মন এমন বেয়াড়া জিনিস, নিজের ভাবনায় নিজেকেই ঘাবড়ে যেতে হয়। একবার মনে হল, তনুকে শেষে মা বলতে হবে নাকি! এত প্রশংসা, এমন বিমোহিত অবস্থা। দৃষ্টিতে এত প্রেম! তনু ছাড়া জীবন অচল! কখনও বলছেন, তাহলে তুই এইবার একটু গান গা। তনু সঙ্গে সঙ্গে গাইছে, তোমার অসীমে। কখনও বলছেন, এইবার একটু চা খাওয়া। তোর হাতের চা তুলনাহীন। কখনও বলছেন, এইবার একটু শুয়ে পড়। তনু এক রাউন্ড ঘুম দিয়ে উঠছে।
আজ্ঞাপালনের এমন অপূর্ব দৃষ্টান্ত খুব কম দেখা যায়। তনু বলেছিল, গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটা এইরকমই হওয়া উচিত। শিষ্য গুরুর সঙ্গে মিশে যাবে। তার আলাদা কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। তোমার বাবা, তাই তুমি বুঝতে পারো না, এমন একজন মানুষ হয় না লাখে একটা। মেঘের মতো প্রেম।
গুরু কৈলাসকে জিগ্যেস করলুম, মেঘের মতো প্রেম জিনিসটা কী! তনু বলেছে।
ভালো বলেছে। মেঘ যখন বৃষ্টি ঢালে, সারা দেশ ভেসে যায়। মানুষ চেষ্টা করলেও পারবে না। পিচকিরি দিয়ে, শাওয়ার দিয়ে কতটা জায়গায় জল দেওয়া যায়? সামান্য জায়গায়। বৃষ্টির জল মাটিতে পড়ামাত্রই জীবন। পিনপিন করে গাছপালা বেরোতে লাগল। চারপাশ সবুজে সবুজে সবুজ। পৃথিবীতে মেঘের ভালোবাসা বৃষ্টি হয়ে ঝরে। মেঘ কিছু চায় না। নদী-পুকুর সব ভরভরন্ত করে দেয়। বীজের ঘুম ভাঙায়। নিজে ফুরিয়ে যায়। আকাশ ছাপিয়ে যখন বৃষ্টি নামে তখন। কোনও ফাঁকা মাঠে কী নদীর ধারে একেবারে একা গিয়ে দাঁড়াবি, দাঁড়ালেই বুঝতে পারবি কী আবেগ! কী কোমল আলিঙ্গন! গাছের তলায় দাঁড়িয়ে পাতায় পাতায় শুনবি বৃষ্টির গান। শুনতে পাবি কবিতা। তোর তনুশ্রী যে কোনও দিন কবি হয়ে যাবে।
অনেক রাতে যখন ঘুম আসে না, তখন তাকিয়ে দেখি, রুগির বিছানায় তনু একপাশে আড় হয়ে সেবা করছে। মৃদু স্বরে বলেছে, মাস্টারমশাই খুব কষ্ট হচ্ছে! কী করি বলুন তো!
