একালের শিশুরা টিভির কৃপায় অতি-পর্ক। বাপ-মাকেই জ্ঞান নিতে হয়। এমন সব পোশাক পরেছে, যা সেকালের পাগল-পাগলিরাই পরত। এখন ছেলেমেয়েরা খুব আদরে থাকে। ইউনিট ফ্যামিলি। সন্তান সংখ্যা কম। একটা কি দুটো। ফলে চেহারা সব ফুটবলের মতো। সেই চেহারায় মেয়েদের পরিধানে টাইট পোশাক। এর আবার সব নাম আছে।
আমেরিকা থেকে মুম্বই, মুম্বই থেকে কলকাতা। এইরকম সব নাম, ‘হিপ-হাগিং’, ‘ব্রেস্ট প্রেমোটিং’। এক কিশোরী পাজামার মতো কী একটা পরেছে।
তলার দিকটা ফালাফালা করে কাটা। যেন কেউ চিরে দিয়েছে। এটা হল বটম, আর টপটা হল সিল্কের স্যান্ডো গেঞ্জি। এই পোশাকের নাম হল ‘ক্লাউন কাট’।
এই সিরিজে আর একটা ধরন আছে—’আন্ডার কাট’। সেটা কী ফ্যাশান, যাঁরা জানেন তাঁরাই জানেন, মাছ যেমন জলে সাঁতার কাটে সেইভাবে এই মানবপুকুরে তারা ঘাই মেরে বেড়াচ্ছে। উঠতি বয়সের ছেলে আর মেয়েরা আগামী বিবাহের মহড়া দিচ্ছে। প্রবীণ-প্রবীণারা দেখেও। দেখছেন না। যুগ একেবারে কেলেঙ্কারি রকমের বদলে গিয়েছে। কেউ কারও কথা শুনছে না। বলে, কেউই কাউকে কিছু বলছে না। সবাই ড্যাব ড্যাবা চোখে, জগতের গ্যালারিতে বসে জীবনের তামাশা দেখছে।
কেউ হয়তো এইরকম বলছেন, ‘ওটা কার মেয়ে?
‘আমাদের প্রমোদের মেয়ে।’
‘অ্যাঁ। এতটা এগিয়েছে?
‘মেয়েরা ভীষণ স্পিডে এগোচ্ছে ভাই।’
‘কোন দিকে?’
‘সে আমি বলতে পারব না।’
‘ওই কালো পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা কে? খুব লপচপ করছে।’
‘চিনতে পারছ না, মননজের ছেলে। টেলি-সিরিয়ালে অভিনয় করে। ওই সিরিয়ালটা তুমি দেখো না?’
‘কোনটা?’
‘এক আকাশে অনেক তাঁরা। পাঁচ বছর ধরে চলছে, আমার মেয়ের বিয়ে হল, নাতি হল, সে স্কুলে ভরতি হল। এখনও চলছে!’
‘চলবেই তো! আকাশে কত তারা আছে জানো? তা চুলগুলো অমন ঝুলঝাড়ুর মতো হয়ে আছে। কেন?’
‘ওটা লেটেস্ট। টম হ্যাঙ্ক কাট।’
‘সে আবার কী? আমাদের সময় ছিল ইটালিয়ান কাট।’
‘টম হ্যাঙ্ক একজন বিলিতি স্টার। ও তাকে নকল করছে।’
‘আসল হতে আপত্তি কী?’
‘কাটবে না। গানের রিমেকের মতো। লতাকণ্ঠী, কিশোরকণ্ঠ।’
‘সব দু-নম্বরি।’
এরই মধ্যে একজনের উৎপাতে সকলেই অতিষ্ঠ। তিনি একটা ভিডিয়ো ক্যামেরা নিয়ে যার-তার ঘাড়ে পড়ছেন।
হঠাৎ শোরগোল, ‘গেল, গেল, গেল, গেল, রিনামাসির পরচুল খুলে নিয়ে গেল।’
ক্যামেরার তারে জড়িয়ে পরচুল উৎপাটিত। করুণ মাথার চেয়ে ভদ্রমহিলার মুখচ্ছবি আরও করুণ।
কী ছবি তুলছে বল তো! ঘুরে ঘুরে সেই একই দৃশ্য। ফুলমাসি এতখানি হাঁ করে মুখে পানের খিলি পুরছে। মহিলাসক্ত জগাদা মেয়েদের সঙ্গে ফাজলামো করছে। তারের চেয়ারে ফুলের গয়না পরে নববধূ সেঁটে বসে আছে। মাথার চুলে রজনীগন্ধার পোকা ঘুরঘুর করছে। বধূ সাজানোর কোম্পানি ঝাড়া চারঘণ্টা সাজিয়েছে। চুলে শ্যাম্পু মেরেছে তিনবার। ফল বেরোচ্ছে। ফিচিত, ফিচিত হাঁচি। বর বড় উতলা হয়েছেন। বন্ধুদের ছোটাছুটি—অ্যান্টি-অ্যালার্জিকের তল্লাশে।
একজন অভিজ্ঞ বললেন, ‘ডোন্ট ডু দ্যাট, ডোন্ট ডু দ্যাট, বউ ঘুমিয়ে পড়বে। হাঁচতে দাও। কাশি হলে দেখা যাবে।’
‘ছেলেটি কী করে জানো? বউ মেন্টেন করতে পারবে তো?’
