তপনবাবুর টিভি। আর সূর্যবাবুর ছেলে। এর চেয়ে ভালো উদাহরণ পাড়ায় আর কী আছে। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। দুটোই ডেলিকোয়েন্ট। তপনবাবুর টিভির প্রথম থেকেই নানা ব্যামো। তিনি প্রথম দিনেই একবার চোখ খুলেই সেই যে ধ্যান-নেত্র হলেন, হাজার খোঁচাখুঁচি করেও সে ধ্যান ভাঙানো গেল না। পর্দার ওপর দিকে দুটো ঠ্যাং, টেবিলের পায়া, সুন্দরীর চিবুক এইসব দেখা যেতে লাগল। যেন ত্রিশঙ্কু কা খেল। এক্সপার্ট এসে বললেন, ভোলটেজের ভোজবাজি। স্টেবিলাইজার পালটাও। টিভি তখন পুরো চোখ খুললেন। শুরু হল নতুন খেলা। ছবি পেছলাতে লাগল। মনে হল রেলগাড়ির জানালায় বসে শোন ব্রিজের ওপর দিয়ে যেতে যেতে দৃশ্য দেখছি। চোখের সামনে দিয়ে যেন ভেনিশিয়ান ব্লাইন্ড নেমে যাচ্ছে। কার ক্ষমতা থামায় সেই চলচঞ্চল অধোগতি। ভার্টিক্যাল হোল্ড করতে করতে ভার্টিগো হয়ে গেল। চোখে এমন ধাঁধা লেগে গেল তপনবাবু রাস্তায় বেরিয়েও ধরো বলে চিৎকার করে ওঠেন। সমগ্র বিশ্বসংসার যেন হড়কে হড়কে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সে রোগ সারল তো এল আর এক রোগ। টিভি একই সঙ্গে ধমকাতে এবং চমকাতে লাগল। তপনবাবু এখন ফ্যালফ্যাল চোখে রাস্তায় হাঁটেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন ছুটির দিনে। পরিচিতজন পাশ দিয়ে গেলে চিনতে পারেন না। কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন! পরশপাথর না কি! অনেকটাই তাই। ভিড়ের মধ্যে। মেকানিক খুঁজছেন। দোতলা থেকে জমিতে দৃষ্টি ফেলে রেখেছেন। যদি তিনি দর্শন দেন, ক্যাঁক করে ধরবেন! কোম্পানি হাত তুলে দিয়েছে। ভরসা এখন সেই বন্ধু। টিভি বিশেষজ্ঞ। দেখা হলে কথা দেন কিন্তু ধরা দেন না।
তারপর কী হয়?
তার আর পর নেই। রক্তের চাপ বেড়ে যায়। অভিজ্ঞ ব্যক্তি বলেন, টিভি কিনবেন সার্ভিস দেখে, যেমন হোটেলে ওঠেন অ্যাটাচড বাথ দেখে। যন্ত্র সব এক। সেই পিকচার টিউব, পর্দা, স্পিকার। খোলের বাহারে বিজ্ঞাপনের আশ্বাসে মাথানা মুড়িয়ে, ভালো বংশের মেয়ে আনবেন। ব্যবহার ভালো পাবেন। বিলিতি মেজাজ স্বদেশি ঘরে বিগড়াবেই। ধন্বন্তরি যেন ডাকলেই আসেন। যে প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস এক ডাকে সাড়া দেবে সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই টিভি কিনুন তাহলে আপনার ওই তপনবাবুর মতো আধপাগলা অবস্থা হবে না। এমন প্রতিষ্ঠান আছে নাকি? যাঁরা কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়।
ট্রাবলসাম প্রাণী
স্বামীদের মতো ট্রাবলসাম প্রাণী পৃথিবীতে আর দুটি নেই। যতক্ষণ বাড়ির বাইরে থাকে ততক্ষণই শান্তি। তাঁবুতে ফিরে এলেই দক্ষযজ্ঞ। ঘরে ঘরে স্বামীদের উৎপাতে স্ত্রী-রা জেরবার। সদাসর্বদা তাঁদের নাকের ওপর পার্মানেন্ট তিনটি ভাঁজ। মেজাজ তোলা উনুন, কণ্ঠস্বর ফাটা কাঁসি। বিবাহের আগে যার চলন ছিল কথাকলি, বিয়ের বছর না ঘুরতেই ক্যাঙারু। যাঁর স্পর্শে একদা ছিল কুসুমের কোমলতা, বছর না-ঘুরতেই খ্যাংরার কর্কশতা। অতীতে যিনি চাক-ভাঙা মধু মাখানো গলায় উত্তর দিতেন, যা আ আই (নীচের স্বরলিপি এইরকম গ ম প নি) বর্তমানে সাত ডাকের পর উত্তপ্ত রাগিণী কী হল কী (স্বরলিপি স ধা নি র্স)। কী হল কী-র অর্থ আবার ফ্যাচাং বের করলে?
