আমি শেষে ধমকে উঠলুম-অত হাসির কী আছে?
—আরে ম্যান, হাসির জন্যই তো আমার সার্কাসে সার্ভিস। কত রকমের হাসি আছে জানো?
—না। আগে আমি খুব হাসতুম। এখন আর হাসি না। হাসলেই মার খেতে হয়।
—এই দেখো। আমি হাসলেই পয়সা! আর তুমি হাসলেই প্রহার। আরে ম্যান, হাসতে জানতে হয়। আমি হাসলে লোক খুশি হয়; আর তুমি হাসলেই লোকে রেগে যায়। এই হল তফাত। কত রকমের হাসি আছে জানো?
—না, জানা নেই।
—কী করে জানবে? আমি আজ বিশ বছর ধরে প্র্যাকটিস করছি। কাঁদতে কাঁদতে হাসতে পারলে কান্নাটা আরও করুণ হয়। ব্যাপার এত সোজা নয় বুঝেছ মাস্টার। প্রথমে কিছুতেই হচ্ছিল না। কম চেষ্টা করেছি! চাকরিটাই শেষে চলে যাচ্ছিল। তারপর তারপর…হঠাৎ পিককদা থেমে। গেলেন। হাতে রইল আরশি। আকাশের দিকে চোখ তুলে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন, তারপর দম ফাটানো হাসি হাসতে হাসতে হাপুস কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! এমন ঘটনাও যে ঘটানো যায়! হাসি কান্না থামিয়ে পিককদা বললেন, আমার মেয়েটাই আমাকে এই শক্ত কাজটা শিখিয়ে গেছে।
—কোথায় গেল লম্বুদা আপনার মেয়ে?
কোনও উত্তর নেই। উদাস চোখে আকাশ দেখলেন। তারপর চোখ নামিয়ে বললেন,—অনেক দূরে চলে গেছে ভাই, যেখানে গেলে আর কেউ ফিরে আসতে পারে না। লম্বুদা ব্যাগ হাতড়ে একটা আধপোড়া বিড়ি বের করে দেশলাই খুঁজতে লাগলেন। অনেক খুঁজেও দেশলাই বেরুল না। বিড়িটা ঠোঁট থেকে খুলে আবার ব্যাগে ফেলে দিলেন।
—দেশলাই আনব লম্বুদা?
—না রে না। অত কষ্ট আর তোকে করতে হবে না। বিড়ি খেলেও হয়, না খেলেও হয়।
একমুখ হেসে লম্বুদা বললেন, আমার মেয়ে বছর এগারো আমার কাছে ছিল। বুঝলে মাস্টার। ফুটফুটে মেয়ে। একমাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। হঠাৎ কোথা থেকে এল জ্বর। ছাড়ে না। কিছুতেই ছাড়ে না। ছোট ডাক্তার বড় ডাক্তার সবাই এল। জমানো যে ক’টা টাকা ছিল সব গেল।
এদিকে সার্কাস চলে গেছে মাদ্রাজে। আমি দলছাড়া। মেয়েকে কার কাছে রেখে যাব?
—কেন মা’র কাছে?
—আরে ম্যান, মেয়ের মাকে পাব কোথায়? সে তো আগেই সরে পড়েছে। কত বড় ষড়যন্ত্র দেখো। আমার ঘাড়ে মেয়ের ভার দিয়ে, তিনি বেমালুম চলে গেলেন। যাবার আগে বলে গেলেন, রুমকি রইল তুমি দেখো। কী রকম স্বার্থপর একবার ভেবে দেখো, সার্কাসে না গেলে টাকা আসবে কোথা থেকে! আবার টাকা দেখতে গেলে মেয়ে থাকে কার কাছে! অবস্থাটা একবার ভাববা! যা ছিল একে একে সব বেচতে লাগলুম। একবেলা খাই, কোনওদিন খাই না। চিকিৎসা চলছে। কিন্তু এমন একগুয়ে কিছুতেই কি যেতে চায়!
