সাহেব চোখ কপালে তুলে, চিবুক উঁচিয়ে হাত-পা নেড়ে থিয়েটারের ভঙ্গিতে বললেন, এডুকেশান মেকস এ ম্যান। লুক অ্যাট জুপ্যান, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, ইউ.কে, ইউ. এস. এ. ইউ. এস. এস.। আর.। এই নাটকীয় আত্মবমনের পর শিশুপুত্রের দিকে নজর পড়ে যেতেই চিৎকার করে। উঠলেন, ওপাশের জানালাটা খুলেছিস কেন রাসকেল। বন্ধ কর। বন্ধ কর। ওই আমতলার বস্তি ছেলেমেয়েদের আর মানুষ হতে দেবে না দেখছি। নুইসেনস অ্যান্ড ভালগার। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দাও।
ভদ্রলোক জিনিসটা কী?
এ গুড পেরেন্টেজ। ভালো পিতামাতার সন্তান। এ গুড বংশপরিচয়।
ভালো পিতামাতা মানে?
মানে রেসপেকটেবল। মাননীয়। সভায় বসলে বক্তা ভাষণ দিতে উঠে যাঁকে বলেন, মাননীয় সভাপতি, মাননীয়প্রধান অতিথি।
মানুষ মাননীয় হয় কীভাবে?
বেশ পুঁজিপাটা থাকা চাই। রেস্তোর জোর। বাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, হাঁকডাক, স্তাবক, উমেদার। অক্ষরজ্ঞান থাকলে তো কথাই নেই। একে শিক্ষিত, তায় বড়লোক। যেন গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া! সেকালে শিক্ষার চেয়ে বাহুবল আর ধনবলেই মানুষ মানুষ হত। চিঠি আসত, মাননীয় অমুক, তলায় বিনয়াবনতের দল। একালের বাঙালির ধন কোথায়? সবই তো ঠনঠনিয়া, ঢনঢনিয়াদের হাতে চলে গেছে। পূর্বপুরুষের ভিটেয় কোথাও ভাঙা গাড়ি মেরামতির কারখানা, কোথাও জয় মা-কালী চোলাইখানা, কোথাও বহুতল বাড়ির পাদপীঠ, স্কাইস্ক্র্যাপার, মেঘালয়, নীলকমল, জলকমল, হলকমল! একালের রিয়েল ভদ্দরলোক সেইরকম কোনও খুপরিতে বসবাস করেন। একেশ্বরবাদী। বসের ভজন, বসামৃত পান। গণেশের পূজারী হলে আমলাদের পীঠস্থানে হত্যা প্রদান। নেতার ভজনা। চামচা সেবা।
তোমরা দূরেই থাকো। শুধু রাতের অন্ধকারে ওয়াগন ভেঙে গুদাম ভরে দাও, পার্কের রেলিং খুলে এনে আমার ঢালাই কারখানায় ফ্যালো। আমি ব্ল্যাকে-হোয়াইটে টু-পাইস কামিয়ে আরও ওপরে। উঠে মেঘলোকের কাছাকাছি। প্রায় বিমান। নীল আকাশ পরিষ্কার বাতাস। তোমরা আমার জন্যে পথের মিছিলে ঘোরো। আমার আসন পাকা হোক। আমার স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্যে ভিয়েনা পাঠাই, ছেলেকে সায়েব করার জন্যে ডাওহিলে। তোমরা স্লোগান তোলো। বিনা চিকিৎসায় মরো। তোমাদের সন্তানসন্ততিদের তুলে দাও সমাজবিরোধীদের হাতে। সমাজবিরোধী সমাজের বিরোধী হলেও আমাদের বিরোধী নয়।
ভালো মানুষ, ভালো মানেই বোকা মানুষ। তাঁরা সব ঠ্যালা খেয়ে সরে গেছেন। কোথায় তাঁরা! নির্জন প্রবাসে। সংসারে থাকলে একঘরে। অফিসে থাকলে ইউনিয়নের বাইরে। সংসারের বাইরে থাকলে, হয় কোনও আশ্রমে, অথবা কোনও তীর্থে। সংসার দুলছে ঝড়ের খেয়ার মতো। ভাই ভাইকে বলছে, তুই আমার নাম্বার ওয়ান এনিমি। স্বামী স্ত্রীর পদসেবী। দ্যাখো নারী বড়ো প্রলোভন। সরে পোড়ো না। কী আশায় বাঁধি খেলাঘর। নেতা চালাচ্ছেন বিপ্লব, বিপ্লব।
