হয়, তবে আগের মতো হয় না। মুখটা বেঁকে থাকে। পা টেনে টেনে চলে। বিয়ের ছেলে আর বিয়ের পরের ছেলেতে অনেক তফাত।
তুমি যা বলতে চাইছ, আমি ধরেছি ঠিক, তবে তুমি বলার আগেই আমি নিজেকে ধরে ফেলেছি।
আর তোমার সুবোধ জরুকা গোলাম নেই। বেরিয়ে এসেছি। এখন কী গান গাইছি জানো, রামপ্রসাদ সেন, যার জন্য মরো ভেবে, সে কি তোমার সঙ্গে যাবে। সেই প্রেয়সী দেবে ছড়া অমঙ্গল হবে বলে। মা, মা-ই সব।
ধর যদি হয়।
কী হয়?
গলায় ক্যানসার।
কোন দুঃখে গলায় ক্যানসার হবে। তুমি কি আমার সেই মা, যে গলায় ক্যানসার ধরিয়ে আমাকে পথে বসাবে? শাস্ত্র কী বলছে মা, কুপুত্র যদি বা হয় কুমাতা কখনও নয়। তোমার ওই হলে আমার ভবিষ্যটা কী হবে ভেবে দেখেছ। বাড়ি যাবে, গয়না যাবে, তুমিও যাবে, গাছতলা।
আমার হবে কী, হয়ে বসে আছে।
যাঃ, কে বলেছে, ভয় দেখাচ্ছে।
ডাক্তার বলেছেন।
কিস্যু জানে না, হাতুড়ে। বায়োপসি না করে ক্যানসার বোঝা যায়?
সে-ও হয়ে গেছে।
কে করালে?
বউমা।
আমি থাকতে বউমা কেন?
তুই তো থেকেও নেই। তুই তো না বউয়ের, না মায়ের।
আমি তা হলে কার?
তুমি বাছা এখন ইউনিয়নের, পার্টির।
তোমার ব্যবস্থা তাহলে কী হবে?
কিছু না। যেদিন গিলতে পারি গিলব, তারপর উপোস, তারপর বলো হরি।
ওয়াইজ ডিসিশান। মরার জন্য বেমক্কা খরচের কোনও মানে হয় না।
কেন রে, চুল উঠে যাবে, চোখ ঢুকে যাবে, গলা শুকিয়ে যাবে, রক্ত ভেসে যাবে, সোনার বর্ণও কালো হয়ে যাবে।
আমি জানি, তুমি হিরো, বাবা মারা যাবার পর যেভাবে সংসারের হাল ধরেছিলে, যেভাবে আমাদের মানুষ করেছিলে, তুমি হিরো।
অবশ্যই। তা না হলে, এমন হিরের টুকরো জন্মায়।
মনে আছে ছেলেবেলায় তুমি আমাদের বলতে, জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য। আমি জানি, তুমি মরতে ভয় পাবে না। যথেষ্ট বেঁচ্ছে আর বেঁচে কী হবে। সেই একই দিন একই রাত, সেই একই আলু, পটল, কচু, ঘেঁচু, মুলোনতুন তো আর কিছু হওয়ার নেই, বরং একটা নতুন শরীর হলে কত ভালো। আবার আমি তোমার মতো মায়ের ছেলে হব।
সে তাহলে আমার পরের পরের জন্মে।
কেন, পরের জন্মে কেন নয়?
আমাকে ধরতে পারবি না। হিসেবে আসছেনা। আমি মরার চল্লিশ বছর পর তুই মরবি। পঁয়তাল্লিশও হতে পারে। ততদিনে আমি দিদিমা হয়ে যাব। তুই আমার নাতি হতে পারিস।
তোমাকে একটু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। মা মানেই তো ত্যাগ। কবে যেন উপনিষদে পড়েছিলুম, মা গৃধঃ, অর্থাৎ মায়েরা গাধা।
আচ্ছা, উপনিষদে আছে বুঝি! আমার বিদ্যে রামায়ণ, মহাভারত, লক্ষ্মীর পাঁচালি। তা কী ত্যাগের কথা বলছিস?
সামান্য ব্যাপার, মরার পর আবার দুম করে জন্মাবে না। একটু হাওয়া হয়ে থাকবে। পরের জন্মে তুমি কত বছর বয়েসে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছ?
এখনও করিনি, তবে যুগ তো তখন অনেক এগিয়ে যাবে। তিরিশের আগে কি করা যাবে?
কাকে?
