তোমরা নোংরামি করছ বলে। মাস্টারমশাইয়ের কাছে ছাত্ররা গিয়ে কী শিখবে? বৃন্দাবন লীলা। বিশাল একটা রবারের পুতুলের মতো লোকটা হেলেদুলে চলে গেল। আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। আর ঠিক সেইসময় কৈলাস এসে পড়ল সাইকেলে চেপে। কৈলাস দাদার। কারখানায় যাচ্ছে খাবার পৌঁছে দিতে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে টিফিন ক্যারিয়ার ঝুলছে। রাস্তায় পা রেখে দাঁড়িয়েছে। কী হল, এমন গরুচোরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস!
বজ্ৰবাঁটুল যা-তা বলে গেল, তনু আমাদের বাড়িতে আছে বলে। খারাপ খারাপ কথা।
তুই কী বললি?
কিছুই তেমন বলতে পারলুম না।
তুই বেটা ছোটলোকের মতো ভদ্রলোক। ঠাস করে একটা চড় মারতে পারলি না! তনু তোদের বাড়িতে আছে তো ওর বাবার কী? ব্যাটা রক্ষেকালীর বাচ্চা। তুই এবার থেকে রোজ বিকেলবেলা তনুর হাত ধরে বেড়াতে বেরোবি। ওই মদনা ব্যাটার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে খুব হ্যা হ্যা, হা হা। করবি। হিন্দি গান গাইবি। এই মাঘেই তোর সঙ্গে তনুর বিয়ে দেব। আমার খুব কষ্ট হবে ঠিকই। বুক ফেটে ভেঙে যায় মা; কারণ তনুর তরীতে আমিই ভাসব ভেবেছিলুম।
তনু আমার মতো বেকারকে বিয়ে করবে কেন?
ওর বাপ করবে। তনু তোকে ভালোবাসে।
তনু আমাকে নয় আমার বাবাকে ভালোবাসে।
মাস্টারমশাইকে একভাবে ভালোবাসে। তোকে আর এক ভাবে। সময় পেলে কথামৃত পড়বি। সেখানে ঠাকুর একটা সুন্দর কথা বলেছেন। একই বিছানা। ডানপাশে স্বামী, বাঁ-পাশে ছেলে। ছেলেকে আদর করার সময় এক ভাব। স্বামীকে আদর করার সময় আর এক ভাব। তুই একটা চিরকালের বোকা, কিছুই বুঝতে পারিস না। দুটো ভালোবাসার টানে তনু সংসার থেকে ছিটকে এসেছে।
অতীতের স্মৃতি হল গর্তের সাপ। মাঝে-মধ্যে হিল হিল করে বেরিয়ে আসে। সে আবার ময়াল সাপ। শরীরে চাকা চাকা গোল গোল বর্ণবাহার হল এক-একটা উজ্জ্বল ঘটনা। বিয়েটা মাঘেই হল। যেমন হয় বোকা বোকা সাজ। গরদের পাঞ্জাবি। কোঁচানো, চুনট করা ধুতি। পায়ে নিউকাট। মিনমিনে পালিশ। মামাতো বোন সুধা লবঙ্গ দিয়ে মুখে চন্দনের ফোঁটা মেরেছে। চন্দনে পাঞ্চ করা ছিল তিলক মাটি। জেল্লাটা ভালোই খুলেছিল বোকা বোকা মুখে। কৈলাস সেজেছিল কর্তাব্যক্তির মতো। মালকোঁচা মারা ধুতি, হাফ হাতা শার্ট। আমার চেয়ে তার আনন্দ বেশি। মাঝ সমুদ্রের ভাসমান জাহাজকে বন্দরে ভিড়িয়েছে কাপ্তেন কৈলাস। বউভাতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল বজ্ৰবাঁটুলকে। লোকটা মহাপাজি। চলে যাওয়ার সময় চ্যাকোর চ্যাকোর পান চিবোতে চিবোতে বলে গেল, ধন্যবাদটা আমাকেই দিও হে ছোকরা। বিয়েটা আমিই এগিয়ে দিলুম। ব্যাপারটা তা হলে জট পাকিয়ে যেত।
সংসারের প্রবেশপথটা খুব সুন্দর। খিলান, মেহগনি কাঠের পালিশ করা দরজা, মাথার ওপর পোঁ ধরেছে সানাই। জুই-রজনীগন্ধ ছড়াচ্ছে। অভাব, অভিযোগ, দুঃখ কষ্ট সব বেনারসি চাপা। শাশুড়ির গয়নায় সেজে ও বাড়ির বউ এসেছে এ বাড়ির নিমন্ত্রণে। এক রাতের জন্য ভেতরের দৃশ্যটা আরব্য রজনীর মতো। হলুদ-লাল আলোর ছায়া। ভেলভেটের আদিম ঝালরে মিহি চিনির মতো আলোর গুঁড়ি। আমির, ওমরাহ, বাদশা, বেগমদের জমায়েত। শান্তিদি ভাঙা গালে পাউডার ঘষেছে। চোখে কাজল। বিশ বছর আগে ফেলে আসা যৌবন থেকে নজর ধার করে মোহময়ী। হয়ে আমাকে ফিশফিশ করে বলছে, কী করতে হয় জানিস তো! না, আড়ালে আয় বলে দিচ্ছি।