স্বামী মানেই ফ্যাচাং। কনসেনট্রেটেড অশান্তি। কতভাবে যে গৃহশান্তি নষ্ট করা যায়, এঁদের কাছে শিখতে হবে। আর ফ্লোর ক্রসিং-এ এক্সপার্ট। দলবাজিতে তুলনাহীন। এই মায়ের দিকে তো পরমুহূর্তে বউয়ের দিকে। আবার পান থেকে চুন খসা মাত্রই প্রেমের তাজমহল ভেস্তে গেল, তোমাকে দেখলে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত রি রি করে। ডেরা পালটে গেল, মায়ের ঘরে
তখন অবস্থান। আবোল-তাবোল স্তোকবাক্য বৃদ্ধাকে, বুঝলে মা, এইবার ভাবছি, তোমাকে নিয়ে তীর্থে যাব। সংসারে কী আছে বলো? কে কার। মা আর সন্তান, আহা, কী স্বর্গীয় সম্পর্ক! মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে। বলো মা। মা আর ছেলের মতো দ্বিতীয় সম্পর্ক আর আছে! জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।
একটু মুচকি হাসি। আজ তোমার বোধোদয়, কাল তোমার বোধাস্ত। তিন দিন ধরে ঠুসঠাস চলছে, কাল মাঝরাতে তুমুল হয়েছে, আজ জ্ঞাননয়ন খুলেছে। মা এখন স্বর্গাদপি, কাল সেই পটপরিবর্তন হবে, সোহাগের রেড়ির তেলে সম্পর্ক হড়হড়ে হবে, তখন ফিশফিশ করে অন্তরালে বলবে, ষাট পেরিয়ে গেল এখনও স্বর্গেই যেতে পারলে না তো স্বর্গাদপি!
তোমার ঘরটা এইবার রং করতে হবে মা, সেই বাবা থাকতে একবার হয়েছিল। বেশ হালকা গোলাপি রং।
আমি যাই তারপর করাস। করাতে তো হবেই। কী অসুখে যাব কেউ তো জানে না।
তুমি ওইরকম সেন্টিমেন্টাল কথা বোলোনা তো, আমার চোখে জল এসে যায়। তুমি ছাড়া আমার কে আছে? তুমি তোমার নাতির বিয়ে দেখে যাবে। তোমাকে আমি চন্দনকাঠের চিতায় শোয়াব, ওই পঞ্চান্ন মিনিটের উনুনে নয়। তোমার শ্রাদ্ধে আমি সানাই বাজাব, গাওয়া ঘিয়ের লুচি খাওয়াব।
দাঁড়া আগে মরি।
আহা জন্মেছ যখন মরতে তোমাকে হবেই। শাজাহানও মরেছে, রাজকাপুরও মরেছে, বল্লভভাই। প্যাটেলও মরেছে। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে!
ধর যদি ক্যানসারে মরি, তাহলে শ্রাদ্ধের খরচ কী থাকবে, চিকিৎসাতেই দেউলে।
তুমি আমাকে কী ভাবো। বোকার মতো প্রেমে পড়ে হাবিলদারের মতো একটা হুমদো মেয়েকে বিয়ে করেছি বলে, সত্যিই কি আমি মাথামোটা। জানো তো, প্রেম হল থ্রম্বোসিস, সেরিব্রাল অ্যাটাক, টেম্পোরারি প্যারালিসিস। ফিজিওথেরাপিতে আবার ঠিক হয়ে যায়।
