তাহলে শুনুন, বড় বড় ফার্মেও এই একই অবস্থা। দলাদলি, কামড়াকামড়ি। ধর্মঘট। লকআউট। কী হবে ঢুকে! দিন দিন নিজেকে হারিয়ে ফেলা। চাকরি করতে হলে বিদেশে করাই ভালো। পলাশ বাড়িতে ছেলে পড়ানো শুরু করল। উঁচু ক্লাসের মেধাবী কিন্তু দুস্থ দু-চারটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে শুরু হয়ে গেল বিনা পয়সার স্কুল। সবাই বললে, না, ছেলেটার মাথা সত্যিই গেছে। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।
ছেলেবেলা থেকেই পলাশ ভীষণ একগুঁয়ে। সে কারুর কথা শোনে না। কারওর কথা শোনেনি কোনও দিন। পাড়ার সকলেই এই সিদ্ধান্তে এলেন, পলাশের মাথাটা গেছে। অনেকে তার পূর্বপুরুষদের ঠিকুজি, কোষ্ঠি ঘেঁটে এ-ও বের করে ফেললেন, পলাশের বাবার, বাবার, বাবার বাবা এইরকম এক পাগল ছিলেন। বাংলার নবাব আলিবর্দি তাঁর গুণ ও জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে জমিদারি দান করতে চেয়েছিলেন, তিনি নেননি। বলেছিলেন, বিষয়-সম্পত্তি মহাপাপ। আমি বেশ ভালোই। আছি। পলাশের মায়ের বাবার বাবা সংসার ত্যাগ করে হিমালয়ে চলে গিয়েছিলেন।
পলাশের খবর আমরা আর তেমন রাখিনি। যে যার সংসার আর চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। আমি পোস্টাল ডিপার্টমেন্টে মোটামুটি একটা ভালো চাকরি পেয়ে সংসার সাজিয়ে ফেলেছি। বদলির চাকরি। কাজের গুণে প্রোমোশন পেতে পেতে পোস্টমাস্টার হয়েছি। নানা জেলায় পোস্টিং হয়। বেশ ভালোই আছি। খাতিরের চাকরি। সবাই মাস্টারমশাই, মাস্টারমশাই বলেন। জেলার বড় বড় মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়।
যখন আমি বাঁকুড়ার পোস্টমাস্টার, সেই সময় একটা নাম চোখে নড়ল, পলাশ চট্টোপাধ্যায়। প্রথমে তেমন কিছু মনে হয়নি। কত পলাশই তো আছে! কিন্তু নামটা মনে গেঁথে রইল। পলাশ আমার প্রাণের বন্ধু। কত রাত খোলা মাঠে, ঘাসের ওপর শুয়ে গল্প করেছি দুজনে। জীবনের গল্প। ছাত্রজীবনের সেই সব দিন কি ভোলা যায়!
পলাশ চট্টোপাধ্যায়। নামের তলায় আছে—অধ্যক্ষ, মানব বিকাশ কেন্দ্র। এই মানব বিকাশ কেন্দ্র কোথায়! কর্মীরা জানালেন, সে এক বিশাল ব্যাপার! কয়েক একর জমির ওপর সাত
আটটা স্কুল। একেবারে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিশুদের বড় করা হয়। মানুষের মতো মানুষ। বিদেশ থেকে সবাই আসেন দেখতে।
এর বেশি কিছু আমায় কর্মীরা বলতে পারলেন না।
বুদ্ধপূর্ণিমা। বিশাল গোল থালার মতো চাঁদ সবে উঠেছে। কী মনে হল, একটা গাড়ি ডেকে উঠে বসলুম। চলো মানব বিকাশ কেন্দ্র।
বাইরে থেকে দেখে অবাক হওয়ার তো কিছু খুঁজে পেলুম না। গেটটা খুব বড়। দু-পাশে বাগান। পথ চলে গেছে। এগোচ্ছি। চাঁদের আলোর জোর বেড়েছে। তার মানে রাত হচ্ছে।
