‘স্যার। আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন না।’
‘আর তোরা যে আমাকে ছেড়ে চলে যাবি? তার বেলা!’
‘সে তো স্যার যেতেই হবে। স্কুল শেষ হলে কলেজে।’
‘আমি তোদের ছেড়ে থাকব কী করে?’
‘ছেড়ে থাকবেন কেন, আমরা রোজ আসব। এই জেটিতে। আপনি আমাদের পড়াবেন।’
‘সে হয় না রে। কলেজের অন্য আকর্ষণ। অনেক বড় জায়গা, নতুন বন্ধু। শিক্ষকরা সেখানে অধ্যাপক। নামীদামি। তাই জানিস তো, তোরা ছাড়ার আগেই আমি ছেড়ে দিচ্ছি। আর ক’টা দিন। ৩০ তারিখে আমি বরোদার একটা কলেজে চলে যাচ্ছি।’
আমাদের সব কথা বন্ধ। হাতে ধরা ঝালমুড়ির খালি ঠোঙা। কয়েক হাত নীচে ভরা গঙ্গার জলের কুলুক কুলুক শব্দ। প্রথমে কথা কইল ভুতো—’আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন স্যার? কত দূর? বরোদা? একটু আগে কী বলছিলেন, ভূতনাথ যার নাম, সে কতদূর যাবে? অনেক অনেক দূরে, আপনার চেয়েও দূরে!’
এই বলতে বলতে ভূতনাথ জেটি থেকে ডাইভ মেরে ভরা গঙ্গার জলে; তখন ভাটার টান। জল চলেছে সাগরে। এক মুহূর্ত! স্যার ঝাঁপ মারলেন। আমরা সবাই সাঁতার জানি। আমরাও জলে। রোজকার বেড়ানোর দল পাশের পিচ বাঁধানো রাস্তায়। বৃদ্ধদের হাতে ছড়ি। তাঁরা ভেবেছেন প্রতি বছর চাতরা থেকে বাগবাজার সাঁতার প্রতিযোগিতা হয়। তাই হচ্ছে। ছড়ি উঁচিয়ে একজন উৎসাহ দিচ্ছেন, ‘ফাস্ট, ফাস্ট’। আর একজন বলছেন, ‘বেরিয়ে গেল, বেরিয়ে গেল।’
আমরা সবাই ভালো সাঁতার জানি। ভুতো স্কুল-চ্যাম্পিয়ান। একটা সাংঘাতিক কায়দা জানে ডুব সাঁতারে। প্রচণ্ড দম। জলের তলায় বহুক্ষণ এলিয়ে থাকে। একটাই কথা, ইচ্ছে করে যদি আত্মহত্যা করে, সাঁতার না কাটে তাহলে তো কিছু করার নেই। দূরের একটা ঘাটে স্রোতের। নাবালে রামুদা সন্ধ্যাস্নান করছে। রোজের রুটিন। জমিদারি আমলের ছোট্ট একটা রামমন্দির আছে ভূতুড়ে একটা বাগানে। বাগানটা একেবারে গঙ্গা থেকে উঠেছে। সে প্রায় একশো বছর আগের ব্যাপার। এখন এদিক ভাঙছে, ওদিক ভাঙছে। রামুদা নিজের মাইনের টাকায় মন্দির সংস্কার করেছে। বামুন দিদিও টাকা দিয়েছেন। এখন রামুদা নিজেই পুজো করে। গান গায়।
জলের তলায় রামুদার পায়ের ফাঁকে কী একটা বড় মতো ঢুকল। রামুদাকে ঠেলে ওপর দিকে তুলছে সেই জলচর প্রাণীটা। প্রথমে ভেবেছিল শুশুক। তারপর দেখলে চুল রয়েছে। চুল থাকলে মাথাও থাকবে। কথায় আছে, চুল টানলেই মাথা আসবে। ভুস করে ভেসে উঠল ভুতো।
স্যার যে এত এক্সপার্ট সাঁতারু আমরা জানতুম না। রামুদা ঠিক বুঝতে পারছেনা ব্যাপারটা কী? জামাকাপড় পরে এই সন্ধেবেলা সাঁতার কাটছে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর কয়েকজন ছাত্র। ভুতোও ডুবসাঁতার কাটছিল। সে-ও বুঝতে পারেনি যে রামুদার পায়ের ফাঁকে ঢুকে গেছে। ভয়ও পেয়েছে। কারণ, এই অবেলায় কেউ স্নান করে না।
