‘কী হবে এখন?’
‘আর কী হবে! হয়ে গেল। আমার আবার মাথা ধরলে গা গুলোতে থাকে। সারাদিন কিছু আর খেতে পারব না। ওদিকে আলসার। পেট খালি থাকলেই ব্যথা শুরু হয়ে যাবে। পেটে গ্যাস হবে। গ্যাস হলেই ঠেলা মারবে ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে চাপ মারবে হার্টে। হার্টে চাপ মারলেই প্রেসার চড়ে। যাবে। প্রেসার চড়লেই হাত, পা অবশ হয়ে যাবে। তোমাকে আমি কতবার বলেছি আমাকে আচমকা অমন করে ডাকবে না।’
‘আমি তাহলে ডাক্তারবাবুকে একবার কল দি। পরে যদি বাড়াবাড়ি হয়।’
মানুষ সকালে ব্রেকফাস্ট করে, চা-বিস্কুট অথবা টোস্ট-চা। শংকরের বউয়ের ব্রেকফাস্ট হল জল, ক্যাপসুল। বিছানা থেকে উঠে আবার বিছানাতেই ফিরে আসা। আজ বিশটা বছর ধরে শংকর এই করে যাচ্ছে। পৃথিবীর যাবতীয় ওষুধের নাম তার কণ্ঠস্থ। যে-কোনও অসুখ সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান। ডাক্তারবাবুরাই এখন তার পরামর্শ নেন। মা দুর্গা কার্তিক আর গণেশকে বললেন,
যে সবার আগে বিশ্ব পরিক্রমা করে ফিরে আসতে পারবে তার গলায় আমার এই মণিমালা। ঝুলিয়ে দোব। কার্তিক অমনি ময়ুরে চেপে বেরিয়ে গেল। গণেশ কিন্তু বসেই রইল। মা বললেন, ‘কী রে! তুই গেলি না।’ গণেশ বললে, ‘ও তো একপলকের ব্যাপার।’ গণেশ গদি ছেড়ে উঠে। মাকে প্রদক্ষিণ করে, গলাটা বাড়িয়ে দিল। একবছর পরে কার্তিককুমার ফিরে এসে অবাক। তা শংকর তার বউকে প্রদক্ষিণ করে ফার্মাকোপিয়া বনে গেছে।
প্রথম প্রথম আমরা শংকরের বউকে জিগ্যেস করতুম, ‘কী কেমন আছ!’ ভদ্রতা করে সে প্রশ্ন। সকলেই সকলকে করে। এখন আর ভুলেও করি না। তাতেও কি নিষ্কৃতি আছে। পা ঘষে ঘষে, পা ঘষে ঘষে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করেন, ‘কেমন আছেন ঠাকুরপো?’
তখন পালটা প্রশ্ন করতেই হয়, ‘তোমার খবর কী?’ যেন দোদমার পলতেয় আগুন ছোঁয়ালাম! শব্দের ভয়ে সিঁটিয়ে আছি। সঙ্গে সঙ্গে টেলিপ্রিন্টার চালু হয়ে গেল। ‘আর বলবেন না। বেশ। ছিলুম। হঠাৎ রাস্তায় একটা লরির টায়ার ফাটল। আচমকা শব্দ তো। বুকের কাছটা ধক করে উঠল। সেই যে লাফাল, আর থামছে না। শরীরটা যেন থিম মেরে আসছে। বুকের এই বাঁদিকটায় হাত দিয়ে দেখুন। যেন ভুমিকম্প হচ্ছে।’ হাত দোব কি! ওই জায়গায় হার্ট ছাড়াও মেয়েদের। আরও একটা জিনিস থাকে।
শংকরের অবস্থা দেখলে দুঃখ হয়। অথচ ছেলেটা বউকে ভীষণ ভালোবাসে। সেবা করে বিগ্রহের মতো। আমরা বলি নিগ্রহ। সেবার একটা নেশা আছে। কারণ-সেবা, গঞ্জিকা-সেবা, জীবিকার সেবা, সমাজ-সেবা। রবিবার দেখার মতো অবস্থা। পাজামা হাঁটুর ওপর। হাতে ঝাড়ু, পাশে বালতি, কাঁধে গামছা, দুটো গ্যাস ওভেনের একটায় ভাত, আর একটায় সিঙ্গি মাছের ঝোল। সারা বাড়ি ছত্রাকার। বউয়ের নাকি সুর। ‘শুনচোঁ, আমার বোধহয় দ্বিতীয় ক্যাপসুলটা খাওয়ার
