এর পর জমিদার কী করলেন ইস্কুল। পাঠশালার পণ্ডিতরা না খেয়ে মরল। গ্রামের ছেলেরা লেখাপড়া শিখে বিলেত চলে গেল। মদ খাওয়া শিখে, মেমবউ বগলে, ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরল। এদেশের মানুষ মামলা করে করে নিঃস্ব হল। সেই বদান্য জমিদারেরও একই পরিণতি হল। সাত ভাইয়ে মামলা করতে করতে, বিষয়-সম্পত্তি ঘেঁড়াছিড়ি করতে করতে একসময় অদৃশ্য হল। পড়ে রইল চোখের জলে টলটলে সেই তালপুকুর। তালতলায় ধান্যেশ্বরী-চোলাই। কারখানা। ফিজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল—দুটি কারবারই সেখানে ফলাও। মানুষের শান্তিধাম। সাতভাই চম্পার মধ্যে ছোটটি দেশসেবার লাইনে গিয়ে ধনেপ্রাণেই শুধু বাঁচল না, এখন বেশ।
হৃষ্টপুষ্ট দেশনায়ক। কোথাও বসতে গেলে ভোঁস করে শব্দ হয়, আর উঠতে গেলে ফোঁস। ভুঁড়িটা যেন ওয়াটার বেলুন। পৃথিবীর যত সুস্বাদু খাদ্য সুখ্যাত হুইস্কি সমুদ্রে অবগাহনে নামে। আর। ওঠে না। মুক্তির সুরাধারে কত প্রাণ হল বলিদান। কত মুরগি, খাসি, ল্যাম্ব, টার্কি ওই মহামানবের উদরতীর্থে লীন হল। সেই লিকলিকে, Lanky-danky-dunky মানুষটা আজ এক Heavy weight দেশনেতা।
এখন দেশসেবা একটা প্রচণ্ড ভালো লাইন। যত ওপর দিকে উঠবে ততই আলো-বাতাস। কোম্পানি মাসোহারা দেবে। চতুর্দিক থেকে সিধা আসতে থাকবে। মোটা মোটা প্রণামীর প্যাকেট। নেতাদের সুবিধে, হাতেনাতে সেবা আর করতে হয় না। সেবার পলিসি তৈরি হয় যে গুমটিতে, সেইখানে হাজিরা দিতে হবে নিয়মিত। সেখানে পাখি পড়ানো হয়। পাখির দানার মতো গলায় ভরে আনতে হবে শব্দের দানা। স্বরক্ষেপণও শিখতে হবে। Audio-laboratory তে মাইল মিটার আছে। কোন বক্তৃতার কী স্পিড হবে অভ্যাস করতে হবে। স্পিড একটা একালের ফ্যাক্টর। টেনিস বলের স্পিড, ক্রিকেট বলের স্পিড।
গণতন্ত্র এক বিরক্তিকর সাক্ষীগোপাল। বিজ্ঞান দেশনেতাদের এক ভয়ঙ্কর শত্রু। লুকনো ক্যামেরার অবাধ গতিবিধি। দেশসেবার জন্যে কে কোথায় সামান্য পঞ্চাশকী পনেরো হাজার টাকা প্রণামী নিয়েছে, অমনি গণতন্ত্রের প্যাভেনিয়ানে নেত্য শুরু হয়ে গেল! সবাই যেন শালগ্রাম সিংহাসনে ধোয়া তুলসীপাতা! এমন করলে দেশসেবা কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সব বুঝবে ঠ্যালা!