আরও বড়লোকের কোনও ছেলেকে। আর যদি প্রেম করি। প্রেম করে হিন্দি সিনেমার কায়দায় আমার বাবার গাড়ির ড্রাইভারকে বিয়ে করি। মুম্বাইয়ের কোনও ঝুপড়িতে গিয়ে বাসা বাঁধি?
তুমি আমার মা হয়ে এমন অন্যায় কাজ করতে পারবে না! তুমি না আমার মা হবে।
বেশ, তাহলে কোনও কালোয়ারকে বিয়ে করব। অনেক টাকা।
নজরটা আর একটু উঁচু করো মা। টাকার সঙ্গে কালচারটাও যোগ করো। আনকালচারড ফ্যামিলিতে আমি জন্মাতে পারব না।
আমার প্ল্যান অন্য।
কীরকম?
পরের বার তুই যেই জন্মবি, সঙ্গে সঙ্গে কলাপাতায় মুড়ে ডাস্টবিনে। সারারাত তিনটে রাস্তার কুকুর তোকে পাহারা দেবে। পরের দিন অনাথ আশ্রমে।
এই তোমার বিচার?
হ্যাঁ, এই বিচার। পরের বাড়ির মেয়েকে গোলাপ ফুল শুকিয়ে, মালা দুলিয়ে, প্রেমের পানমশলা খাইয়ে বউ করলে। প্রেম তিন দিনেই চটকে গেল। কথায় কথায় চুলোচুলি। বাপ বললে শালা উত্তর। আজ তিন দিন হয়ে গেল না খেয়ে আছে। আমারও উপোস।
শোন, ক্যানসার আমার গলায় শুধু নয়,
তাবৎ মধ্যবিত্তের ঘরের বউদের গলায়,
কেন জানিস, একালের স্বামীরা অদ্ভুত এক ভূত।
ডবল দক্ষিণা
প্রাণের বন্ধুর বিয়ে। শুধু বরযাত্রী নয়, একেবারে ঘনিষ্ঠ বরযাত্রী। বরের গাড়িতে। বরের পাশে। টোপর কোলে। ফুল-পাতা দিয়ে সাজানো গাড়ি। রজনীগন্ধার প্রেম ছেটানো গন্ধ। এই এক ফুল। গন্ধে প্রেম উসকে দেয়। এক ঝটকায় ব্যাবিলনে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আরব সুন্দরীদের ছুরির ফলার মতো চোখ। যে রূপ দেখলে পুরুষ পাগল হতে বাধ্য।
সাংঘাতিক মাস। ফাগুন। দখিনা বাতাস ছেড়েছে। ডেকে ডেকে কোকিলদের গলা বসে গেল। কোকিলের তবু প্রেম জাগল না। এদিকে আকাশে থালার মতো চাঁদ। দুধের মতো আলোয়। চরাচর ভাসছে। কোন্নগরের একেবারে গঙ্গার ধারে একটা বাগানবাড়ি। গঙ্গার দিকে বিশাল বাগান। যত্নের বাগানে টুপুর-টাপুর আলোর মালা। রাতের স্বপ্নজাল বুনছে। সাবেক কালের বনেদি পরিবার। ধনী পরিবার। গ্যারেজে পালিশ করা ভক্সহল গাড়ি। সুখের দিনের কথা কইছে।
প্যাঁ প্যাঁ করে সানাই বাজছে। ইমনের বিরহী সুরে। মোচড়ে মোচড়ে সখি প্রাণ যায় যায়। তিনতলা বাড়ি। সদ্য রং করা হয়েছে। আগাপাশতলা আলোর ছড় দুলছে। যেন আলোর মিছরি চুরচুর করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গাড়ি ঢোকা মাত্রই পোঁ-পোঁ করে কয়েক জোড়া শাঁখ বেজে উঠল। দরজা খুলে পট করে নামতে যাচ্ছিলুম। বাইরে থেকে ভারী গলায় আদেশ, ‘ওয়েট’। থতমত খেয়ে বন্ধুর মাথায় টোপরটা বসিয়ে বাইরে মেয়েদের দঙ্গল থেকে ভেসে এল—খিক খিক—বন থেকে বেরোবে টিয়ে শোলার টোপর মাথায় দিয়ে। বন্ধু আমার ডান হাতটা চেপে ধরে বললে, ‘ডেনজারাস জায়গা। আমাকে ছেড়ে এক মুহূর্তের জন্যও কোথাও যাবি না। একটা মেয়ে দেখলেই আমার বুক ধড়ফড় করে, এ তো এক দঙ্গল! মনে হচ্ছে পালিয়ে যাই।’
