প্রেমের সঙ্গে গান আসে। যেমন সর্দির সঙ্গে জ্বর। সেই সময়কার হিট গান শোনো কথাটি শোনো অভিমানে যেও না চলে। তোলো, তোলো, ও মুখ ভোলা কেন লাজে নীরব হলে। আর একটা ছিল, মোর প্রিয়া হবে এসো রানি, দেব খোঁপায় তারার ফুল। সারাদিন এইসব গান হু হু হুঁ করতুম। সবুজ আরও সবুজ, নীল আরও নীল। প্রেমযমুনায় হয়তো বা কেউ ঢেউ দিল রে। রাতে বিছানায় শুয়ে মনে হত, উঃ কী সুখ, ফুলের শয্যায় শুয়ে আছি রাজকুমার। হাতে পক্ষীরাজ খচরমচর করছে। দূরে দূরে বহুদূরে রাজপ্রাসাদের মিনারে, খুপরিঘরের গবাক্ষে একটি মুখ। রাজকুমারী বসন্তবালা। এক-একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে যেন হাভানা চুরুটের ধোঁয়া। স্কাইলার্ক। গম্বুজে বিরহের কাতরানি কাতরাচ্ছে। আমি মোগল রাজকুমার। আমার পিতা হরিশঙ্কর উচ্চ বিদ্যালয়ের আদর্শবাদী, পিউরিটান শিক্ষক নন, মোগল বাদশা। দাক্ষিণাত্য বিজয়ে গেছেন। সাড়ে সাতশোয় সংসার চালাবার টাকড়ানো দুশ্চিন্তা নেই। কলের মুখে করপোরেশনের অনর্গল জলধারার মতো জীবিকার মকরমুখ দিয়ে অর্থের ধারা নামছে। ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর তক্তাপোশ হাতির দাঁতের পালঙ্ক হয়ে উঠছে। লাল সিমেন্টের মেঝে হয়ে গেছে ইতালিয়ান মার্বেল। জানালায় জানালায় চিকনের পরদার ফুরফুরে পাহাড়ি বাতাস। দূরে কোথাও, দূরে দূরে সানাই বাজছে দরবারিতে। আগামীকাল সকালে আমাকে আর টিউশানিতে যেতে হচ্ছে না। প্রতাপবাবুর পাঁঠা ছেলে ঘাড় কাত করে বসে আছে টেবিলে। ঠোঁটে কচি কচি গোঁফের রেখা। হাফপ্যান্ট খুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে ঊরুস্তম্ভ। সোঁটা সোঁটা লোম। বিচ্ছুর মতো দুটো চোখ। প্রতাপবাবুর দুঃস্বপ্ন। মাস্টার পিটিয়ে আই এ এস করে দাও এই অ্যাসটাকে। পঁচিশ টাকার বকবকানি। নাদুর। দোকানে সপার্ষদ এক কাপ চা আর একটা ওমলেটের ব্যবস্থা। খানিক কান ফাটানো আলোচনা ঋত্বিক ঘটক, নেহরুর বিদেশ নীতি, কাফকার মেটামরফোসিস, সুচিত্রা সেনের সাতপাক, বড়ে গোলামের বালম, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রানার, সোবার্সের সেঞ্চুরি, মিত্তির বাড়ির আরতি রোজ কেন এত রাতে বাড়ি ফেরে, অমরের নতুন কবিতা, বিমলের আর্মিতে ইন্টারভিউ, চুলে কাট। বউদির বোনের হৃদয়হীনতায় সত্যেনের দেহত্যাগের সংকল্প।
সব যেন অতীতে ফেলে আসা কোনও জীবনের স্মৃতি। সুখের বিছানায় শুয়ে আছি রাজকুমার। এই পাড়ারই আর এক বিছানায় রাজকুমারী। মাঝে একের চার মাইল অন্ধকার রাতের ব্যবধান–দশ-বারোটা বাড়ি, তিন-চারটে দোকান। রাজকুমারী কমলা রঙের শাড়ি পরে সাদা চাদরে পাশ ফিরছে সবুজ মশারির ভেতর। একটু সর্দি হয়েছে। নাকটা ফোঁস ফোঁস করছে। ছোট্ট কপালের দুটো পাশ টিপ টিপ করছে যেখানে কাব্যের ভাষায়, চূর্ণ কুন্তল অবাধ্য হয়ে আছে। আষ্টেপৃষ্ঠে সর্দি জড়ানো নায়িকাদের মনে হয় প্রেমের জারক রসে কাচের বয়ামে ফাল্গুনের টোপাকুলের মতো জরে আছে। বুকের কাছে সাঁই সাঁই শব্দ বলছে, ভালোবাসি ভালোবাসি।
