অসুখ জিনিসটা যেমন খারাপ, আবার তেমনই উপকারীও। রোগশয্যার ধারে প্রেম দানা বাঁধে। তপস্বী পিতা একদিন সকালে আবিষ্কার করলেন তাঁর প্রশস্ত পৃষ্ঠদেশে মুক্তোর মালা তৈরি হয়েছে। আড়াআড়ি বেল্টের মতো। অসহ্য যন্ত্রণা। জ্বরও এসে গেল। তিনি তাঁর হোমিয়োপ্যাথির জ্ঞান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেও চিকিৎসার জন্যে বন্ধু অ্যালোপাথ বিজয়বাবুকে ডাকতে বললেন। তিনি পরীক্ষা করে বললেন, ভোগাবে। ভাইরাল ইনফেকশন যে গো। এর নাম হারপিস জোস্টার। দেখছ না, বেল্টলাইক ফরমেশন। পার্ললাইক কম্পোজিশন। রেস্ট অ্যান্ড অ্যাবসলিউট রেস্ট।
হল কেন? আমার তো অসুখ করার কথা নয়।
কেন নয়?
আমার মন খুব স্ট্রং, দুশ্চিন্তা করি না। আমার শরীরের ক্ষয় খুব কম।
এটা ক্ষয় ব্যাধি নয়। ভাইরাস ইনফেকশন। ইনফেকশন মানে ইমিউনিটির অভাব। তার মানে শরীর উইক। তার মানে মন দুর্বল। তার মানে? মাঝখানে প্রশ্ন দু-পাশেদুজন। ডাক্তার ও রোগী। তার মানে এজিং। বয়েস বাড়ছে।
তা তো বাড়ছেই। সে আর কী করা যাবে। সকলেরই বাড়বে।
ডাক্তারবাবু একটা ইনজেকশন দিয়ে তলপিতলপা গুটিয়ে চলে গেলেন। সংসারে সেবা করার মতো কেউ নেই। কর্তার স্ত্রী অনেক আগেই জীবন নাটক শেষ করে চলে গেছেন। একমাত্র।
ফলটিই সম্বল। ডাক্তারবাবু একটা লোশন দিয়ে গেছেন। তুলোয় ভিজিয়ে সাবধানে লাগাতে হবে। তাহলে একটু আরাম পাবেন। লাগাচ্ছি। ভয়ও করছে, যদি অসাবধানে লেগে যায়।
প্রশ্ন করলেন, বিরক্তি বোধ করছ?
বিরক্তি বোধ করব কেন?
সেবা জিনিসটাই তো বিরক্তিকর।
আমার কাছে নয়।
জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতীত ভাবছেন। যার সেবা করার কথা, তিনি নেই। অসুস্থ হলে স্ত্রীর অভাব বোঝা যায়। স্ত্রীর কাছে যতটা সহজ হওয়া যায়, অন্যের কাছে ততটা সহজ হওয়া যায় না। এই সময় তনুশ্রী এসে গেল। কী হয়েছে বুঝতে যতটুকু সময় গেল, তারপর আমার আর কিছু করার রইল না।
এক-একটা মেয়ের ভেতর সেবা থাকে। পরকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। আলাদা। মশলা দিয়ে তৈরি। একই ওয়ার্কশপ থেকে বেরলেও মেটিরিয়াল আলাদা। ঝাঁ করে একবার বাড়ি চলে গেল, ফিরে এল একটা ব্যাগ নিয়ে। শাড়ি, শায়া, ব্লাউজ, চিরুনি, তোয়ালে ইত্যাদি নিয়ে। টাকা এল না, হিরে এল না, একটা মেয়ে এল, মনে হল পৃথিবীতে সত্যযুগ এসে গেল। সীমাহীন আনন্দ। মরা গাঙে বান ডাকল। ঘরেতে ভ্রমর এল।
রান্না করার একজন ঠাকুর ছিল। মনে হয় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের রাঁধুনি। সব রান্নারই এক স্বাদ। ভাত কখনও শক্ত, কখনও পিণ্ডি। খেতে বসে গাইতে ইচ্ছে করত, কেন চোখের জলে। ভিজিয়ে দিলেম না। একটু অন্যমনস্ক না হলে মুখে দেওয়া দুঃসাধ্য হত। ঠাকুর! এটা কী?
রুই মাছের দমপোক্ত।
ঠাকুর এটা কী?
