গঙ্গার পাতায় আজও মুখ থুবড়ে পড়ে আছে একটা ভাঙা নৌকো। নৌকোটা ছিল রজনী মাঝির। ঘাটে বাঁধা থাকত। ঢেউয়ের দোলায় দুলত। পরীক্ষার পর পড়ার চাপ যখন কম থাকত তখন। জ্যোৎস্না রাতে আমরা নৌকোটায় বসে জলের আওয়াজ শুনতুম, ভবিষ্যৎ জীবনের পরিকল্পনা তৈরি করতুম। এক সময় লণ্ঠন হাতে রজনী পাড়ে এসে দাঁড়াত। হেঁকে বলত—জোয়ার আসছে নৌকো খোলো। রজনী মারা গেছে বহুকাল। তার ঘরের চাল উড়ে গেছে, দেওয়াল পড়ে গেছে। তার ঘরের সব গোপন অংশ বাইরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। চালের বাতায় রজনীর হুঁকোটা এখনও বাঁধা আছে। দাওয়ার পাশে পাতা উনুনের একপাশ ধসে পড়েছে। দীর্ঘকালের। রান্নার স্মৃতি দেওয়ালের গায়ে কালো হয়ে আছে। মাছ ধরার জালটা মাকড়সার জালের মতো একপাশে ঝুলছে। কখনও কখনও শৈশব খুঁজতে গঙ্গার ধারে সন্ধ্যার অন্ধকারে গেলে রজনীর নৌকোটাকে মনে মনে তুলে আবার জলে ভাসাই। সঙ্গীসাথীদের ডেকে ডেকে জড়ো করি। কান খাড়া করে থাকি কখন রজনীর ডাক শুনব—মাঝি নৌকো ভাসাও জোয়ার আসছে।
দেয়ালের হুকে একটা তম্বুরা ঝুলছে। ছুটির দিনের দুপুরে আমাকে চুপিচুপি কাছে ডাকে। সময়ের জলাশয় থেকে কুড়ি বছর আগের কয়েকটা মুহূর্ত বড়শি গেঁথে তুলে আনি। দক্ষিণের। বারান্দা দিয়ে ঝুঁকে আছে একটি যুবক রাস্তার দিকে। আমারই যৌবন। দূরে রাস্তার মোড়ে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ এক বৃদ্ধ হনহন করে এগিয়ে আসছেন, বগলে তম্বুরা। আমার দাদু। কানাইবাবুর দোকান থেকে পুরোনো তম্বুরা কিনে আনছেন দাদু। হাঁটুগেড়ে বসে সুর বাঁধছেন। চোখ বুজিয়ে সুর ছাড়তে ছাড়তে বলছেন আহা, যেন কাঁসর-ঘণ্টা বাজছে, ওঁকার ধ্বনি উঠছে। দাদু গাইছেন আমার দিন যে আগত দেখি জগৎ জননী। দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নামছে।
টাটায় গিয়ে দাদু মারা গেলেন। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, রোজ একটু করে ধুলো ঝেড়ো পান্তুরানি। আমাকে আদর করে ওই নামেই ডাকতেন। আমি ভালো হয়ে এসে আবার গান। শোনাব, ওঠো মা করুণাময়ী খোল গোকুটির দ্বার। দাদু আর ফিরলেন না, মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগে পুত্রবধূকে বললেন—তুলে বসিয়ে দাও, পান্তুরানিকে বলো তানপুরাটা দিতে, গানটা গাই। ইউরেমিয়ার যে কণ্ঠ প্রায় বুজে এসেছিল হঠাৎ ছেড়ে গেল। দাদু গাইতে গাইতে চলে গেলেন—ওঠো মা করুণাময়ী খোল গো কুটির দ্বার, আঁধারে হেরিতে নারি হৃদি কাঁদে অনিবার।
মাঝেমধ্যে এমনই এক-একটা ছাড়পত্র নিয়ে আমি অতীতে বেড়াতে যাই। পুরোনো জিনিসপত্র রাখার ঘরে একদিন হঠাৎ জ্যাঠামশাইয়ের মাছ ধরার ছিপ আর ভাঙা হুইলটা পেয়ে গেলুম। ওইটাই আমার ছাড়পত্র। অতীতের সুড়ঙ্গ বেয়ে সোজা শৈশবে। কোনও এক সকাল। পুকুরধারে বসে আছেন জ্যাঠামশাই ফাতনার দিকে চেয়ে। পাশে গোটাকতক সিগারেটের টিন—কোনওটায় চার, কোনওটায় টোপ। কালো জলে থিরথির করে হাওয়া খেলছে। মাঝে মাঝে ঘাই মেরে উঠছে বড় মাছ। দিনের শেষে নির্জন পথে পেল্লায় মাছ হাতে আমরা ফিরছি। দরজার চৌকাঠে মা দাঁড়িয়ে আছেন মৎস্যশিকারিদের সংবর্ধনা জানাতে। মা-র কাঁধে হাত দিয়ে গায়ে গা লাগিয়ে জ্যাঠাইমা। ভাঙা হুইলটাই যেন কড়কড় শব্দ করে উঠল, মাছের টানে ছিপের মাথাটা বেঁকে। গেল। বদ্ধ ঘরেই পুকুরের ভিজে হাওয়া উঠল, ঝাঁঝি, শ্যাওলা, কচুরিপানার গন্ধ এল।