শান্তিদি আমার হাতটা চেপে ধরল। মাঝের আঙুলে একটা তামার রিং, তার পাশের আঙুল একটা সিসের রিং। হাতের তালুটা খুব গরম। লম্বা লম্বা, সরু সরু আঙুল। বেশ লম্বা। ছিপছিপে শরীর। আমাকে টানতে টানতে একেবারে ভাঁড়ার ঘরে। ঘরে কেউ নেই। সবাই নতুন বউকে সাজাতে ব্যস্ত। শান্তিদি একেবারে আমার বুকের কাছে। আজ খুব যত্ন করে চুল বেঁধেছে। বুকের আঁচল একপাশে সরে গেছে। লাল চকচকে ব্লাউজ।
‘তোকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে বিলু। তোর চেহারাটা আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ মুখটা ধারালো। নাকটা খাড়া। চোখ দুটো বাদাম চেরা। পাতলা তিরতিরে ঠোঁট। এইরকম মুখ আর চেহারার একটা আকর্ষণ আছে। কী করতে চাইছে বোঝার আগেই দু-হাতে গলা জড়িয়ে ধরে শান্তিদি আমার ঠোঁটে বেশ ঘন করে চুমু খেয়েই দূরে সরে গেল। সেই মুহূর্তে আমি কেমন যেন হয়ে গেলুম। সাপ যেন ছোবল মেরে দূরে সরে গেল। শান্তিদি খুব দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলছে। বুকের ওঠানামা। অদ্ভুত একটা গলা করে বলল, তুই সরে যা, আমার সামনে থেকে সরে যা।
বড় বড় গামলায় রসে ভাসছে রসগোল্লা, পান্তুয়া, হলদে হলদে কমলাভোগ। সব যেন ফ্যাল। ফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বোকার মতো পায়ে পায়ে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলুম। নানারকম মশলার গন্ধ। একটা একশো পাওয়ারের আলো। দেয়ালের রং ময়লা। কাঠের একটা টেবিলের ওপর অনেক শালপাতা। কিছু কাঁচা পাঁপড় মেঝেতে ছড়িয়ে আছে।
শান্তিদির জীবনটা ভেঙে গেছে। বড়লোকের মেয়ে ছিল, আদুরে মেয়ে। নামী স্কুলে পড়ত। ভালো নাচত। বাবার ব্যবসা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফুলে-ফেঁপে উঠেছিলেন। শেষের দিকে একের পর এক ব্যাঙ্ক ফেল করতে লাগল। গণেশের পর গণেশ ওলটাচ্ছে। হঠাৎ যুদ্ধ শেষ। দেশ বিভাগ। রায়ট। স্বাধীনতা। শান্তিদির বাবা পাগল হয়ে গেলেন। বিক্রি হয়ে গেল স্টুডিবেকার গাড়ি। একটা বাগান ছিল, বিক্রি হয়ে গেল। লোকজন, পোষ্যরা সব ভেগে গেল। দুটো। অ্যালসেশিয়ান কুকুর ছিল, খেতে না পেয়ে মরে গেল। অনেকেরই উল্লাস ব্যাটা বাঙালি, খুব লপচপানি হয়েছিল। বেলুন এইবার চুপসেছে। শান্তিদির মায়ের নামে নানা কেচ্ছা। প্রশ্নতেই। উত্তর, সংসারটা চলছে কী করে। মেয়েদের তো একটাই ক্যাপিটাল। শান্তিদির লড়াই সেই থেকে শুরু। রাস্তার দিকের দোতলার বারান্দায় শান্তিদির বাবা বসে থাকতেন, আর থেকে থেকে। চিৎকার করতেন চিল চিল ছোঁ মারলে, ছোঁ মারলে। মানুষটাকে কেউ দেখত না। মাঝে মাঝে মারধোর করত। এখনও মনে আছে, শান্তিদির মা আর বড়মামা এমন মেরেছিল, ভদ্রলোকের চওড়া পিঠে লাল লাল, সোঁটা সোঁটা দাগ। রাস্তা দিয়ে যে যাচ্ছে তাকেই দেখাচ্ছেন, এই দেখ এই দেখ আমার পিঠে জমা খরচ। এরপর ইলেকট্রিক শক দিয়ে মেরেই ফেললে। শান্তিদির বিয়ে। হতে হতেও হল না। রটনা, মায়ের জন্যেই হল না। একজন আর্টিস্ট খুব ঝুঁকেছিল। শান্তিদিকে মডেল করে অনেক ছবি এঁকেছিল। পড়তি জমিদারের ছেলে। রোজগার না থাক বাড়ির মেঝে মার্বেল পাথরের। শান্তিদির মাকে আমরা বলতুম, হোয়াইট টাইগ্রেস। যৌবনের পড়ন্ত আলোয় বসে থাকা সেই মহিলাকে আমরা দেখেছি। মেয়েদের সংসার ভেঙে গেলে আর কিছু থাকে না। রূপ আর দেহ হল বিয়েবাড়ির বাইরে ডাস্টবিনের ধারে ছড়িয়ে পড়ে থাকা এঁটো পাতার মতো। কুকুরের দল এসে সারারাত ছেঁড়াঘেঁড়ি করে ভোরে চলে যায়।
