সব স্যারের মুখেই এক কথা, ‘রামাধর ইজ রামাধর’। রামাধর লেখাপড়া খুব ভালোই জানে। ইংরিজি, বাংলা, হিন্দি তো তার নিজের ভাষা। কিছুদিন ডাকবিভাগে চাকরি করেছে। দ্বারভাঙ্গার রাজবাড়িতে চৌকিদারি করেছে। এখন একেবারে অন্য মানুষ, যেন এক সাধু! কোনোদিন, কোনো কারণে আমার মা স্কুলের ভাত ধরাতে না পারলে একটা চিরকুটে লিখে দেন, ‘দাদা, ছেলেটাকে কিছু খাইয়ে দিও।’ মা সত্য সত্যই দাদা বলে মনে করেন। কেন জানি না রামাধরও মাকে সত্যি সত্যি দিদি ভাবে। সম্পর্কটা বেশ মজার, মা বলবে ‘রামুদা’; আর রামুদা মাকে। বলবে, ‘সীতা দিদি’। মা ঝালমুড়ি খুব ভালোবাসে। কাগজের ঠোঙা নয়, শালপাতার ঠোঙায়। আলাদা করে ঝালমুড়ি মুড়ে তারপর কাগজের ঠোঙায় ভরে রামুদা আমাকে বলবে, ‘ছুট্টে গিয়ে মাকে দিয়ে আয়।’ চার-পাঁচটা বাড়ির পরেই আমাদের দোতলা বাড়ি। বাড়ি থেকেই স্কুলের ঘণ্টা শোনা যায়। আমাদের স্কুলটা ইংরেজ আমলের। অনেকটা চার্চের মতো। বেশ গম্ভীর। ঢুকলেই। মনে অন্যরকমের একটা ভাব আসে। বড় বড় হলঘর। বড় বড় সব মানুষের তেলছবি দেয়ালে। দেয়ালে। দোতলায় একটা বইঘর। বই ঠাসা সব আলমারি। কোথাও এক ফোঁটা ধুলো নেই। হেডস্যার রবিবার রবিবার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে লোক দিয়ে সব পরিষ্কার করান। আমাদেরও বলেছেন—শ্রমদান করতে হবে। নিজের কাজ নিজে করার কত আনন্দ! বাড়িতেও নিজের সব কাজ নিজে করবি। সাজপোশাকে কাপ্তেনি খুব খারাপ। ভালো করে গামছা গিয়ে গা ঘষে ঘষে। চান করবি। সেন্ট, পাউডার মাখবি না। ওসব মেয়েলি জিনিস। পুরুষ মানুষ পুরুষমানুষের মতো হবি। যা পাবি, হাসিমুখে পেট ভরে খাবি। আর মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করবি। ব্যস, আর কিছুর দরকার নেই। সব আপসে হয়ে যাবে। আসলে কী বল তো? একটা ভালো মানুষ, সাচ্চা মানুষ হওয়া। আর গাছপালা, জীবজন্তুদের খুব ভালোবাসবি। আকাশ দেখবি, তারা দেখবি, মেঘ দেখবি, জল দেখবি, চাঁদের আলোয় ঘুরে বেড়াবি, নিজের ছায়া দেখবি, ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটবি, ভোরবেলা ফুল কুড়োবি, নির্জন জায়গায় বসে মন্দিরের চুড়ো দেখবি, ফটফট করে সাদা পায়রা উড়ছে, বসছে হাঁ-করে দেখবি, সানের মেঝেতে নিজের পায়ের ভিজে ছাপ দেখবি, ঘণ্টার ধ্বনি শুনবি, সকালের রোদে রোজ কিছুক্ষণ বসে থাকবি। হালকা নীল রঙের জামা পরবি। নিজেকে খুব শ্রদ্ধা করবি। রোজ কিছুক্ষণ মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকবি।
বিকেলের গঙ্গা। ভরা গঙ্গা। আমরা অনেকটা উঁচুতে জলের ওপরেই বসে আছি, জেটিতে। স্যার। জলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘দ্যাখ, বিকেলবেলায় গঙ্গা যেন বেড়াতে বেরিয়েছেন। অদ্ভুত লাগে এই সময়টা। খা খা, ঝালমুড়ি খা। আজ রামু দারুণ মেখেছে, কিছু বাদ দেয়নি, মনে হয় রামজিকে খাওয়াবে। লোকটাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত। এরকম সৎ লোক খুব কম জন্মায়। কাল কী করেছে জানিস? মাইনের টাকার খামটা টেবিলের ওপর ফেলে রেখে আমি বাড়ি চলে গেছি। ভাবছি, ও গেছে। রাত নটার সময় রামা বাড়িতে গিয়ে। হাজির, ‘এই নিন স্যার। এবার থেকে অতটা অন্যমনস্ক হবেন না স্যার।’ আমি কিছু টাকা দিতে গেলুম। নিলে না, বললে, ‘আমি কি আপনার পর?’ শোন, আমি তো সেই কোন ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি, এই সেদিন মা-ও চলে গেলেন। মানুষের মা, বাবা না থাকলে জীবনটা। কীরকম ফাঁকা হয়ে যায়, তাই না! তাই কী ভাবছি জানিস, রামুদাকে বাবা বলব। আমার বাবা। তোরা কী বলিস?
