সংসার একটা নেশা। চিনেপাড়ার ওপিয়াম ডেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলে দৃশ্যটা এইরকম, গুহার মতো একটা জায়গা, ভেতরটা ধোঁয়া ধোঁয়া। আলোটা নেশায় লাল। কেউ শুয়ে, কেউ বসে, কেউ আধশোয়া, মেয়েরা নেচে নেচে ঘুরছে। অস্ফুট গুঞ্জন, জড়িত কণ্ঠ, শিথিল হাতে বিচলিত কোনও সুন্দরীর পোশাকের প্রান্ত আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। কেউ বুকে হেঁটে এগিয়ে চলেছে যেখানে নীল কাচের পাত্রে রয়েছে লাল চেরি। যে একেবারে বেহুশ তার সর্বস্ব হরণ করে নিচ্ছে নেশামণ্ডলের অধিকারী। যে স্বেচ্ছায় ঢুকছে, সে আর বেরোতে পারছে না। একটু একটু করে চুর হতে হতে বঁদ। মিষ্টি ঘণ্টাধ্বনি, সিল্কের খসখস শব্দ, মশলার গন্ধ, শালুকের কাণ্ডের মতো ললিত হাতের ছোবল, ঝিনুকের কপালে ভোরের সূর্য, গোলাপি অন্ধকারে খইয়ের মতো জোনাকির। আলো। সাদা রেশম ঢাকা একজোড়া বাতাবি, মাঝে পিঁপড়ের পায়ে হাঁটার পথ। শিলাজতুর পিচ্ছিলতা। মিহি বৃষ্টির মতো আসক্তি। যন্ত্রণা, চাপা আর্তনাদ, ফাঁদে পড়া পশুর অসহায়তা। নেশার গলায় কেউ বললে, ‘বহুত আনন্দ’। সঙ্গে সঙ্গে সেই গহ্বরে সবাই গুঞ্জন করে উঠল, ‘আনন্দ, আনন্দ’। কেউ বললে, ‘বড় যন্ত্রণা’। সঙ্গে সঙ্গে গুঞ্জন, যন্ত্রণা। কেউ তেড়েফুঁড়ে উঠল, ‘মুক্তি, মুক্তি’। অধিকারীর নিষ্ঠুর গলা, মুক্তি। ভোরের আগে মুক্তি নেই। গুহার বাইরে বিবেকের গান শোনা যাবে,
লোভ মোহ আদি পথে দস্যুগণ, পথিকের করে সর্বস্ব মোষণ,
পরম যতনে রাখ রে প্রহরী, শম দম দুই জনে।
সাধুসঙ্গ নামে আছে পান্থ-ধাম, শ্রান্ত হলে তথায় করিবে বিশ্রাম,
পথভ্রান্ত হলে শুধাইবে পথ, সে পান্থ-নিবাসীগণে।
যদি দেখ পথে ভয়ের আকার, প্রাণপণে দিও দোহাই রাজার,
সে পথে রাজার প্রবল প্রতাপ, শমন ডরে যাঁর শাসনে।
শোনা গেলে কী হবে! জীবন-আফিমের নেশা বড় ভয়ংকর। একবার ধরে গেলে আর তো ছাড়া যায় না। চোরাবালির মতো ক্রমে ক্রমে গ্রাস করে। প্রেম, বিরহ, মূৰ্ছা। উৎসবের রাত তার যাবতীয় আড়ম্বরের চকমকি খসিয়ে সাধারণ রাত হয়ে গেল। হাতা-খুন্তি, চটের ব্যাগের জীবন। হিসেবের খাতা। আয়ের ঘরে একটা লাইন তো ব্যয়ের ঘরে একশোটা।
তবে ভার্যা যদি মনোরমা হয় তাহলে অভাবেও কত ভাব!
কিছু পয়সা সঞ্চয় করে সেই পুরীতে বেড়াতে যাওয়া। ঢেউ ভেঙে ভেঙে পড়ছে। সুইস সুইস শব্দ। ফ্যানার বুজবুজি। পায়ের দিকের শাড়িটা সামান্য উপর দিকে টেনে তুলে তনুশ্রী ভাঙা ঢেউ মাড়িয়ে হাঁটছে, ছুটছে, লাফাচ্ছে। বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে। এলো খোঁপা লুটোপুটি খাচ্ছে। চওড়া পিঠে। নীল আর সবুজের মহাখেলা।
কে আমি?
