অঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ আত্মপুরুষ এইবার ব্যানার্জির পদতলে। তুমি ব্রহ্মা, তুমি বিষ্ণু, তুমি মহেশ্বর। সখা তুমি, পিতা তুমি। এইবার সে বাড়ি ফিরছে। সম্মানিত, সম্রান্ত, তনুশ্রীর স্বামী। মুখে একটা হাসি ঝুলিয়েছে। টান টান খাড়া। অপমানের কাদা, উপেক্ষা করে উদাসীনতার জলে ধুয়েছে, বগলে একপাউন্ড পাউরুটি। সংস্কৃতিমনস্ক এক যুবক। ময়দানে বঙ্গসংস্কৃতি। দেবব্রত বিশ্বাসের উদাত্ত কণ্ঠে, আকাশ ভরা সূর্য তারা। জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রজয়ন্তী। সিনেমার পর্দায় ফেলিনি, ক্রফো, আইজেনস্টাইন, টেস্ট ক্রিকেটে মার্চেন্ট, ওয়াদেকর, সাহিত্যে কামুকাফকা সার্জ। লাল জামার রাজনীতি, পুঁজিবাদে আগুন লাগাও। শ্রমিক তুমি পার্লামেন্টে হাতুড়ি ঝোলাও। বন্ধুগণ! নেচে ওঠো। বিধান রায়কে চটকে দাও, প্রফুল্ল সেন কলা খাও, অতুল্য ঘোষ নিপাত যাও। গণনাট্য সঙ্রে গান টেবিলে তাল ঠুকে। কাঁধে ব্যাগ ঝোলা ইনটেলেকচ্যুয়াল, ঝুলঝাড়ু মাথা, ক্যালকাটা হ্যান্ডলুম পাঞ্জাবি, জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবি। এইসবের ভেতর দিয়ে উড়তে উড়তে আসছে তনুশ্রীর প্রেমিক। আত্মার ঝাড়লণ্ঠন, সংস্কৃতির সার্চলাইট;না-বোঝা কথার ফুলঝুরি। সুন্দরী স্যুটকেস খুলো না, তাহলে পায়ের ফাঁকে লেজ ঢোকানো একটা নেড়ি কুকুর বেরিয়ে পড়বে। পায়ের ওপর দিয়ে চাকা চলে গেলে কুকুর যেরকম আর্তনাদ করে, সেই রকম আর্তচিৎকার বুকে চাপা আছে। তবু মুখে এক ফালি কাঁচা হাসি। স্ত্রী মনে করছে, সফল, সম্মানিত এক মানুষ সারাদিনের পর ফিরে এল। কর্মই যার ধর্ম। ছেলে আদো-আদো গলায় বলবে, আমি বাবার মতো হব। কনিষ্ঠরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলবে, আশীর্বাদ করুন। কাকে বলছে জানে না। যে জানে সে বসে আছে অন্নদাতা হয়ে। তার চোখে এই লোকটা একটা ইডিয়েট ভৃত্য। প্রতিটি টাকায় সেই কথা লেখা আছে। এই জামার ডিজাইন সেই গালাগাল, এই উদরের অন্ন সেই গালাগাল। এমনকি রাতে, যখন সে স্ত্রীকে বুকে নিয়ে শুয়ে আছে তখন সেই মশারির চালে ওই কাঁচ্ছি:টা সেনগুপ্ত সায়েবের মুখ। কুতকুতে চোখ, ঘোঁতঘোঁত গলা, আবার বিয়ে করা হয়েছে! প্রেম! ছেলে হবে, মেয়ে হবে। লেখাপড়া, দুধ, মাছ, জামাকাপড়, পেনসিল, খাতা, শীতের চিড়িয়াখানা, হাজার টাকার পচপানি, গেঁড়িগুগলির সংসার! সব আমার হাতে। মুহূর্তে ফিউজ করে দিতে পারি। জমিদারবাড়ির বাগানের একপাশে, নর্দমার ধার ঘেঁষে চাকরবাকরের ঘর। জমিদারবাবুর চোখে কর্তাটি শুয়োরের বাচ্চা। সারাদিন খিদমত খাটে। অনেক রাতে দু-ঢোক খেয়ে রামুর মার পাশে ধাড়ি একটা শূকরের মতোই শুয়ে পড়ে। অদৃশ্য লম্বা একটা জিভ বের করে ক্ষতস্থান লেহন করে। বাপের বেটা রামু শামুকে জড়িয়ে চটের বিছানায় শুয়ে আছে। বারোমাসই সর্দি, টনসিল, আমাশা, চোখের ঘা।