চোখ বুজে পড়ে আছি। মান্ধাতার আমলের তোশক। জায়গায় জায়গায় ডেলাপাকানো তুলল। ওয়াড়ের একটা জায়গা ছেড়া। তার মধ্যে থাকে আমার ক্ষুদ্র সঞ্চয়। দু-দশ টাকার নোট। চিত হয়ে শুলে মাথার ওপর বনেদি বাড়ির ছাদ। দু-এক জায়গার প্লাস্টার খসে গিয়ে টালি বেরিয়ে পড়েছে। কবে খুলে কার মাথায় পড়বে নিয়তিই জানেন। এ সবই হল প্লেন লিভিং অ্যান্ড হাই। থিংকিং-এর উদাহরণ। শুয়ে শুয়ে ভাবতে ভালো লাগে, পৃথিবীটা কী-সুন্দর! বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর যাকে ভালোবাসি, সে কাছে না থাকলেও নাড়াচাড়া করা। তার হাতে হাত ঠেকেছে। চোখে চোখ রেখেছি। এখনও অনেক কিছুই বাকি। এই বাকিটুকু কল্পনা। বাস্তবে এখনও দেখার ছাড়পত্র মেলেনি। যে ঘরে শুয়ে আছি, একটা হলঘর। সেই দূর কোণে আর একটা খাট। পাশে একটা টেবিল, চেয়ার। টেবিলল্যাম্পের আলো। তপস্বী এক মানুষ লেখাপড়ায় ডুবে আছেন। অসীম জ্ঞানসমুদ্রে একটা ডিঙি ভাসছে। কত উপদেশ সন্তানকে! আলোর বৃত্তে পতঙ্গের মতো ঘুরে ঘুরে উড়ে উড়ে মরো না। ফার্স্ট ডিভিশন, ফার্স্ট ক্লাস, ডক্টরেট। সম্মানের জীবিকা। নিরাপত্তা, সুখ। কে শুনছে! একটি বুকের আঁচল সরিয়ে কল্পনার চোখে দুধের মতো সাদা দুটি থলে বিস্ময়। মাথা রেখে কানপাতা। ধকধক শব্দ। গলার কাছে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ। অন্ধকারে তরল দুটি চোখ। উত্তপ্ত নিশ্বাস। চিকন একটা হারের শীতল স্পর্শ। ফিশফিশ কণ্ঠস্বর, এ কী হচ্ছে! করছ কী তুমি! আমার হাত পৃথিবী পরিভ্রমণে মরিয়া! ডেভিড লিভিংস্টোন। ডার্কেস্ট আফ্রিকা। ভিকটোরিয়া ফলস। মানুষের হাত। চিতার কাঠ ধরে, গোলাপের বৃন্ত ধরে, নুয়ে পড়া ডাল থেকে বাতাবি হেঁড়ে। স্কুলের নগেন পণ্ডিতমশাই, উঁচু ক্লাসে যখন পড়ি, মন ভালো থাকলে সামান্য আদিরসাত্মক হতেন। নায়িকার দেহসুষমার বর্ণনায় বাতাবির উপমা টানতেন, কোরক। থেকে ফল থেকে অলাবু। বর্ণনা বিশদ হত। শরীরে পুল। সেদিন আমরা ফুটবলটা ভালো খেলতুম। রাতে গভীর নিদ্রা। স্বপ্নে ক্লিয়োপেট্রা!
বুঝলে, নিষ্ঠাই বড় কথা। লেগে থাকার ক্ষমতা। অনুশীলন। নিজেকে ছাঁকতে ছাঁকতে ঝিনুকের পেটের জলের মতো পরিশ্রুত করা গেল। একেশ্বরবাদী। কারও দিকে তাকাই না। ভদ্র। বাজে বকি না। বাজে কাজে সময় নষ্ট করি না। শ্রীচৈতন্যের প্রেম, বুদ্ধের হৃদয়, শঙ্করের মেধা। জমি তৈরি। প্রেম ফেল করলে বৈরাগ্যের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া যায়। হয় সংসার, খাট, বিছানা, সানাই, নয় শ্মশান। বলো হরি, বলো হরি।