সময় হল।’ সেদিন দুপুরে শংকরকে ডাকতেই বেরিয়ে এল। পরনে একটা সায়া। এ কী! বললুম, ‘তুমি বোধহয় লিঙ্গ ভুল করে ওটা পরেছ!’ শংকর বললে, ‘তাই তো! আমি ভাবছি পাজামার তো। দুটো পা হয়। আর একটা পা গেল কোথায়! তখন থেকে খুঁজেই যাচ্ছি। দেখেছ কী কাণ্ড! আর ভাই, আমার মাথার ঠিক নেই।’
নিশির ডাক
আমরা তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। জায়গাটা কলকাতার কাছে হলেও বেশ গ্রাম-গ্রাম। পশ্চিমে গঙ্গা। সেদিকে সব মন্দির, বাগানবাড়ি, বাঁশ-বিচালির গোলা। পশ্চিম থেকে একটি মাত্র পিচ বাঁধানো রাস্তা পুবে বাসরাস্তার দিকে চলে গেছে। বাকি সব অলি-গলি, গলির গলি তস্য গলি। পাকা বাড়ি, সাবেক কালের বাড়ি অনেক ছিল, আবার সেইসঙ্গে ছিল, টিন, টালি, খড়ের চালা। বড়-বড় গাছ। নিম, তেঁতুল, বট, অর্জুন। জংলা অবসতি, বাগান। একটা বাগান ছিল সেখানে শুধু কুলগাছ। আমরা সেখানে শীতকালে কুল চুরি করতে যেতুম। হরি মালি তাড়া করলে, মার দৌড়। ধরবে কী করে, আমরা যে ছোট ছিলুম। হরিণের মতো দৌড়োতে পারতুম। কিছু না পেরে হরিদা চিৎকার করে বলত, ‘সরস্বতী পুজোর আগে কুল খাওয়া, দাঁড়া, মা কালীকে বলে দেব।’
সেই সময়ে একদিন আমাদের বন্ধুমহলে খবর রটে গেল, আজ রাতে নিশির ডাক বেরোবে। আজ অমাবস্যা। সেটা কী জিনিস! বিমানই এই গোপন খবরটা এনেছিল। সে সব জানে। বিমান। বললে, জমিদার অনাদি মল্লিকের এখন-তখন অবস্থা। অত বড় বাড়ি, বিষয়-সম্পত্তি, ঘোড়ার গাড়ি। তাঁকে তো সহজে মরতে দেওয়া যায় না। ডাক্তার-বদ্যি সব জবাব দিয়ে গেছেন। তাই এই শেষ চেষ্টা। অন্যের পরমায়ু কেড়ে নিয়ে তাঁকে বাঁচানো হবে। এক তান্ত্রিক এসেছেন পশুপতিনাথ পাহাড় থেকে। সারা গায়ে তেল-সিঁদুর মেখে তিনি রাত বারোটা থেকে দুটোর মধ্যে পথে বেরোবেন। হাতে থাকবে জলসমেত মুখ ভোলা একটা ডাব। তিনি পল্লিবাসী সকলের নাম ধরে ডাকতে থাকবেন একে একে। প্রত্যেকের নাম তিনবার করে ডাকবেন। যেই কেউ সাড়া দেবে, অমনি ডাবের খোলার মুখটা টপ করে চাপা দিয়ে দেবেন। অমনি তার প্রাণ ওই ডাবের জলে। আবদ্ধ হয়ে যাবে। ওই জল মল্লিকমশাইকে খাওয়ালে তিনি বেঁচে উঠবেন, আর এ মারা যাবে।
বিমান বললে, ‘খুব সাবধান! আজ আমরা সারারাত জেগে থাকব। ঘুমের ঘোরে ডাক শুনে সাড়া দিয়েছিস কি মরেছিস।’
‘পশুপতিনাথের তান্ত্রিক আমাদের নাম জানবে কী করে!’
‘এ-পাড়ার লোকই জানিয়ে দেবে। লিস্ট ধরিয়ে দেবে।’
