিয়ে পড়ি।
সেদিন আর কোনও আলোচনা নয়। একটাই বিষয়, নিশির ডাকে কেউ কি সাড়া দিয়েছিল! না, নিশি ডেকে ডেকে সাড়া না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিল! আমরা অনুসন্ধানে বেরোলুম। ডেকে ডেকে জিগ্যেস তো করা যায় না, কে মারা গেছে। যেন কিছুই হয়নি, এইভাবে ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে।
এ পাড়া-সে পাড়া, এ গলি-সে গলি ঘুরছি আমরা। জীবন স্বাভাবিক। কোথাও কিছু নেই। তার মানে সব বাজে। কোনও এক পাগলের কীর্তি। বিমান আবার সাহস করে দোতলার বারান্দা। থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে নিশি দেখেছে। বেঁটেখাটো, চারচৌকো, জটাজুটধারী একটা জীব। দগদগে লাল। বেলুনের মতো রাস্তার এক হাত ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে। শেয়ালের মতো কণ্ঠস্বর, নিতাই, নিতাই।’
পাড়ার শেষ মাথায় রাস্তার কলে দাঁড়িয়ে দুজন কাজের মেয়ে বলাবলি করছে, কুলবাগানের হারু কাল শেষ রাতে হঠাৎ মারা গেছে। রাতে খাঁটিয়া পেতে দাওয়ায় শুয়েছিল। সুস্থ-সবল একটা মানুষ। অসুখ নেই, বিসুখ নেই। সকালে দেখা গেল বিছানায় মরে পড়ে আছে!
ছোট-ছোট। হারুদার কুলবাগান। গাছের পর গাছ। গোল গোল পাতার ফাঁক দিয়ে নেমে আসছে প্রখর সূর্যের আলো। ছায়া আছে, তবে কেমন যেন শুকনো ছায়া। মাঝখানে একটা কুঁড়েঘর। খবর পেয়ে কিছু লোকজন এসেছে। খাঁটিয়ায় চিত হয়ে পড়ে আছে আমাদের হারুদা। চেহারাটা কাগজের মতো ফ্যাকফ্যাকে সাদা। সবাই বলাবলি করছে, হার্ট অ্যাটাক।
একমাত্র আমরাই জানি ব্যাপারটা কী! রাত দুটোর সময় মৃত্যুর কণ্ঠস্বর—’হারুউ হারুউ।’ আধো ঘুম, আধো জাগরণে একটি উত্তর—’যাই’। খপ করে ডাবের খোলার মুখ বন্ধ।
এখন ভাবি, এমনও হয়! কিন্তু তার পরে অনাদি মল্লিক আরও অনেকদিন বেঁচে থেকে শেষে আত্মহত্যা করেছিলেন।
পকেটমারি
আমার প্রচুর টাকা। বীভৎস রকমের টাকার মালিক। বাড়িখানা যেন ইন্দ্রপুরী। বাড়িতে ঢোকার সময় নিজেই অবাক হয়ে যাই। কী ছোটলোকের মতো ব্যাপার! এপাশে, ওপাশে মানুষ অনাহারে, অর্ধাহারে ধুকছে, মরে যাচ্ছে বলব না। অনর্থক বিতর্কের সৃষ্টি হবে। আমার ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। গুড বুক থেকে ব্যাড বুক-এ চলে যেতে কতক্ষণ। বাড়িটার পিছনে লোকটা লাখ পঞ্চাশ টাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে ইতরের মতো। অর্থের অসভ্য নির্লজ্জ প্রদর্শনী।
আরে লোকটা তো তুমি!
তা-ও তো বটে।
অ্যায় দেখো, ভাবপ্রবণ হয়ে পড়েছে। নিষ্ঠুর। দৈত্য না হলে পৃথিবীতে এসে ভোগ করা যায় না। চোখ-কান বুজিয়ে মজা লুটে যাও। তুমি গরিব বলে আমি বড়লোক হব না!
কিন্তু!
আবার কিন্তু কীসের?
সেদিন একটা কথা কানে উড়ে এল। একজন বলছে, বড়লোক মানে, জ্ঞানী লোক, গুণী লোক। যেমন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, সুভাষচন্দ্র, এইরকম।
রামমোহন রায় সেই কোনকালে মেয়েদের মুখ চেয়ে সতীদাহ রদ করালেন, বিলেতে গিয়ে অর্থাভাবে প্রাণ হারালেন। এখন ঘরে ঘরে বধূ নির্য্যাতন। ঝুলিয়ে মারা, পুড়িয়ে মারা। এখন। আবার শুরুতেই শেষ করার পদ্ধতি চালু হয়েছে। কন্যাসন্তান জন্মানো মাত্রই খুব ভালো করে। কাগজ-টাগজ মুড়ে রাস্তার ধারে ফেলে দিয়ে আসছে। দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ একটা কংস মেরেছিলেন, এখন দিকে দিকে কংস। আইসিএস সুভাষচন্দ্র দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে। গেলেন লস্ট ফর এভার। গদিতে বসে পড়লেন যাদব, মাধব। মুখের মেশিনগান থেকে গুলির বদলে বুলি। আর দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর লোকান্তরিত হওয়ার পর দু-বেলা দুটি আহারের জন্য তাঁর কন্যাকে ভিক্ষা করতে হল।
এই তো মরাল সাপোর্ট এসে গেল। আমার টাকা আছে। মোটা টাকা, ডোনেশন দিয়ে ছেলেকে নামী স্কুলে ভরতি করেছি, ব্যাটা মাস্টারের এত বড় আস্পর্ধা, আমার সোনার চাঁদের গায়ে হাত তুলেছে। দেখাচ্ছি মজা! এই কে আছিস?
ইয়েস স্যার।
আমার উকিল ভোলাকে ডাক।
আবার কী হল?
একটা ফাইভ ফিফটি ফাইভ, ফৌজদারি ঠুকে দাও।
কেসটা কী?
আমার ছেলের গায়ে হাত তুলেছে এক ব্যাটা পাতি মাস্টার। আমার ছেলে সিগারেট খাক, বিস্কুট খাক, মদ খাক, জুয়া খেলুক, তাতে মাস্টার নাক গলায় কোন সাহসে।
ঠিকই তো, ঠিকই তো। আগে একটা এফআইআর মেরে আসি।
ছেলেকে স্কুলে পাঠালেন, মাস্টারমশাই শিক্ষা দেবেন না?
না।
তাহলে তাঁরা কী করবেন?
মাস্টাররা মাস্টারদের দিকে মাস্টারদের মতো থাকবে, ছেলেরা ছেলেদের দিকে। কোনওরকম হস্তপ্রয়োগ চলবে না। গুন্ডা দিয়ে মেরে ঝাণ্ডা উড়িয়ে সব শেষ করে দেব। পাঠশালার যুগ শেষ।
ছেলের ডিগ্রি, ডিপ্লোমার কী হবে?
কিনে আনব। টাকা ফেললে তিনদিনের মধ্যে মাল এসে যাবে। আজকাল নোবেল প্রাইজও কিনতে পাওয়া যায়।