রামুর মায়ের পেটে আর একটা ঘাই মারছে। রামুর বাবা মানুষের কথা শুনেছে, মানুষ ঠিক কী জিনিস তা জানে না। এইটুকু জানে, এক ধরনের মানুষ আর এক ধরনের মানুষকে জুতো মেরে টাকা দেয়। ভয় দেখায়। একমাত্র নিজেকেই মানুষের মতো মানুষ ভাবে, বাকি সব ছাগল। অনেক বই পড়ে, বক্তৃতা দেয়, ভোটে দাঁড়ায়, বিরাট ঠাকুরঘরে বসে পুজো করে আর অন্য। মানুষের মাথা চিবিয়ে খায়। পৃথিবীটাকে এরা নিজেদের মধ্যে বেশ ভাগ করে নিয়েছে। বাকি সবাই নর্দমার ধারে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে শূকরের পাল।
পুরীতে গিয়ে সাতদিনের জন্যে এইসব কথা ভোলা গিয়েছিল। অফিসের সেই হলদে বাড়িটা নেই। ছাঁটাগোঁফ সেনগুপ্ত নেই। তাকে ঘিরে মোসায়েবদের সংকীর্তন পার্টি নেই, মনুমেন্টের তলায় মানবশঙ্খল উন্মোচনের গণসংগীত নেই, সেইসব ম্যাগাজিন নেই যার পাতায় পাতায়। সমাজতত্ব, রাষ্ট্রতত্ব, ধর্মতত্ব, বিত্ততত্ব, পৃথিবীর নতুন মডেলের কথা, কাঁড়ি কাঁড়ি উপদেশ, রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ, বাংলার নবজাগরণের প্রলয়কাণ্ড। সেই বাঙালি। যারা সায়েবের
জুতোর ফিতে বাঁধত, আবার বুকে হাত রেখে বীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলত, আমাদের বিবেকানন্দ। সভার প্রধান অতিথি বাঁধানো দাঁত খুলে যাওয়ার ভয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলতেন, আমাদের রবীন্দ্রনাথ, শুধু বাংলার নয়, ভারতের নয়, এশিয়ার নয়, ইউরোপের নয়, সারা বিশ্বের। তিনিই আমাদের শোনালেন মহামন্ত্র। মানুষ মানুষ মানুষ, মানুষকে ভালোবাসো, আমাদের সমস্ত সংকীর্ণতায় জ্বেলে দিলেন মশালে আগুন। আমরা উড়ে গেলুম, পুড়ে গেলুম, তাই তো শুধাই, পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ এ কী সন্ন্যাসী!
না, পুরীর সাতটা দিনের স্মৃতিতে এর কিছুই ছিল না। এই বিশাল বালুকাবেলা আমাদের, সমুদ্রমহান আমাদের, সব ঢেউ সব ফেনা, রংবেরং-এর ঝিনুক যত কুড়োতে পেরেছি, আকাশের যতটা নিতে পারা যায়, সূর্যোদয় আমাদের, সূর্য্যাস্ত আমাদের, রাতের তারা, ঢেউয়ের শব্দ। এর কোনও ঠিকানাতেই এমন কোনও লোক বসেছিল না, যে বলতে পারত অ্যায়! ইধার আও! তোমার ভ্যালুয়েশন সাড়ে সাতশো টাকা। সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্র দেখার অধিকার তোমার নেই। তুমি কি এক গেলাস ফলের রস খেয়ে প্রাতভ্রমণে যাও! ক্লোজড ডোর মিটিং-এ তুমি কি কোনও কোম্পানির ভাগ্য নির্ধারণের অংশীদার? তোমার কি এক কেজি মাংসখেকো হুমদো। কুকুর আছে? তোমার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলে কেউ স্যার বলে? একটা মানুষকে টোস কিংবা রোস্ট করার ক্ষমতা কি তোমার আছে? যাও, সমুদ্র নয়, নর্দমা দেখ গে যাও।