ধ্যাততেরিকা সংসার। সবাই বললে, মানুষকে বিশ্বাস কোবরা। বিশ্বাস করে কী পাওয়া গেল? বিশ্বযুদ্ধ, অসম, বিষম, অর্থনীতি। ঝোলটানার দল, ঝোলছাড়ার দল। পাওয়া গেল গলাবাজি, দলবাজি। পাওয়া গেল অবিশ্বাসী নেতা, অত্যাচারী মাস্তান, মানুষমারা মাফিয়া। পাওয়া গেল। সংবিধানহীন সংবিধান।
ধ্যাততেরিকা সংসার। বসে আছি একপাশে। খঞ্জনি হাতে। নাম গাই তাঁর। যিনি মানুষের চিরবিশ্বাসে আছেন। যাঁকে পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়াতেই সুখ।
নিগ্রহ
সংসার, সংসার করে শংকরটা একেবারে জেরবার হয়ে গেল। রুগণ বউ। বাইরে থেকে কিছু বোঝার উপায় নেই। মনে হবে অসাধারণ স্বাস্থ্য। শংকরের চেয়ে শতগুণ ভালো। ভেতরটা নাকি একেবারে ফোঁপরা! ফুলশয্যার মাঝরাতেই সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার! শংকর প্রায় খুনের দায়েই পড়ে আর কি। দরজা বন্ধ কর সোহাগের বশে বউকে একটি সুঁই-ফুলের মালা পরিয়েছিল। তিন মিনিটের মধ্যে বউ অনি হাপরের মতো শ্বাস টানতে শুরু করল। মনে হচ্ছে ঘরের সমস্ত বাতাস যেন শুষে নেবে। এমন সাঁ সাঁ শব্দ, বাইরে যারা কান পেতে ছিল তারা সব চিৎকার জুড়ে দিল, ‘ঘরে কী চলছে! কী মেশিন চালালেন শংকরদা।’
শংকরে তখন আর শঙ্কর নেই। তাড়াতড়ি দরজা খুলে বেরিয়ে এল। সবাই অমনি ঘরে ঢুকে, কেউ জানলা খুলছে। কেউ মশারি তুলছে। কেউ পাখার রেগুলেটার ঘোরাচ্ছে। হইহই ব্যাপার। শংকরের বউ অতি কষ্টে বললে, ‘অ্যালার্জি। জুই আর গাঁদা ফুলে আমার অ্যালার্জি আছে ভাই। তিন ফোঁটা চুনের জল আধ কাপ জলে।’ ফুলশয্যা হয়ে গেল রোগশয্যা। সেই থেকে শংকরকে আর দেখতেই হল না, স্ত্রী-র অঙ্গও স্পর্শ করতে হল না। বউ চলে গেল ডাক্তারবাবুদের হাতে। সব স্পেশ্যালিস্ট। হার্ট, লাংস, কিডনি, ইএনটি, আই, ফিমেল ডিজিজ, অস্টিওপ্যাথ, মাঝে মাঝে হোমিওপ্যাথ, নেচারোপ্যাথ। একজন বেরোচ্ছেন তো আর একজন ঢুকছেন। বড় বড় হোটেলে যেমন প্রতিদিনের মেনু থাকে, লেখা থাকে টুডেজ স্পেশ্যাল। খানা টেবিলে বসে। জিগ্যেস করেন, ‘আজকের স্পেশ্যাল আইটেম কী?’ সেইরকম শংকর রোজ সকালে উঠে বউকে জিগ্যেস করে, ‘আজকের খবর?’ খাবারের বদলে খবর। তারপর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। স্ত্রী অমনি বলেন, ‘বেশ ছিলুম বুঝলে। যেই তুমি ডাকলে, শুনছ সাড়ে ছটা বাজল। আমি অমনি ধড়মড় করে উঠে বসলুম। শরীরটা একটা ঝাঁকুনি খেল তো, আর সঙ্গে সঙ্গে আধকপালে হয়ে গেল। উঃ, মাথাটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।’
