বড়মামা বললেন, ‘বিয়েটাই তো আসল। পাত্রী পছন্দ তো?’
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।
‘আর একটা বিয়ে এখনি। আপনারা নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করুন। আমার একমাত্র ভাগনি সুনয়নার সঙ্গে বিভাসের।’ বড়মামার এই ঘোষণায় আসরের সবাই হইহই করে উঠলেন। বিকাশ বললে, ‘এক টোপরেই ম্যানেজ হয়ে যাবে।’
খুব জোরে জোরে সানাই বাজছে। একই বাড়িতে, একই লগ্নে এক জোড়া বিয়ে। পাশাপাশি দুটো বাসর।
বিকাশ বললে, ‘বিশ্বাস কর, তোকে ছাড়া একা একা কোনওদিন তো কিছু করিনি, তাই খুব খারাপ লাগছিল। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছিল।’
বিকাশের বউ সুতপা বললে, ‘কী করে কী হল?’
সুনয়না বললে, ‘নজরের তির মেরে এই প্রাণীটিকে বধ করেছি।’
সুতপা বললে, ‘বিশ্বাস কর, কেবলই ভাবছিলুম, তোকে ছাড়া আমি থাকব কী করে।’
বিকাশ বললে, ‘আমাদের বাড়ি গায়ে গায়ে। আমার দিদিই ওকে মানুষ করেছে।’
বিয়ে করতে এসেছিল একটা বর, ফিরে চলেছে দুটো বর। টোপর একটা।
দিদি হাঁ হয়ে গেছে কেবল বলছে—’দুটো বউ সামলাব কী করে।‘
পুরোহিত মশাই বললেন—’ডবল দক্ষিণা।’
দিন চলে যায়
আমি যে হারানোর কথা বলছি তার জন্যে কেউ কখনও সংবাদপত্রের হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ স্তম্ভে বিজ্ঞাপন দেবেন না। এই হারানো আমাদের জীবনে এতই অনিবার্য যার জন্যে আমাদের স্থায়ী কোনও ক্ষোভ নেই। সময় সময় এমনই উদাসীন, কী হারাল বুঝেও বুঝি না, ভেবেও ভাবি না। প্রতি মুহূর্তে মুহূর্ত হারিয়ে যাচ্ছে, প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে দিনে। গাছের পাতা যেমন ঝড়ে যায় তেমনি আবার নব কিশলয়ে নবীন হয়ে ওঠে। কিন্তু জীবন থেকে যে মুহূর্ত প্রতিনিয়ত সময়ের স্রোতে অনন্তের দিকে ভেসে চলেছে, তারা কোথায় গিয়ে কোন সাগরের মোহনায় পাললিক ব-দ্বীপ তৈরি করছে, জীবন জানে না। জীবনের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে হারিয়ে যাওয়াই হল এর ধর্ম।
যে-কোনও মানুষই জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য। এর কিছুটা আপেক্ষিকভাবে স্থিতিশীল, কিছুনশ্বর। যেমন, যে বাড়িতে জন্মেছিলাম, সেই বাড়িটা এখনও আছে, আরও শখানেক বছর হয়তো থাকবে। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে কিছু প্রাচীন হয়েছে, যৌবনের চেকনাই হয়তো নেই, তবু পুরোনো বাড়িটা তার অস্তিত্ব বজায়। রেখেছে। উত্তরের দিকের দৌড়-বারান্দা, যে বারান্দায় আমি শৈশবে ট্রাইসাইকেল চালাতাম, সেই বারান্দাটা যেমন ছিল তেমনই আছে। কিন্তু শৈশবে ঠিক বেলা তিনটের সময় মুখে পান দোক্তার খিলি পুরে যে দুর্গার মা বারান্দা মুছত সে আর নেই। ট্রাইসাইকেলটাও নেই। আমি কিন্তু আছি। এখন বলাইয়ের মা বারান্দা মোছে। তখন যেন ক্ষণিকের জন্যে অতীত উঁকি দিয়ে যায়। অস্পষ্ট, ঝাপসা শৈশব, জল উড়ে যাওয়া আয়নায় হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে আবার ঝাপসা হয়ে যায়। বলাইয়ের মাকে দুর্গার মা বলে ভাবতে ইচ্ছে করে।
