আমাদের বাগানে একটা নিমগাছ আছে। আমাদের দুজনের বয়েসই প্রায় এক। আমার শৈশব এই গাছের তলায় এক সময় খেলা করত। হাত বাড়িয়ে নিমপাতা পাড়তুম। সেই গাছ এখন। বিশাল মহীরুহ। তার সমস্ত ডালপালা এখন আমার নাগালের বাইরে। ধুলোখেলার বয়স যখন ছিল তখন গাছটার কাণ্ডে একটা পেতলের ড্রপিং পিন মেরে দিয়েছিলুম। সেই পেতলের টিপ এখন চব্বিশ ফুট উঁচুতে। ছুটির দুপুরে গাছটার রোদ ছিটোনো পাতার দিকে তাকিয়ে মনটা যখন হু-হু করে ওঠে তখন গাছের সঙ্গে কথা বলি,—তুমি আছ কিন্তু অনেকেই নেই। তুমি আমার সহজ অঙ্ক। জীবনের বছরের হিসেবে সময়কে আমি তোমার জন্যেই ফুটে মাপতে পারছি। ওই যে পেতলের টিপ, ঊর্ধ্বে মাত্র চব্বিশ ফুট এগিয়েছে। চব্বিশ ফুটেই আমি রিক্ত, নিঃস্ব, পোড়োবাড়ির প্রৌঢ় পুরোহিত। সময় আর কয়েক ফুট এগোলেই আমার খেলা শেষ।
দক্ষিণের ঘরে একটা ইজিচেয়ার পাতা আছে। বহুকাল আগে জ্যাঠামশাই এই চেয়ারটায় বসতেন। শীতকালে গায়ে জড়ানো থাকত বাদামি রঙের কাশ্মীরী শাল। একটা হাঁটুর ওপর আমি চেপে বসতুম। সমানে চলত নানা আবদার।
ইজিচেয়ারটা এখনও পাতা আছে। হাতলে এখনও হয়তো জ্যাঠামশাইয়ের চায়ের কাপের তলা থেকে লেগে যাওয়া চায়ের শুকনো দাগ খুঁজলে পাওয়া যাবে। আমি মাঝে মাঝে নাট্যকারের মতো পুরোনো দৃশ্য সাজাবার চেষ্টা করেছি জ্যাঠামশাইকে ফিরিয়ে এনেছি, জ্যাঠাইমাকে বসিয়েছি ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুল বাঁধতে। মাকে একই সময় বসিয়েছি খাটের পাশে, আমাকে রেখেছি ঘরের মেঝেতে জ্যাঠামশাইয়ের কালো চটি জোড়ার পাশে, হাতে দিয়েছিদম দেওয়া খেলনা—একটা জাপানি ট্যাঙ্ক। শূন্য ঘরে সময়কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি, পরমুহূর্তে শূন্যতা আরও বেড়েছে, হঠাৎ আলোর পর অন্ধকার আরও গভীর হয়েছে। আয়না আমারই বিষণ্ণ মুখ আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, চেয়ার বলতে চেয়েছে—তুমিই এখন বোসো, এরপর অন্য কেউ বসবে। খাট বলেছে আমার স্মৃতি নেই, তাই আমি কাষ্ঠকঠিন।
বাদামি শালটার ওপর দিয়ে সময়ের স্রোত বয়ে গেলেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। শালটার গায়ে অস্পষ্ট একটু কালির দাগ লেগে আছে। এটা মঙ্গলার কাজ। মঙ্গলা আমার ছেলেবেলার। বেড়াল। মশারির চাল বেয়ে খড়খড় করে ওপরে উঠে গিয়ে দুষ্টু দুষ্টু মুখে নীচের দিকে তাকাত, তাল খুঁজত ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ার। সেই মঙ্গলা কালির দোয়াত উলটে দিয়েছিল শালের ওপর। শালের মালিক এখন আর নেই। মঙ্গলাকে প্রচণ্ড প্রহার করা হয়েছিল। পরের দিন মঙ্গলা মারা। গেল। তার সঙ্গে আমার জীবনের যোগ রয়ে গেল এই কালির দাগে। অস্পষ্ট দাগটা যেন আমার কোলের কাছে শুয়ে থাকা গুটিশুটি মঙ্গলা। একদিন সে ছিল, এই দাগটা তার প্রমাণ।