ধ্যাততেরিকা সংসার
মনে মনে আমরা পরস্পর পরস্পরকে ঠেলছি। ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছি। আমার পথ থেকে তুমি সরে যাও। প্রয়োজনে আমাদের এক চেহারা। মুখে মিষ্টি সম্বোধন। ভাই বলে কাঁধে হাত। বাড়িতে এলে সব্যস্ত চিৎকার, ওরে চা চাপা, চা। পাঁপড় ভাজ মুচমুচে করে। ফুলকো লুচি, কড়কড়িয়া আলুভাজা। প্রয়োজন যেই ফুরিয়ে গেল, কেউ কাউকে চিনি না। প্রাচীন প্রবাদ আজও সমান সত্য :কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই পাজি।
যার ভূতের ভয়, সে বাইরে গেলে মানুষ খোঁজে। আয় ভাই, তোরা যে যেখানে আছিস, আমাকে ঘিরে বোস। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালেই গা ছমছম করছে। একা যে। আমি শুতে পারি না। ভয়ে ঘুম আসে না। তোমরা যে-কেউ একজন আমার পাশে শোও। যেই ভোর হল, দিনের আলো ফুটল, গেট আউট, বেরোও।
বাইরে বেড়াতে যাব। বড় একা। দিনকাল সুবিধের নয়। চলো হে, আমার সঙ্গে চলো। বায়ু। পরিবর্তন হবে। আমি বেশ গোছগাছ করে ট্রেনের জানালার ধারে বসি। তুমি মালপত্তর তুলে বাঙ্কে গুছিয়ে রাখো। ভাড়াটাড়া মেটাও। স্টেশানে স্টেশানে চা ধরো। মাঝেমধ্যে ভালো ভালো খাবারদাবার। তুমি আমার ম্যানেজার। তুমি আমার প্রাণের বন্ধু। তাই তো সদলে চলেছি বায়ু। পরিবর্তনে। চোর-ডাকাতের ভয় আছে। প্রাদেশিকতার সমস্যা আছে। সেই কারণে বিদেশে। লোকবলের প্রয়োজন আছে। এই যে আঁতাত, এ কিন্তু চিরকালের নয়। সে ভুল কোরো না। উঁচু পদে চাকরি করি বলে, ফিরে এসেই ছেলের চাকরির কথা যেন বোলো না। ও আমার দ্বারা হবে না। তখন আবার অন্য প্রদেশের মানুষের চরিত্র তুলে আমার চরিত্র খাটো করার চেষ্টা কোরো না। তাদের একজনও কেউ কোথাও ঢুকলেই হল। দেশোয়ালি ভাইয়ে দপ্তর ছেয়ে যায়, ও সব সেন্টিমেন্টাল কথা বলে, আমাকে নীতিভ্রষ্ট করার চেষ্টা কোরো না। আমি বাঙালি। আমি আমার ছাড়া কারুর নই। একমাত্র আমার সন্তানের জন্যে, আমার পরিবারের জন্যে আমি কিছু করতে পারি। তোমরাও তাই করো না। কে বারণ করেছে? মুরুব্বি ধরা এক ধরনের অপরাধ। বাঙালি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো। সেলফ-মেড হও। শুধু আমার দাঁড়াবার সময় তোমার পদযুগল আমাকে ধার দিও।
আমাকে ধান্দাবাজ বলাটা মনে হয় ঠিক হবে না। আমি বিশ্বাস করি, সুযোগ মানুষের জীবনে একবারই আসে। মাছের মতো। কাত করে এক চেষ্টায় ধরতে না পারলে পিছলে পালিয়ে যাবে অন্যের এলাকায়। পলাতক ভাগ্য, পলাতক যৌবন, কে না ধরে রাখতে চায়। আমি মধ্যবিত্ত, ইংরেজের তৈরি। অন্যের কাঁধে চড়ে পূর্বপুরুষদের ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। কী ভীষণ হম্বিতম্বি। তাকেই নাকি বলা হত বাঘের মতো ব্যক্তিত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপমারা গোটাকতক চোতা হাতে এলেই মহাপণ্ডিত। কথায় ইংরেজির ফুলকি। অহমিকায় চোখ-মুখ বিকৃত। বিলেত গেলে তো কথাই ছিল না। সে সবই এখন ব্যঙ্গবিদ্রুপের বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপের আর সে দাম নেই। কেতাবের চেয়ে জীবন যে অনেক বেশি মূল্যবান, সেই সত্যটি ঝুলি ফুড়ে বেরিয়ে পড়েছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার লম্ভ মারছেন, আমিই সব। মিস্ত্রি মুচকি হাসছেন, জনাব এগিয়ে এসো না, দেখি কেমন রড বাঁধতে পারো। ফিজিক্সের বাঘ হন্যে হয়ে ইলেকট্রিক মিস্ত্রি খুঁজছেন। মিচিগান থেকে বাড়তি ন্যাজ এনেছেন। আমেরিকান অধ্যাপক-বন্ধু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন—ব্যাপারটা কী? তুমি এত বিচলিত কেন ইন্দু? পাখা ঘুরছেনা সাহেব। চেয়ারে উঠে কলকবজা নেড়ে ঘুরিয়ে দাও। তুমি তো পদার্থবিজ্ঞানী? ওটা মিস্ত্রির কাজ সাহেব। আমি থিয়োরি জানি। পাখা কেমন করে ঘোরে, সাত পাতার থিসিস লিখে দিতে পারি; কিন্তু পাখা খুলে মেরামত জীবনে করিনি। নেভার। ইন মাই লাইফ। পূর্বপুরুষের এই ধারাই চলে আসছে। মানুষ দু-খোপে ঢুকে আছে—একদলের সাদা কলার, হোয়াইট কলারড, আর একদল ওই কুলিকামারি, চাষাভুসো, হেটোমেঠো। মেমসাহেব নাকিসুরে বলেন, ফিলদি, সাহেব হেঁড়ে গলায় বলেন, স্কাম অফ দি আর্থ। ব্যাটারা কোনওদিন মানুষ হবে না। বুঝলে এডুকেশান ছাড়া কোনও জাত এগোতে পারে না। সেন্ট পারসেন্ট এডুকেশান চাই।