আমি তখন রাজকুমার। কোন প্রতিষ্ঠানের দাস নেই! দু-পাশে হাত ঝুলিয়ে ন্যালাখ্যাবলার মতো দিনে অন্তত একবার বড়কর্তার টেবিলের সামনে করুণ মুখে দাঁড়াতে হয় না কি আমাকে! সেই বড় দাস এই ছোট দাসটিকে উন্মোচন করে বড়ই আনন্দ পেয়ে থাকেন! আত্মসম্মানের আলখাল্লাটিকে ছিঁড়ে ফেলে তিনি বাক্যের লিঙ্গ দিয়ে ধর্ষণ করেন। সামনের চেয়ারে বসার অধিকার নেই। মানুষ হলেও সবাই তো মানুষ নয়। কত টাকার মানুষ তুমি? হাতিবাগানের হাটের জামা, না টিকিট লাগানো বড় দোকানের দামি জামা! তুমি কার্পেট না পাপোশ? তোমার মতো ইডিয়েট তো আমি দুটো দেখিনি! পয়সা খরচ করে লেখাপড়া শিখেছিলেন, না চালকলা দিয়ে! এটা কী হয়েছে? এটা কী? হোয়াট এ মেস! এটা তোমার বাপের আপিস! গুপ্তকে তুমি অর্ডারটা ইস্যু করলে কার হুকুমে!
—আজ্ঞে, আপনিই তো স্যার সই করেছিলেন!
শাট আপ ইউ ফুল! নৃপেনবাবু ধরিয়ে না দিলে আমি ধরতেই পারতুম না!
কী ধরালেন স্যার! গুপ্তরটাই তো লোয়েস্ট রেট!
নো, নো স্যার। লোয়েস্ট ব্যানার্জির। গুপ্তরা প্যাকিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং এক্সক্লডেড। ব্যানার্জিরটা ইনকুডেড। সেই যোগটা কে করবে! আমি না, না আমার বাবা! রেজাল্ট! কোম্পানির এক লাখ টাকা গচ্চা। এই টাকাটা কে দেবে! ইয়োর ফাদার। শুনেছি, তুমি নাকি কাজ করতে করতে গুনগুন করে গান গাও! এত ফুর্তি কীসের!
স্যার! এবারের মতো মাপ করে দিন! আমি এতটা খেয়াল করিনি স্যার।
যাও। এখন গুপ্তর হাতে পায়ে ধরে অর্ডারটা উইথড্র করে আনো।
সেটা কী সম্ভব স্যার! একবার ইস্যু করা হয়ে গেছে।
সম্ভব কী অসম্ভব সে তো জানি না। কত টাকা খেয়েছিলে! ভমিট ইট আউট। হয় এক লাখ টাকা পে করো, আর না হলে উইথড্র করে আনো।
আপনি আমাকে বাঁচান স্যার। সবে বিয়ে করেছি।
কে বলেছিলেন, সেই শ্রীকৃষ্ণ নাকি উপনিষদ! তুমি যে-সে নও। তোমার ভেতরে আছে। লিঙ্গশরীর। অর্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ, জ্যোতির্ময় এক লাইটার। তার মধ্যে আছে তরল গ্যাস। স্পিরিট। চৈতন্যের চাকা লাগানো। বুড়ো আঙুল দিয়ে খটাং করলেই আত্মার আলোয় উদ্ভাসিত। বাক্যের
অস্ত্র তোমাকে বিদ্ধ করতে পারবে না। নিতম্বে বাক্যের পদাঘাত তোমাকে ভূপতিত করতে পারবে না। চাকরি চৌপাট হলেও অনাহারে ভেটকে যাবে না। তুমি বুষ্টু হলেও ব্রহ্ম। তুমি জন্মেছ। নাকি! যে মৃত্যুর কথা ভাবছ।
অর্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ আত্মার স্বর্গীয় লাইটার বড়বাবুর পায়ের কাছে পড়ে আর্তনাদ করছে, বাঁচান স্যার, আমাকে বাঁচান। গুরু কৃপায় ঈশ্বর কৃপা নয়, আপনার কৃপা চাই।—ওটা যদি না পারো, তাহলে এইটা তো পারবে, ব্যানার্জিকে গিয়ে বলল, ইনফ্লুডেড-এর বদলে এক্সকুডেড লিখিয়ে এনে ফাইলে ঢোকাও।