মা মারা যাওয়ার পর একদিন বাক্স খুলে মা-র ফুল হাতা নীল সোয়েটারটা উলটে-পালটে দেখেছিলুম। যে অঙ্গে একদিন এই সোয়েটারটা উষ্ণতা দিত সে অঙ্গ বহুদিন আগে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘ্রাণ নিয়ে দেখলুম, মা-র গন্ধ লেগে আছে কি না। না, একটা পুরোনো ধুলো-ধুলো গন্ধ ছাড়া আর কিছু নিশ্বাসে পেলুম না। হঠাৎ আবিষ্কার করলুম পিঠের দিকে একটা লম্বা চুল জড়িয়ে আছে। সোঁয়া-সোঁয়া উলের সঙ্গে আটকে আছে। নিশ্চয়ই মা-র চুল। শেষ যে দিন সোয়েটার খুলে রেখেছিলেন, সেই দিন হয়তো আটকে গিয়েছিল। একগাছা চুল পড়ে আছে, মানুষটি কিন্তু বহুদিন চলে গেছেন। হঠাৎ যেন সময়ের উজান বেয়ে শৈশবকে ধরে ফেললুম। চলে গেলুম জামতাড়ার এক খোলা মাঠে। শীতের সকাল। দূরে একটা ঝাপসা পাহাড়। তিনটি চরিত্র সামনে এসে দাঁড়াল। বাবার যৌবন, আমার শৈশব, মা-র মৃত্যুর আগের বছর। মা আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে শিশিরভেজা কাঁকুরে মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছেন। ক্লান্ত চলার ভঙ্গি। মাথায় সিল্কের স্কার্ফ। পেছন থেকে বাবা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,—সাপ, সাপ। মা আমার হাত ধরে ছিটকে সরে এলেন। কুচকুচে কালো রঙের একটা সাপ এঁকেবেঁকে চলেছে। মা। আমাকে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নিতে চাইছেন, বুকের কাছে। অসুস্থ শরীর। শক্তি নেই। পেরেও পারছেন না। বাবার হাতে একটা পাথর। বলছেন ভয় নেই, ভয় নেই। সোয়েটার গায়ে ফেলে বত্রিশ বছর আগের মা-র স্পর্শ পাওয়ার জন্যে আমার প্রৌঢ় শরীর আকুল হয়ে উঠল। সময় হেসে বললে, অনেক দূরে চলে গেছি। তোমার জীবনের কোমল মুহূর্তটি তুমি চিরকালের গর্ভে ফেলে দিয়েছ, আর ফিরে পাওয়ার উপায় নেই।
ফিরে পাব না ছাত্রজীবনের সঙ্গীদের শিক্ষকদের। জীবনে বিকেল ঘুরে ঘুরে আসে কিন্তু সব বিকেলই এক নয়। গঙ্গার ধারে একদিন যাদের সঙ্গে বসে পালতোলা নৌকো দেখতুম, যে ছেলেটি চকখড়ি দিয়ে ঘাটের বাঁধানো পৈঠেতে ডেভিড কপারফিল্ডের, মিঃ ক্রিকলের ছবি আঁকত সুন্দর কার্টুনের ঢঙে, কিংবা যে ছেলেটি অপূর্ব সুরেলা গলায় বৈজু বাওরার গান গাইত, বচপনকে মহব্বতকো দিল সে না জুদা করনা, সেই শচীন, সেই নীতু আর কোনওদিনও ওই ঘাটের সেই জায়গাটায় এসে বসবে না। বহু গান, বহু হাসি, বহু আলোচনা ভেসে চলে গেছে। কে কোথায় ছিটকে গেছি জানি না।
বর্ষা গেছে, শীত এসেছে, গঙ্গা বয়ে চলেছে আজও; ঘাটের পৈঠেতে শ্যাওলা আরও পুরু হয়েছে। যেখানেই থাকুক নীতুর চুলে পাক ধরেছে, শচীন আছে কি নেই বলা শক্ত। পুরোনো রেকর্ডে বৈজু বাওরার গানটা যখনই কানে আসে, তখনই আমার ছাত্রজীবন সামনে এসে দাঁড়ায়। চোখের সামনে নীতুকে দেখতে পাই। বিষণ্ণ মুখ। ডেনরি-অন-শোন-এর ছেলে কলকাতায় এসেছিল পড়তে। থাকত মামার বাড়িতে, বড় কষ্ট করে। এখন কোথায় আছে? কোন নগরে, কোন বন্দরে! এখনও গান গায়, কে শোনে?
