পরের সপ্তাহে ধর্মসভায় গিয়ে দেখি দেয়ালে ঝুলছে বড় বড় অক্ষরের নোটিশ-জুতো চোর। হইতে সাবধান। নোটিশটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দেখি আরও একজন থমকে। দাঁড়িয়েছেন। আমি তাঁর পায়ের দিকে তাকালুম। আমার মতোই চালাক। আমার পায়েও সরোজের জুতো জোড়া নেই। অন্য জুতো।
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানেও জুতোচোর, আশ্চর্য!
আমি হাসলুম। মনে মনে বললুম, যেমন আপনি আর আমি।
আজ আমি ভীষণ চালাক। একটা সাইড-ব্যাগ এনেছি। জুতো জোড়া ব্যাগে ভরে আসরে গিয়ে বসলুম। শরৎচন্দ্র যেমন বলেছিলেন—আজ আমি অজুতো-বল। নিজের আত্মা নিজেরই ব্যাগে।
জোকার
তার বাপ-মা’র দেওয়া কী নাম ছিল জানি না। তাকে আমরা চিনতুম—পিকক লম্বু বলে। ডাকতুম কখনও পিককদা বলে, কখনও লম্বুদা বলে। পাকানো কঞ্চির মতো লম্বা চেহারা, গায়ের রং। রোদে পুড়ে তামাটে। বুক-খোলা টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে দেখা যেত বুকের উপর ঝুলছে অদ্ভুত একটা লকেট। বয়স কত হবে বলা শক্ত। তিরিশও হতে পারে, আবার চল্লিশ হওয়াও অসম্ভব নয়। আসলে এইরকম চেহারার লোকেদের বয়স বলা যায় না।
পিকক লম্বু কোন দেশের মানুষ, তাও বলতে পারব না। তবে বাংলা বেশ চমৎকার বলেন। তাঁর আবির্ভাব হঠাৎ-ই। প্রথমে আমরা লক্ষই করিনি। কিন্তু তাঁর ওপর নজর না দিয়ে আর উপায় ছিল না। প্রথমত, এমন চেহারার মানুষ দেখা যায় না বড় একটা। দ্বিতীয়ত, তাঁর দাড়ি কামানোর ঘটা আর সাজ-সরঞ্জামের বহর।
পথের পাশে একটা রকের উপর বেশ আয়েশ করে বসেছেন। পাশে একটা জরাজীর্ণ কিড ব্যাগ। ছোট্ট একটা তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জল। হাতে ধরা আরশির একটা ভাঙা টুকরো। দাড়ি কামানোর বুরুশটারও অদ্ভুত ছিরি। টাক পড়ে তার চুল আর অবশিষ্ট কিছু নেই। একটা কেলে হাতলে কয়েক গোছা কোনওরকমে সান্ত্বনার মতো আটকে আছে। সাবান, কাপড় কাচার সাবানের একটা টুকরো।
বৃষ্টি পড়ছিল বলে বাড়ি থেকে বেরুতে পারছিলুম না। সকালবেলাতেই আকাশ ঘনঘটা করে নেমেছে। কখন থামবে কে জানে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে গিয়েই নজর আটকে গেল। বৃষ্টির গুঁড়ি গুঁড়ি ছাটে শরীর ভিজে যাচ্ছে, তবু দাড়ি কামাবার কী কসরত, এক হাতে আরশির টুকরোটা মুখের কাছে ধরে অন্য হাতে দাড়িতে ব্লেডের টান। ব্লেডে বোধ হয় তেমন ধারও নেই। মাঝে মাঝে আরশিটাকে হাঁটুতে ধরে রাখার চেষ্টা, যাতে দুটো হাত দিয়েই দাড়ির সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়। মাঝে মাঝে করুণ দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকানো। কার্নিশের জল পড়ছে বড় বড় ফোঁটায়। লটবহর টেনেটুনে একটু শুকনো জায়গার চেষ্টায় সরে গিয়েও তেমন সুবিধে হচ্ছে না। বৃষ্টির তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে তখন। চারদিক থেকে জলের বিন্দু তেড়ে আসছে। দু-একবার চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিতে হল। কিন্তু দাড়ি কামানো বন্ধ হল না।