কী করবে মা, আনন্দ শেয়ার করা যায়। যন্ত্রণা নিজেকেই ভোগ করতে হয়। শেয়ার করা যায় না। ম্যান শুড সাফার অ্যালোন। গভীর রাত। সবাই গভীর ঘুমে, তুমি শুধু একা জেগে বসে আছো তোমার যন্ত্রণা নিয়ে। সহ্য করার চেয়ে বড় সাধনা আর কিছু নেই।
আপনি একটু শোবার চেষ্টা করুন। আমি আস্তে আস্তে সুড়সুড়ি দিয়ে দিই।
ওতে কিছু হবে না মা, তুমি এইবার একটু শুয়ে পড়ো।
শেষ রাতে ঘুম ভেঙে গেল। মেঝের বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখি তনু হাঁটু গেড়ে হাত জোড় করে বসে আছে প্রার্থনার ভঙ্গিতে। ভোরের নরম আলোয় যেন একটা পাথরের মূর্তি বসে আছে। ভোরের নদী, ঘুম ভাঙা অরণ্য, বাসা থেকে ওড়ার চেষ্টা করছে সাদা একটা পায়রা, নদীর জলে। স্নানে নেমেছেন কোনও বৈষ্ণব, জল ভাঙার চুনচুন শব্দ। পুকুর ঘাট ছেড়ে একটা হাঁস ঢেউ কেটে কেটে চলেছে এপার থেকে ওপারে। এই সবই হল পবিত্র পৃথিবীর দৃশ্য।
স্তব্ধ হয়ে তনুর প্রার্থনা দেখতে দেখতে মনে হয়েছিল, আমি খুব নীচের তলার মানুষ। যার কাছে দীক্ষা নেওয়া উচিত তাকে আমি কুকুরের মতো কামনার জিভ দিয়ে চাটার চেষ্টা করছি। আমি একটা দ্বিপদ জন্তু।
পৃথিবীতে কত রকমেরই না মানুষ আছে! একজন অষ্টাবক্র লোক, পাড়াতেই থাকে। যাওয়া আসার পথে প্রায়ই দেখা হত। হাঁটার ধরনটা ছিল গোরিলার মতো। কৈলাস বলত, কোত গরদান তাংপিছানি, দোনো হ্যায় বজ্জাতকি নিশানী। বড়বাজারে ব্যবসা। গায়ে অফুরন্ত তেল ডলে চান করেন। রোজ রাতে রাবড়ির হাঁড়ি হাতে বাড়ি ফেরেন। কোনও অনুষ্ঠানে চাঁদা চাইতে গেলে আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখে একটা টাকা ছাড়েন। ধরা আর ছাড়া অর্থনীতির একমাত্র কৌশল। ধরার সময় যতটা তৎপর, ছাড়ার সময় ঠিক ততটাই শ্লথ। তবেই মানুষের অর্থভাগ্য খোলে। কৈলাস ভদ্রলোকের নাম রেখেছিল বজ্ৰবাঁটুল। স্ত্রী খুব সুন্দরী। সেই কারণে আমরা বলতুম, বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্টের বাড়ি। মাঝে মাঝে আমাদের প্ল্যান হত, বজ্ৰবাঁটুলের কারাগার থেকে কেমন করে ওই বন্দিনী সুন্দরীকে উদ্ধার করা যেতে পারে। পয়সা দেখে বিয়ে দিয়েছে মেয়ের বাপ। এইরকম অসম মিলন সহ্য করা যায় না। ভদ্রমহিলাকে দেখলে আমরা বলতুম, ক্যাপটিভ লেডি।
বজ্ৰবাঁটুল কারও সঙ্গে কথা বলতেন না। বাড়িতে কারওকে আপ্যায়ন করতেন না। ভয় ছিল, বউ যদি পালায়। সিনেমা যে কোনও সময় মানুষের সর্বনাশ করতে পারে। সেই বজ্ৰবাঁটুল হঠাৎ মমাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে পড়লেন আমাকে দেখে।
শুনলুম, মাস্টারমশাইয়ের খুপ খারাপ একটা অসুখ করেছে!
ঠিকই শুনেছেন, হারপিস জোস্টার।
ভেনার্যাল ডিজিজ।
ভেনার্যাল নয়, ভাইরাল ডিজিজ।
ওই হল, একই ব্যাপার। ওঁর মতো চরিত্রের মানুষের এই হল! ঘোর কলি। তা শুনলুম ঘরসংসার ছেড়ে এসে সেবা করছে বিপ্লববাবুর মেয়ে। ব্যাপারটা কী বলল তো। যে বাড়িতে আইবুড়ো। একটা ছেলে, সেই বাড়িতে আইবুড়ো একটা মেয়ে রাত কাটাচ্ছে, এও তো আর এক ভেন্যারাল। ডিজিজ। তোমাদের ফ্যামিলির আর কোনও প্রেস্টিজ রইল না। তোমার ঠাকুরদার নামে চুনকালি পড়ল। বাড়িতে দ্বিতীয় কোনও মহিলা নেই। রাতের পর রাত। ভাবতেও আমার কেমন লাগছে। ভদ্রলোকের পাড়া। বেশ মজায় আছো, কী বলল।
প্যাঁচার মতো হাসছে লোকটা। কথার মধ্যে থলথলে ইঙ্গিত। বেশ আনন্দ পাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল মারি এক ঘুসি। নীচের দাঁতটা ফেলে দিই। কোনওরকমে নিজেকে সংযত করে বললুম, কেন নোংরা কথা বলছেন?
