এরপর কী হয়! ঘরের শোভা বাড়ে। চারটে ঠ্যাঙের ওপর লম্বাটে একটি বাক্স। যে মডেলই হোক। ঝকঝকে সুন্দর। সামনে তালশাঁস রঙের ছলছলে কাচের পরদা। সন্ধ্যায় যার ওপর ভেসে ওঠে চাঁদপানা সব মুখ, আলোর অবয়বে। ভালো করে তাকালে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পশ্চাৎপটে আলোর। রেণু ঝরে ঝরে পড়ছে। আলোকের ওই ঝরনা ধারায় ঘণ্টা তিনেক কত কিছুর বিচিত্র অবগাহন। বিরাটকায় ফড়িং-এর মতো ওই যন্ত্র-বিস্ময় একটি কোণ জুড়ে মহামান্য অতিথির মতো সারা দিবস নিদ্রার পর সন্ধ্যায় আঁখি মেলেন। চিচিং ফাঁক। মহতের সঙ্গে থাকলে অন্যেও মহৎ হয়। ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্রের অঙ্গরাগেও সামঞ্জস্য আনতে হয়। গ্রিলে রং। জানলা-দরজার। চেহারা ফেরানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। ভাঙা টেবিল, ত্রিভঙ্গ চেয়ার বিদায় নেয়। ডিভান আসে সেজেগুঁজে। শেড লাগানো সারস-বাতি! দেয়ালের পরিচয্যা হয়। পর্দার চাকচিক্য বাড়ে। তেনার কল্যাণে ঘর হেসে ওঠে। বাড়ির টিভিরুম। তা হলে কী হয়? কিছু খরচা হয়। কিছু খরচ লেগেই থাকে। সরকারি দপ্তর হলে বলা হত—ডেভেলাপমেন্ট এক্সপেনডিচার।
আর কী হয়? নিজের ভেতর থেকে একটা চৌকিদার বেরিয়ে এসে অন্যের শান্তি নষ্ট করে দেয়। মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী বয়স্ক মানুষ বলেছিলেন, ওটা তুমি রিটায়ার করার পর কিনলেই পারতে মধু। বাড়িতে সব পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা রয়েছে। সামলাতে পারবে? খুব পারব জ্যাঠামশাই। এখন তাই সন্ধেবেলা গৃহাঙ্গনে খেটে লাঠি হাতে মেজর রুডলফ রেডফোর্ডের মতো পাহারাদি করতে হয়। হাই কম্যান্ডের হুকুম ছাড়া ভোলা চলবে না। রাশন করে আমোদ ছাড়তে হবে। আজ একটু খেলা আছে। বেশ একটু হোক। সামান্য সংগীত। আচ্ছা সামান্য সংগীত হোক। একটা ইন্টারভিউ, শিক্ষামূলক। শিক্ষামূলক? বেশ হয়ে যাক। আজ মধ্যরাতে একটু বাংলাদেশ ধরার সাধনা? হয়ে যাক সাধনা। এসো হোল ফ্যামিলি লেগে যাই। অতঃপর কী হয়? শনিবার বাড়ি ঢোকা বন্ধ হয় আর রবিবার সন্ধেটা বাইরে কোথাও কাটিয়ে আসতে হয়। শনিবার বাংলা। সিনেমা। মেঝেতে পুরু জাজিম। প্রথম সারিতে বৃদ্ধাদের আসন। চোখে চালসে। পর্দার একটু কাছাকাছি না থাকলে মুখপোড়াদের মুখ দেখা যায় না, ঢংয়ের কথাও শোনা যায় না। যদি বলা হয়, ও ঠাকুমা চোখের বারোটা বেজে যাবে যে, সঙ্গে সঙ্গে কড়া উত্তর, চোখ থাকলে তো বারোটা বাজবে বাবা। চোখের মাথা খেয়ে বসে আছি। দ্বিতীয় সারিতে গ্যাঁট্টা-গোঁট্টা বউমারা। আশেপাশে তাঁদেরই কুঁচোকাঁচারা। থইথই অবস্থা। বাড়ির আসল বাসিন্দারা ভয়ে ভয়ে সব কোণের ঘরে ঢুকে বসে আছে। বাড়ি হাতছাড়া। কিছু বলার উপায় নেই। বললেই সমালোচনা হবে। ওঃ, ব্যাটার খুব অংহকার হয়েছে। ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। দেখব অহংকার কতদিন থাকে। অত বড় বলী রাজারও অহংকার টেকেনি! অতি দর্পে হত লঙ্কা। উলটে তাঁরাই বলেন। পাশেই রান্নাঘরে হয়তো কাপ-ডিশের শব্দ হল অমনি তাঁরা বলে উঠলেন, আস্তে আস্তে। তোমার হাত পা বড় চঞ্চল বউমা। ঠিক আমার মেজো বউটির মতো। বাথরুমে সামান্য জল পড়ার ছরছর শব্দ হয়েছে অমনি ধমক শোনা গেল, কলটা আবার এ সময় কে খুললে গা? ঠাকুমা, বাথরুমে। আপনার ছেলে অফিস থেকে ফিরে হাত-পা ধুচ্ছে। একটু পরে ধুলেই তো হয় মা। সব কিছুর একটা হিসেব থাকা চাই। মুখপোড়ারা যখন হড়ং বড়ং করে খবর পড়ে তখন হাত-পা ধুলেই হয়। আমরা যখন সংসার করেছি তখন কত হিসেবে চলতুম। কী বলো সরো! ওই হিসেবের জন্যে আমার কম নাম ছিল? কত্তা যখন খাবি খাচ্ছে তখন অন্য কেউ হলে চিল্লে বাড়ি মাথায় করত। আমি জানতুম কারুর মরার সময় চেঁচাতে নেই। কত্তো হিসেব। দাঁতে দাঁত চেপে রইনু। আর সহ্য করতে না পেরে বউদের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠলেন, ঠাকুমা, চুপ করবেন? ঠাকুমা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, আ মর। আমি চুপ করব কী কথা বলব, তুমি বলার কে? আমি চুপ করব না। তোমার বাড়ি? যার ধন তার ধন নয় নেপোয় মারে দই। ব্যস, লেগে গেল দক্ষযজ্ঞ!
শনিবার সন্ধের সময় এক কাপ চা চাইলে পাওয়া যাবে না। চা তৈরি করে রান্নাঘর থেকে বেরোনো যাবে না। সকলের চোখে পড়ে যেতে হবে। চক্ষুলজ্জা। সেটা কি ভালো দেখায়! সকলের সামনে তুমি একা চা খাবে? চারখানা ফুলকো লুচি, সঙ্গে আলুভাজা। সর্বনাশ! গন্ধ বেরোবে না। একে মা মনসা তায় ধুনোর গন্ধ! গ্রহণ লাগার আগে বা পরে যেমন খেয়ে নিতে হয়, প্রাকৃতিক কর্ম সেরে নিতে হয়, সেইরকম শনি আর রবিবার এই দুটো দিন বাড়িতে গেরোন। লেগেছে ভেবে সময়ে সব সেরে নিয়ো। আর হ্যাঁ, একটা পানিপাঁড়ে এই দুদিনের জন্যে ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হয়। ছবি মিইয়ে এলেই ভীষণ জলতেষ্টা সব। ঘন ঘন জল সাপ্লাই দিতে গিয়ে গেরস্থ কাত। কত্তা ভুল করে ওপাশের টেবিলে চশমা রেখে এসেছেন। এখন প্রয়োজনে। আর আনতে পারা যাবে না। কে যাবে টপকে টপকে! চোখ বুজিয়ে অন্ধকার বারান্দায় বসে ধ্যান করো। চশমা মিলবে রাত সাড়ে নটার পর।
তারপর কী হয়? অবিশ্বাসীও অদৃষ্ট বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। স্ত্রী আর টিভি—দুটি বস্তুই বরাতে লেগে গেল তো গেল, নইলে বংশদণ্ড। এর চেয়ে বড় বাঁশ আর কিছু নেই। গোমড়ামুখো পত্নী আর অবাধ্য টিভি সমান ক্লেদায়ক। মনমেজাজ খারাপ করে দেয়। গৃহিণী গৃহমুচ্যতে, টিভি টুপি উচ্যতে। হয় মাথা উঁচু করিয়ে দেবে, নয়তো নত করে দেবে। সেই কারণে ডিলার দেখা হলেই ভয়ে ভয়ে জানতে চান, কেমন চলছে? নো ট্রাবল? ক্রেতা যেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ও ফাইন। কী রিসেপশান! অভিজ্ঞ ডিলার অমনি ভয়ে ভয়ে বললেন, আস্তে মশাই, আস্তে। বলবেন না বলবেন না। যেন টিভি আর অদৃষ্ট এখুনি শুনে ফেলে বিগড়ে বসে থাকবে। পাগলা সাঁকো নাড়াসনি গোছের অবস্থা।