অনেকটা যাওয়ার পর থমকে গেলুম। সবুজ ঘাসে-ঢাকা বড় একটা মাঠ। বাঁকুড়ার এই দিককার জমি কাঁকুরে। এখানে এমন ঘাস তৈরি করা খুব কঠিন কাজ। সেই সবুজ মাঠে সাদা পোশাক পরা নানা বয়েসের ছেলেরা বসে আছে স্থির হয়ে। মাঠ ভরে গেছে। দূরে একটা উঁচু বেদি। সেই বেদিতে কাচের ঘেরাটোপে একটি আলো জ্বলছে। এতটুকু শব্দ নেই। গাছে গাছে বাতাসে পাতা পড়ার শব্দ। মাঝে মাঝে কোকিলের ডাক। এইবার আমার চোখে পড়ছে, দূরে দূরে ছবির মতো সব বাড়ি। চাঁদের আলোয় দুধের মতো সাদা। মনে হচ্ছে স্বর্গে এসেছি।
এই পলাশ, আমাদেরই পলাশ। বুকে জড়িয়ে ধরে বললে, আমি খবর পেয়েছি, তুই আমাদের পি এম হয়ে এসেছিস। রবিবার একেবারে ভোরে চলে আয়। সবটা দেখতে পুরো একটা দিন লাগবে। এ বলার নয়, দেখার। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা কী জানিস—এই গ্রামটাইনবাব আমার পূর্বপুরুষকে দিতে চেয়েছিলেন। আরও সব আশ্চর্য ব্যাপার আছে, সেদিন বলব।
ফিরে এলুম। রাতে স্বপ্ন দেখছি—একমাঠ সাদা সাদা রাজহাঁস। স্থির। দূরে বেদিতে বুদ্ধদেব। বুদ্ধদেব নন, আমার বাল্যবন্ধু পলাশ।
পায়রা
আমার দিদিটা পুরো একটা পাগলি। স্কুলে গরমের ছুটি। এই সময়টায় স্কুল বিল্ডিং রং করা হয়। মহা বিপদ হয় পায়রাদের। রংমিস্তিরা পায়রা-টায়রা বোঝে না। ভারায় উঠে ভলভল করে বিড়ি টানে, গলগল করে গান গায়। খ্যাস খ্যাস করে রঙের পোঁচরা মারে। বাসা থেকে পায়রার ডিম ফেলে দেয়। পায়রাদের বসতে দেয় না, থাকতে দেয় না। স্কুলের গায়েই নন্দদের বিশাল বনেদি বাড়ি। টেরিফিক বড়লোক। জীবনে কখনও রুটি খায়নি। লুচি আর পরোটা। কথায় কথায় পোলাও। পাঁঠা আর মুরগির ভুষ্টিনাশ। বাড়ির ছোট ছেলেরা কমলাভোগ দিয়ে ক্রিকেট খেলে। আইসক্রিমে মানিপ্ল্যান্ট। গিজগিজ করছে গাড়ি। লাল, নীল, হলদে, সবুজ। নন্দদের অনেক বেড়াল। খেয়ে খেয়ে এক-একটা কেঁদো বাঘের বাচ্চা। এদের মধ্যে একটা বেড়াল ছোটলোক, শয়তান। রোজ একটা করে পায়রা ধরবেই ধরবে। এক নম্বরের জানোয়ার। হুমদো মতো দেখতে। মেটে মেটে গায়ের রং।
এক ঝাঁকানিতে ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় চাঁদের আলো এসেছে। দিদি ঝুঁকে আছে মুখের ওপর। রাত কটা কে জানে! থানার পেটা ঘড়ি একটু পরেই হয়তো বাজবে। জানলার বাইরে ঝপ ঝপ শব্দ করে কী একটা উড়ে গেল। রোজই যায়, দেখতে পাই না। দিদি বলে, পরি। বিদ্যাধরীতে চান করতে আসে। আমাদের গ্রামের একটা মেয়ে লক্ষ্মীপুজোর রাতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ফকির দাদু বলে, সে পরি হয়ে গেছে। লক্ষ্মী পুজোর রাতে মেয়ে অদৃশ্য হলে বুঝতে হবে সে পরি হয়ে গেছে। ছেলে অদৃশ্য হলে, দেবদূত। যদি হঠাৎ কোনো কুকুর লক্ষ্মীপুজোর রাতে অদৃশ্য হয়ে যায়, সে নির্ঘাত হবে যমদূত। এসব আমাদের হরিদার একেবারে মুখস্থ। নলহাটির গুরুদেব কৃপা করে শিষ্যকে এই সব জ্ঞান দিয়েছেন। সেই গুরুদেবের এমন ক্ষমতা। নিজেকে ইচ্ছামতো ছোট-বড় করতে পারেন। এই শিশুর মতো ঘরের মেঝেতে হামা দিচ্ছেন তো কিছুক্ষণ পরেই সাত-আট ফুট লম্বা একটা মানুষ বোম্বাই আম পাড়ছেন।