জোয়ারের সময় ঘাটের সব সিঁড়িই ডুবে যায়। ভাটা পড়েছে। জল নামছে। একটা-দুটো সিঁড়ি জেগেছে। আমরা সার বেঁধে একটা পইঠেতে দাঁড়িয়েছি। জল ঝরছে পায়ের কাছে। আমাদের ফিতে বাঁধা বুট জুতোয় জল খাপাত-খাপাত। স্যারের জুতো, চশমা, পাঞ্জাবি, ব্যাগ জেটিতে।
ভুতো সাষ্টাঙ্গে স্যারকে প্রণাম করে বললে, ‘দেখলেন তো স্যার, রামুদা চুলের মুঠি না ধরলে, চলে যেতুম সাগরে। আমার দম বেশি, তাই বেঁচে গেলুম। বলুন, আপনি যাবেন না, তা না হলে ভুতো সত্যি থাকবে না!’ স্যার অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। গঙ্গার জল আর চোখের জল এক হয়ে গেছে। ভুতোর ভিজে মাথায় ফরসা, গোল ডান হাতটা রেখে বললেন, ‘ভূতনাথ! আমি তোমার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। তোমার এই দম তোমাকে বহুদূর নিয়ে যাবে। আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের ব্যাচটা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি অন্য কোথাও যাব।’ আমরা সমস্বরে ‘হুররে’ বলে চিৎকার ছাড়লুম। কেউ বুঝল না কী হল।
তারপর কী হল শুনবে? স্যার চলে গেলেন ইংল্যান্ডে। ভূতনাথ ভট্টাচার্য, ডক্টর বি. এন. ভট্টাচার্য, জগদ্বিখ্যাত নাম। এক নম্বর হার্ট স্পেশালিস্ট। মানুষের হৃদয়ের খবর তার মতো আর কেউ রাখে না। স্যার চলে যাওয়ার পরের দিনই রামুদা চলে গেল। নর্মদার ওঙ্কারেশ্বরে। সাধু। আমার মাকে দিয়ে গেল ঝালমুড়ির রেসিপি, একটা সোনার হার আর চোখের জল। আর আমি? এই তো আমি, আমার কাছে বসে আছি লক্ষ্মী হয়ে।
টক ঝাল মিষ্টি
প্রথমে দেখা হল। তারপর প্রাণ আঁকুপাঁকু। তারপর দেখাদেখি, ঘোরাঘুরি। মাইলের পর মাইল কথা। অর্থহীন হাসাহাসি। হাত ধরাধরি। নাকানাকি। বেড়াবেড়ি। তারপর বিয়ে। গুচ্ছের লোকের গুঁতোগুতি। কেউ আনল ফোল্ডিং ছাতা, কেউ শাড়ি, কেউ ননস্টিক প্যান, কেউ এক পয়সার সোনার নাকছাবি।
ভাড়া-করা বিয়েবাড়িতে প্রবল হুল্লোড়। বাকসে চাপাসুরে গান। ক্যাটারারের উর্দি-পরা কর্মীর দল সেই ভিড়ে উল-বোনা কাঁটার মতো মানুষের ফাঁসের মধ্যে দিয়ে অক্লেশে চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে। যখনই প্রয়োজন হচ্ছে হাতের ট্রে মাথার উপর তুলে মাথার পর মাথা ‘পাস’ করাচ্ছে। কোনও দুর্ঘটনা ঘটছে না।
মেয়েদের ঠোঁট দগদগে লাল। মোমপালিশ মুখ। খড়খড় শাড়ি, লেপ্টে থাকা শাড়ি, অদৃশ্য শাড়ি। ব্লাউজের নানা ধরন। কোনওটার পিঠের দিকটা স্মৃতিটুকু থাক’। কোন অতলে তার সীমারেখা পরিহিতাই জানেন। কোনও ব্লাউজ সামনের দিকে এতটাই দুঃসাহসী যে, পুরুষদের মাথা ‘সিগন্যাল ডাউন’। দৃষ্টির রেলগাড়ি পা ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