‘আজকালকার ছেলেরা কী করে বোঝা মুশকিল! আমাদের কালে বলা যেত। শুনেছি চাওমিন কাউন্টার আছে, খুব বিক্রি। মেয়েটি খদ্দের ছিল, প্রেম হল, পাকল, বিয়ে হল। কাউন্টারের রাস্তার দিক থেকে ভেতরের দিকে চলে এল।’
‘সে ভালো। এইবার চিলি চিকেনও বিক্রি হবে। একেই বলে, জীবনের সস! সুইট অ্যান্ড সাওয়ার।’
টি ভিং মনোরমাং
ঘরেতে ভ্রমর এলে কী হয়? গুনগুনিয়ে ওঠে।
ঘরে টেলিভিশন এলে কী হয়? প্রথমে ছাদের মাথার ওপর ফাঁক ফাঁক চিরুনির মতো একটা বস্তু শূন্যাকাশে গৃহস্বামীর অহংকারকে বারোমাস চিতিয়ে রাখে। ইদানীং শহরে টিভির সংখ্যা বেড়েছে। বছরে বছরে বাড়ছে। একটা সময় ছিল যখন মহল্লার দুটি-একটি বাড়ির ছাদেই। অ্যান্টেনা শোভা পেত। সেই সময় জনৈক ভদ্রলোক তাঁর বাড়ির নিশানা আমাকে এইভাবে দিয়েছিলেন, বাস থেকে নামলেন। নেমেই নাকের সোজা দু-কদম হাঁটলেন। বাঁ-দিকে ঘুরলেন। সোজা রাস্তা ধরে এগোচ্ছেন, প্রথম ডান দিকের রাস্তায় ঢুকে আকাশের দিকে তাকালেন। ব্যস, আমার বাড়ি দেখতে পেয়ে গেলেন। কাউকে জিগ্যেস করার কোনও প্রয়োজন নেই। অ্যান্টেনা লক্ষ করে চলে আসুন, চলে আসুন। আসছেন, আসছেন। এসে, এসে গেলেন। এরিয়েলের ফিতে কার্নিশ ঘেঁষে, ঝুলবারান্দা টাচ করে নীচে নেমে এসেছে। কলিংবেল টিপলেন। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনলেন। অ্যালসেশিয়ান। ডাক শুনলেই বুঝবেন। কয়েক সেকেন্ডে অপেক্ষা করলেন। ম্যাজিক আই দিয়ে চট করে একঝলক দেখে নিয়েই দরজা খুললুম। আমি আপনার সামনে। নো প্রবলেম। রোববার সন্ধের মুখে তাহলে চলে আসুন। টিভিতে সিনেমা-টিনেমা দেখে রাতের আহার করে চলে যাবেন। নো প্রবলেম। ও তল্লাটে আর কোনও বাড়িতে টিভি নেই। দ্যাট ইজ দি ওনলি হাউস।
সেই ওনলি হাউসে গিয়ে আমি শুধু অ্যান্টেনাই দেখিনি, সেই বায়ুপক্ষে একটি ঘুড়িকেও আটকে থাকতে দেখেছিলুম। অহংকারে যেন ন্যাজ বেরিয়েছে। তা হলে টিভি এলে প্রথমে কী হয়? ছাদে পাইপের পাঁচটা আঙুল জানান দিতে থাকে আমার আছে। আমি অর্ডিনারি ক্লাস নই, টিভিক্লাস। ঘুড়ির সিজনে একটি ঘুড়ির মৃতদেহ সেই আঙুলে ধরা পড়ে লাট খেতে থাকে। দিনের বেলায় কাক বসে গলা সাধে। মাঝেমধ্যে গোলাপায়রা সপরিবারে বসে সাংসারিক কথাবার্তা বলে। বিশ্রম্ভালাপ করে। বাসা বাঁধার ঋতুতে কাক প্রাণপণ চেষ্টা করে ঠোঁটে করে এরিয়েলের তারের খানিকটা কেটে নিয়ে উড়ে যেতে।