মোচার কোফতা কারি।
সব একরকম। হড়হড়ে তেল, ভড়ভড়ে গন্ধ। মুখে দিলেই মনে হবে মরে যাই। যে কোনও আসামীকে খাওয়ালেই স্বীকারোক্তি বেরিয়ে আসবে। ধোলাই দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
তনু রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভালো রান্নার সুগন্ধে বাড়ি ভরে গেল। তনুর মাস্টারমশাই সেই রোগযন্ত্রণার মধ্যেই বললেন, বহুকাল পরে অতীত ফিরে এল। মা যখন রাঁধতেন ঠিক এইরকম সুবাস বেরত। সামান্য ভালো।
মেঝেতে তোশক বিছিয়ে তনু বসল। রাত ক্রমশ এগোচ্ছে। মাস্টারমশাই স্যুপ খেয়েছেন। প্রশংসা এখনও ফুরোয়নি। পা মুড়ে কোলের ওপর হাত জুড়ে বসে আছে, তনু যেন ধর্মকথা শুনতে বসেছে। সামনে পড়ে আছে হ্যামলেট। পড়া আর পড়ানো দুটোই হবে। সময়ের দাম। কত। একটুও নষ্ট করা চলবে না। যা গেল তা চিরতরে গেল। আর ফিরবে না। একদিন বয়েস বেড়ে গেল, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেল আরও একদিন।
আমরা তক্তপোশে বসে দৃশ্যটা দেখছি। তনুকে বোন ভাবার চেষ্টা করছি অনেকক্ষণ ধরে। ভয়ংকর একটা অঙ্কর সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলেছে সেই সন্ধে থেকে। খাতার তিনটে পাতা ভরে গেছে। সংখ্যায়। সমাধানের সন্ধান মেলেনি। খাটের ওপর যিনি বসে আছেন তাঁর কাছে গেলে নিমেষে হয়ে যাবে জানি। একবার মাত্র তাকাবেন। পেনসিলটা হাতে নেবেন। তিন লাইনে উত্তর বেরিয়ে আসবে। হিয়ার ইজ ইয়োর অ্যানসার। সো সিম্পল, ধরতে পারলে না। আমার মাথা আর গদর্ভের মাথায় কোনও তফাত নেই। মস্তিষ্কের ভাঁজ মনে হয় কম কম। জটিলকে সরল করতে পারে না, তার ওপর রণে ভঙ্গ দেওয়া স্বভাব। অঙ্কের ফাঁকে ফাঁকে তনুর দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। কেমন বসে আছে লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে। পিঠের দিকটা খুব সুন্দর। চওড়া ভারি কাঁধ। খোঁপা। সুগঠিত গলা। বোন হলে সর্বনাশ হয়ে যেত। তনু আমার প্রেমিকা। অঙ্কের মাথা না থাকতে পারে, প্রেমের মাথা বেশ ভালো। অঙ্কে ঢোকার ক্ষমতা নেই, হৃদয়ে ঢোকার ক্ষমতা আছে।
দুজনে হ্যামলেটে বিভোর। কত রকমের ব্যাখ্যা। মাঝে নেসফিল্ড সাহেব আসছেন গ্রামার নিয়ে। শেলি, কিটস, বায়রন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ঢুকে পড়েছেন। গোটা ইংল্যান্ডের কবিকুল ঘরে। জন ডন, মার্লো। ইতিহাস আর সাহিত্য পাশাপাশি চলেছে। স্মৃতি থেকে বেধড়ক উদ্ধৃতিতে তাক লেগে যাচ্ছে। যে-কথা প্রায়ই বলেন সেইটাই মনে হয় ঠিক। ব্রহ্মচর্যে মেধা বাড়ে। বীর্য থেকেও জঃ, ওজঃ থেকে মেধা।
আমার বন্ধু-কাম-গুরু কৈলাসের কাছে প্রবলেমটা ফেলেছিলুম। তনুর এমন অপমানজনক মেধা হল কী করে। ওই মেধার জন্যে নিত্য আমাকে অপমান সইতে হয়। ক্রমশই আমি ছাগলের। স্ট্যাটাসে নেমে যাচ্ছি। কৈলাস বলেছিল, মেধা কেন হবে না। মেয়েদের তো বীর্যই নেই। ক্ষয়েরও কোনও প্রশ্ন নেই। মেধা-নাড়ি নিয়েই জন্মায়। সেই কারণেই তো মা সরস্বতী। বাবা সরস্বতী হল না কেন! বিদ্যার এলাকাটাই হল মেয়েদের। বীণা বাজাবে, কথাকলি নাচবে, সাহিত্য-শিল্পে পারদর্শী হবে। খনার কথাই ভাব না। শ্বশুরমশাই হেরে গেলেন। অ্যাস্ট্রোনমি, অ্যাস্ট্রোলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, পলিটিকস সব মেয়েদের। বিদ্যা শব্দটাই তো স্ত্রীলিঙ্গ। ছেলেরা মাটি কোপাবে, মোট বইবে, গাড়ি চালাবে, কল চালাবে, ফুটবল খেলবে, আড্ডা মারবে। এর জন্যে লজ্জায় অধোবদন হওয়ার তো কোনও কারণ দেখি না। আমরা তো মা সরস্বতীকে পুজো করি। তনু হল জ্যান্ত সরস্বতী। পুজো করবি, পায়ের বুড়ো আঙুল ডোবানো চরণামৃত পান করবি। এতে লজ্জার কিছু নেই।