ঘণ্টাকয়েক বৃষ্টি হল আর সেই দু-ঘণ্টা ধরে নাগাড়ে গালে ব্লেড ঘষে গেলেন ভদ্রলোক। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অবাক মনে হল। এ মানুষ তো খুব সাধারণ মানুষ নন। গালের চামড়াও বলতে হবে খুব সাংঘাতিক, যে গাল এতক্ষণ ব্লেডের ঘষা সহ্য করতে পারে! প্রথম দিনে আলাপ হল না। বৃষ্টি থামার সঙ্গে সঙ্গেই আমার বন্দিদশা ঘুচে গেল। এর পর তিনি কতক্ষণ রকে ছিলেন খেয়াল করিনি। প্রথম দিনেই কিন্তু একটা কৌতূহল জাগিয়ে ভদ্রলোক কখন এক সময়। চলে গেলেন।
পরের রবিবারে সেই একই দৃশ্য। সেই ভাঙা আরশি, তোবড়ানো বাটি, চুল ওঠা বুরুশ, কাপড় কাচা সাবানের টুকরো। দাড়ি কামানো শুরু হয়ে গেছে। ঠিক করে ফেললুম, চরিত্রটাকে আজ। একটু নাড়াচাড়া করে দেখতেই হবে। সাহস করে কাছে এগিয়ে গেলুম। কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই। টুকরো আরশিতে মুখ ধরার কৌশলে এত ব্যস্ত, যে নাকের ডগায় একটা ছেলে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে সে খেয়ালই নেই। বাধ্য হয়ে আমাকেই প্রশ্ন করতে হল—আপনি কে? মুখটাকে ছুঁচোর। মতো করে দাড়িতে ব্লেড টানছিলেন, হাত থেমে গেল, পালটা প্রশ্ন এল—তুমি কে?
প্রথমে একটু থতমতো খেয়ে গিয়েছিলুম, তারপর যেন বেশ মজা লাগল। উত্তর দিলাম, আমি অপূর্ব।
—আমি পিকক লম্বু।
ভীষণ অবাক হয়ে গেলুম, এ আবার কী নাম!
—পিকক লম্বুটা কী?
—নাম।
—নাম তো বুঝলাম, এটা কী ধরনের নাম! কে রেখেছে এমন নাম?
—এ এক ধরনের নাম। রেখেছে মাস্টার।
—কোন মাস্টার?
—রিং মাস্টার।
—রিং মাস্টার আবার কী? ইতিহাসের মাস্টার, ভূগোলের মাস্টার, অঙ্কর মাস্টার শুনেছি, রিং মাস্টারটা কী?
কথার সঙ্গে হাত ঠিকই চলেছে, এক মুহূর্তও দাড়ি কামানো বন্ধ হয়নি। গালে একটু জল লাগিয়ে বললেন, কিছু জানো না দেখছি! রিং মাস্টারই তো পৃথিবীর আসল মাস্টার। সার্কাস দেখেছ কখনও?
—একবার। তাও অনেক আগে।
—হুঁ, তাই জানো না। রিং মাস্টার সার্কাসে বাঘের খেলা, সিংহের খেলা দেখায়। বুঝেছ?
—আপনি বুঝি সার্কাসে ছিলেন?
—ছিলেন কী! এখনও আছি।
—কোন সার্কাস? কী নাম আপনাদের সার্কাসের?
—ওয়ার্ল্ড সার্কাস।
—কোথায় কোথায় খেলা দেখান?
—সারা পৃথিবীতে।
শেষ কথাটি বলে, পিকক লম্বু আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন। মুখে অদ্ভুত একটা হাসি। জড়ানো। এবং সেই হাসি-জড়ানো মুখেই বললেন,—ওই আকাশ আমার সার্কাসের তাঁবুর চাল, ওখানেই চলে ট্রাপিজের খেলা আর এই সার্কাসের এরেন, এইখানে হয় জমির খেলা। কথা শেষ করেই ছেলেমানুষের মতো খিলখিল করে হেসে উঠলেন। হাসি যেন আর থামতেই চায় না।