ওই ঘরেই পেলুম তারের খাঁচা। পাখিটা উড়ে গেছে বহুদিন। কোথায় গেছে? কোথায় কার সঙ্গে পেতেছে সংসার! ছেলেবেলার লাটাইয়ের দুটো চাকা পেলুম। আমার এগারো বছরের বয়েসটা হাফপ্যান্ট আর শার্ট পরে সামনে দিয়ে ছুটে দুপুরের ন্যাড়া ছাদে গিয়ে উঠল। তামার মতো আকাশে চিল উড়ছে, উড়ছে আমার ময়ূরপঙ্খি।
পুরোনো বইয়ের মধ্যে থেকে পুরোনো চিঠি বেরিয়ে আসে। যিনি লিখেছেন, তিনি আর লিখবেন না। কাকার চিঠি। অমুক তারিখে আমি আসছি। কাকা আসছেন, সঙ্গে আসছে কয়েকটা আনন্দের দিন। হই-হুল্লোড়, হাত দেখা, জ্যোতিষচর্চা, হিপনোটিজম। বিশাল ছাদে চাঁদের আলোয় মাদুর পেতে আশ্চর্য সব গল্প। শেষ যেদিন এলেন সেদিন গায়ে পাঞ্জাবির বদলে টেনিস শার্ট। জামাটা হ্যাঙারে না রেখে মেঝেতে ফেলে রাখলেন। তুলে রাখছি বলতে বললেন, অত যত্ন। করে কী হবে? ইঙ্গিতটা বুঝিনি। চায়ের সঙ্গে ভালো বিস্কুট দেওয়া হল, বললেন, দিচ্ছিস দে, খেয়ে যাই। গলাটা কেমন উদাস। অনেক রাতে বললুম, কাল সকালে কোষ্ঠীটা একবার। দেখবেন। বললেন, সকালে আর সময় হবে না রে, এখুনি দে। রসিকতা ভেবে ঘুমিয়ে পড়লুম। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বলে গেলুম, তাড়াতাড়ি ফিরে এসে দুজনে বসব। বললেন, তখন তো আমি থাকব না রে! বিশ্বাস করিনি। দুটোর সময় উদ্বিগ্ন মুখে বাবা অফিসে এলেন, শিগগির চল। তখনকার কলকাতার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ে কাকা আত্মহত্যা করেছেন। চিঠিটা হাতে নিলেই সেই ভয়ংকর ঝড়ের রাত ফিরে আসে! আকাশ ভেঙে পড়েছে মর্গ। পোস্টমর্টেমের টেবিলে শুয়ে আছেন সদা হাস্যময় কাকা। গায়ে রক্তেভেজা টেনিস শার্ট। একটা পাদুমড়েমুচড়ে গেছে।
মামার চিঠি। আমাকে সাবধানে থাকতে বলে, শরীরের যত্ন নেওয়ার কথা বলে বসন্তের এক সন্ধ্যায় নিজেই চলে গেছেন।
সময় শুধু নেয় না, কিছু মানুষকে দেউলে করে ঝুলিয়ে রাখে। সময়ের সবচেয়ে বড় রসিকতা। সময় ধার করে বেঁচে থাকা। শূন্য পাত্র হাতে নিয়ে একপাশে বসে দিন গোনা। শরীরের সন্ধিতে সন্ধিতে মৃত্যুর পরোয়ানা। চোখে সাদা পরদা, কোঁচকানো দেহত্বক বৃদ্ধ পিতাকে দেখলে মনে হয় সময়ে ফকির। ভাঁটার নদী। তারছেড়া তানপুরা। সময়ের ভীমরুল সব শুষে নিয়েছে। অ্যালবামে বিভিন্ন সময়ের ছবিতে এই দেউলে মানুষটির বহতা জীবনের ছবি আছে। পুরীর সমুদ্রতীরে, মুসৌরীর গানহিলে, সাহেবগঞ্জের পাহাড়ে। চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বসে আছেন আমার যুবক বাবা। বাবার জীবনে আমার জীবনের মিলন যেন প্রবাহ পথে দুটো নদীর। মিলন। দুটো নদীই এক হয়ে চলেছে মোহনার দিকে। একজন পথের শেষে, সামনে মহাশূন্য হা হা করছে। পশ্চিম আকাশে আগুন ঢেলে সূর্য ডুবছে। আর একজন আসছে পেছনে পেছনে। দূর থেকে দেখলে লাল আকাশের পটে টিলার ওপর একটি রিক্ত মানুষের অপেক্ষার ভঙ্গিতে বসে থাকা সিয়েট। হঠাৎ দেখবে নেই। তখন সে পৌঁছে যাবে পথের শেষে।