বারান্দায় পুবের বাঁকে যেখানে সকালের রোদ থইথই করে, সেখানে ছেলেবেলায় মা আমাকে রোজ স্নান করাতেন। কাঠের পিঁড়ে পেতে লোহার বালতি থেকে রোদের তাতে ঠান্ডা কমে যাওয়া জল ঘটি করে মাথায় ঢেলে দিতেন। জল ঢালতে ঢালতে একটা জলাশয় মতো হত, আমি তখন। সাঁতার কাটার চেষ্টা করতুম। মা তখন পিঠে ফুলো চড় মেরে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিতেন। মা-র হাতের চুড়ি কিনকিন করে উঠত। সেই বারান্দার বাঁকে এখনও সকালের রোদ জমা হয়। মা কিন্তু বহুদিন চলে গেলেন। এখন হাজার চেষ্টা করলেও শৈশব আর ফিরবে না, মা-ও আর ফিরে আসবে না। বারান্দার ও জায়গাটায় এখন নীল প্লাস্টিকের বালতিতে জল থাকে। রোদ খেলা করে জল থেকে ছিটকে ওঠে উলটো দিকের দেওয়ালে। ছেলেবেলায় জলটাকে দুলিয়ে দিয়ে দেওয়ালের গায়ে রোদের প্রতিফলনকে নৃত্যচঞ্চল করে ভোলা একটা মজার খেলা ছিল। এখন আর সে বয়স নেই। অথচ জলও আছে, রোদও আছে। কোনওভাবে তিরিশটা বছর পেছোতে পারলে আবার সেই মুহূর্তগুলো ফিরে পেতাম। সময় বড় একমুখী। নদীতে তবু জোয়ার-ভাটা আছে, জল যায় আবার ফিরে আসে, সময়ের নদীতে কেবলই ভাটার টান।
আমাদের ঠাকুরঘরের কুলুঙ্গিতে একটা মা লক্ষ্মীর পট আছে। চল্লিশ বছর আগে এক শীতের সকালে মা, জ্যাঠাইমা, পিসিমারা কালীঘাটে গিয়ে ওই পটটা কিনেছিলেন। মা লক্ষ্মী এখনও সেই কুলুঙ্গিতে আছেন। তলার দিকটা এক ধরনের পোকা তিল তিল করে খেয়ে চলেছে, তবু মুখের হাসি অম্লান। সেই পুরোনো পেতলের প্রদীপ সন্ধ্যায় কেঁপে কেঁপে জ্বলে। সারা ঘরে সেই একই ভাবে ছায়া কাঁপে। আজও কেউ না কেউ গলায় আঁচল দিয়ে হাঁটু মুড়ে প্রণাম করে; তবে সে আমার মা-ও নয়, জ্যাঠাইমাও নয়। অথচ এই একই ঘরে তিরিশ বছর আগে আমার শৈশব বসে থাকত বাবু হয়ে, একপাশে মা, একপাশে জ্যাঠাইমা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। প্রদীপ কাঁপত ছায়া নিয়ে দেওয়ালের গায়ে। উপাসনার বই খুলে জ্যাঠাইমা সুর করে পড়তেন, মাতঃ সরস্বতী, ভগবতী ভারতী। আমরাও সেই সুরে সুর মিলিয়ে সন্ধ্যাকে রাতের দিকে নিয়ে যেতুম। রাতের পর রাত পেরিয়ে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে সন্ধ্যা আছে, প্রদীপ আছে, পট আছে, এমনকী পাতা খোলা বিবর্ণ কীটদষ্ট উপাসনার বইটাও আছে, নেই কেবল শৈশব। অথচ মাঝে মাঝে মনে হয় শৈশবটা হারায়নি, কোথাও না কোথাও ফুলের দাগের মতো, সিঁদুরের টিপের মতো লেগে আছে। মাতৃজঠরের জ্বণের মতো প্রৌঢ় আমি-র সঙ্গে তার নাড়ির যোগ রয়েছে, জঠরের শিশুর মতো মাঝে মাঝে নড়েচড়ে উঠছে, কেবল ভূমিষ্ঠ হতে পারছে না। যেন বহুকাল আগে নদীর জলে হারিয়ে যাওয়া একটি মুদ্রা। স্তরে স্তরে পলি জমেছে তার ওপর। স্রোত খেলা করে চলেছে। অদৃশ্য হলেও আছে। শৈশবের কাঠিমেই পরতে পরতে জড়িয়েছে সময়ের সুতো। দৌড়োতে পারিনি বলেই সময় আমাকে ছেড়ে ক্রমশ দূর থেকে দূরেই চলে যাচ্ছে।