আমরা সবাই হইহই করে বললুম, ‘দুর্দান্ত স্যার, দুর্দান্ত। আমরা ফেস্টিভ্যাল করব।’
‘একদম না। চুপিচুপি। শোন, আমার খুব ভাবনা হয়েছে।’
‘কী ভাবনা স্যার? কেরোসিন তেল? প্রকাশের বাবার ডিপো আছে।’
‘ধুর, ওসব না। ও নিয়ে আমি ভাবি না। কত কিছুই তো থাকে না, থাকবে না। মানিয়ে নিয়ে চলাটাই জীবন। এই দ্যাখ না, রাজার মুকুট আছে, সিংহাসন আছে কিন্তু ঝালমুড়ি নেই, তোরা নেই। ছাড়, ওসব কথা ছাড়। এখন বল, ওর নাম ভূতনাথ, ভূতনাথ। ভূতনাথ ভট্টাচার্য বাপস। এইরকম একটা নাম ঘাড়ে নিয়ে বেশিদূর যাওয়া যাবে? দু-বছর পরেই কলেজ। ভুতো, ভুতো করে শেষকালে কলেজ ছাড়া করবে। নামটা কে রেখেছিলেন রে!’
ভুতো বললে, ‘আমার দাদু। শিবের ভক্ত।’
‘তাঁর আর কী? তিনি নাম রেখেই খালাস। তোর এই নামটা ভালো লাগে?’
‘অভ্যেস হয়ে গেছে স্যার। ভুতো বললেই চনমন করে উঠি। খিদে পেয়ে যায়।’
‘খিদে পায়? সে কীরে বাবা! ওর নাম শঙ্খচূড়। তবু শুরুতে ওর শঙ্খ আছে, তোর তো শুরুতেই ভূত!’
‘শুরুতে ভূত থাকলেও আমি ভূত নই। আমি ভূতদের নাথ, মহাদেব। আমার আলাদা একটা প্রেস্টিজ। শঙ্খচূড় তো একটা সাপ।’
‘আমার নামটাও বাজে—বিশ্ববন্ধু। আমি কার বন্ধু? কারুর বন্ধু নই! চরিত্রের সঙ্গে নামের মিল নেই। তুই এফিডেবিট করে নামটা পালটে নিবি নাকি?
‘না স্যার। এ বেশ আছে।’
হাতে হাতে ঝালমুড়ি। আমাদের সঙ্গে কে বসে আছেন? আমাদের হেডস্যার। এ কেউ ভাবতে পারবে? কখনও না। হেডস্যার বললেন, ‘তোদের নিয়ে এই গঙ্গার ধারে কেন বসি জানিস! অক্সিজেন। মাথাটা খুলবে। সামনের দুটো বছর খুব খাটতে হবে। তারপর এক-একটা পথ ধরে এগোতে হবে। চূড়ায় উঠতে হবে। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার কুবেরের ভাণ্ডারকে ছাপিয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষ কী কাণ্ডটাই না করছে।’