শেষে ধরা পড়ল লিভারে কী যেন হয়েছে। হাতে আর তখন কিছু নেই। বেচার মতোও কিছু নেই, আছে শুধু মেয়ের গলায় একটা চিকচিকে সোনার হার। ওটাই শেষ ভরসা। কিন্তু হারটা নেব কী করে! ঠিক করলুম, চুরি করব। যেই ঘুমিয়ে পড়বে আস্তে আস্তে খুলে নেব। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। মেয়ে তো মড়ার মতো সারাদিনই বিছানায় পড়ে থাকে। সন্ধ্যার দিকে ধুমজ্বরে একেবারে বেহুঁশ। আস্তে আস্তে গলা থেকে হারটাকে সরিয়ে নিলুম। তারপর দরজায় তালা দিয়ে বেরুলুম বিক্রির চেষ্টায়। ঘণ্টাখানেক বাদে ফিরে এলুম একেবারে ডাক্তার সঙ্গে নিয়ে। পাড়ার সবচেয়ে বড় ডাক্তারদুশো টাকা যার ফি। দরজার তালা খুলে ঘরে পা দিয়েই দেখি মেঝেতে জল থইথই করছে। জলের কলসিটা কাত হয়ে পড়ে আছে, আর সেই জল থইথই মেঝেতে কলসির কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে রুমকি! বোধহয় জল তেষ্টা পেয়েছিল, কোনওরকমে উঠে এসেছিল কলসিটার কাছে। জল কি খেতে পেরেছিল! তোমার কী মনে হয় ম্যান? আমি আর কী বলব! চুপ করে রইলুম। লম্বুদা বললেন, বোধহয় খেতে পারেনি ম্যান! গেলাসটা ছিল বাইরে। ডাক্তার আর ঘরে ঢুকলেন না, সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে ফি-র টাকা গুনে নিয়ে সরে পড়লেন। যতই হোক বড় ডাক্তার তো! ঘরের চৌকাঠে আর পা দিতে হল না। জ্বর ছেড়ে গেল। অত দিনের জ্বর। রুমকির গা একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা। তারপর থেকেই না, আমি হাসতে গেলেই খুব সহজেই কেঁদে ফেলি।
পিককদা তাঁর সেই রংচটা অদ্ভুত কিড ব্যাগে দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম ভরে ফেলে রক থেকে উঠে পড়লেন।
—কোথায় যাবেন এখন?
—দেখি কোথায় যাওয়া যায়!
একটা পা ফাইলেরিয়ায় মস্ত হয়ে ফুলে উঠেছে। সেই পা-টাকে অতি কষ্টে টানতে টানতে পিকক লম্বু পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
জ্ঞান দিতে দিতে অজ্ঞান
মানুষ মানুষকে জ্ঞান দিতে দিতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। একসময় এইরকম ছিল, মানুষ বলতে পারত, যাক বাবা, হাঁপ ছেড়ে বাঁচা গেল, কিছুক্ষণের জন্যে শান্তি!
শান্তি কেন বউদি?
অফিসে চলে গেল। সন্ধে সাতটা পর্যন্ত শান্তি। এখন যত পারুক জ্ঞান দিক। এটা সেকেলে কথা। সমস্ত মানব-প্রাণী এখন স্যাটেলাইট-এর আঁটোসাঁটো বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াজড়ি অবস্থা। উলজড়ানো পমেরিয়ান। লোমওয়ালা দুষ্টুমিষ্টি কুকুর। সেকালের মিসিবাবাদের পাস টাইম ছিল, উল আর কাঁটা। নাকের ডগায় ন্যাজাল চশমা। মাথায় ফিরিঙ্গি খোঁপা। বাকেট চেয়ারে গাউন পরে বসে আছেন। পায়ের কাছে উলের গোলা। হাতে জোড়া কাঁটা। আদুরে। কুকুর উলের গোলা নিয়ে খেলছে। উলটে-পালটে, ডিগবাজি খেয়ে, মুখে নিয়ে ছুটছে এ-কোণে, ও-কোণে। শেষকালে জড়াজড়ি। কসমিক তরঙ্গে জড়িয়ে গেছি আমরা। দূরে কিন্তু কাছে। বুক পকেটে জগৎ। প্রত্যেককেই দেওয়া আছে লং-রোপ। ছিপের মাছ। লাটাইয়ের ঘুড়ি।
