চল্লিশ বছর আগে এইসব ভাবিনি। পঁচিশে পঁয়ষট্টির ভাবনা আসবে কেন। তখন তো। মোড়কখোলা যৌবন। তাজা চানাচুরের মতো মুচমুচে। বেঁচে থাকার ড্যাম্প লাগেনি। বন্ধুকে বন্ধু মনে হয়, প্রতিবেশীকে আত্মীয়। মানুষকে মানুষ মনে হয়। বাঘ, সাপ, শেয়াল, ছুঁচো, বাইসন, বিছে মনে হত না। ঝকঝকে দেয়াল, ঝলমলে আলো, টলটলে বউ। সে আবার প্রেম করে বিয়ে। কেলেঙ্কারি কাণ্ড বইকি! চল্লিশ বছর আগে উপন্যাসের পাতা ছিঁড়ে সিনেমার পরদা ফুড়ে। অনুশাসনের বাঁধ ভেঙে প্রেমের জোয়ার আসেনি। ব্যাভিচার ছিল, প্রেম উঁকি মারছিল, তবে বিয়ে হত না। অভিভাবকদের এক থাপ্পড়ে প্রেম চটকে যেত। বেশির ভাগ ঘায়েল হত মেয়েরা। তাদের
সরিয়ে নেওয়া হত। গৃহবন্দি, নজরবন্দি। তাড়াতাড়ি ছেলে দেখে বিয়ে দেওয়া হত। প্রেমের মতো পাপ আর নেই। প্রেম করে বিয়ে? মামার বাড়ি? আমরা তোমার বিয়ে দেব, দেখে-শুনে। সম্বন্ধ করে। ছেলে দেখব, ঘর দেখব, পেশা দেখব। বিয়ের পর মশারির ভেতর যত পারো প্রেম করো, রাত এগারোটার পরে, গুরুজনরা শুয়ে পড়লে, তার আগে কখনওই নয়। প্রেমের কথা বলবে ফিশফিশ করে। কেউ যেন না শুনতে পায়। আই লাভ ইউ বলে ধিতিং ধিতিং নেচো না। ললেস লাভার হলে ঠান্ডা করে দেব। মানে সাইলেনসার লাগানো রিভলভার। মাঝরাতে স্বামী-স্ত্রী প্রেমের কথা বলবে চুপিচুপি। মোড়ের মাথার মাঝরাতের উন্মাদ কুকুরের মতো চিকার ছেড়ো না।
আমার প্রেম ফুল প্রেম ছিল বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। হাফ প্রেম। প্রেমের মতো। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাইনি, ইলোপ করিনি প্রেমিকাকে। পেটানিও খাইনি। কোনও রাইভ্যালও ছিল না। আমাদের পাড়ারই মেয়ে। আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল। আমার বাবাকে কাকাবাবু বলত। ইংরেজি, অঙ্ক আটকে গেল আমার পণ্ডিত পিতার কাছে তালিম নিত। আমাদের বাড়িতে তার খুব সুখ্যাতি ছিল। আমি কতটা গবেট বোঝাবার জন্যে তার উপমা টানা হত। ইনটেলিজেন্ট, ভেরি শার্প। চোখা মেয়ে। এমন কথাও শুনতে হত, লেখাপড়ায় ও একদিন তোমার কান কেটে ছেড়ে দেবে। তারপরে একটা উপসংহার হত, হবে না কেন! মেয়েদেরইতো যুগ আসছে, গান বাজনা-নাচ-ছবি আঁকা-লেখাপড়া সব একসঙ্গে সামলাতে পারে মেয়েরা। ডিভেশন আছে, সিনসিয়ার, সিরিয়াস। কমপিটিটিভ পরীক্ষায় মেয়েরা মাস্টার্স ডিগ্রিতে মেয়েরা ফার্স্ট। তোমরা ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান করে যাও। লজ্জা হওয়া উচিত। পায়ের ধুলো নাও। প্রার্থনা করো, মানুষের মতো একটু বুদ্ধি দাও মা। এ লজ্জা রাখি কোথায়, বোভাইন ব্রেন ইন এ হিউম্যান ক্রোনিয়াম।
হিংসে হত, রাগ হত। এত সুখ্যাতি কীসের। বাবার সামনে টেবিলে বসে মাথা নীচু করে অঙ্ক কষছে এক মনে। ঘাড়ের কাছে এলো খোঁপা। বিপরীত দিকের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়েছে চুলে। চকচক করছে। ঢালু কপাল। বড় বড় চোখের পাতা। ধারালো মুখ। মোলায়েম রং এর শাড়ি। গোল গোল হাত। অঙ্ক না পারি ভালোবাসতে তো পারি।
প্রেমে পড়ে গেলুম। একতরফা প্রেম। পেছন থেকে দেখি, পাশ থেকে দেখি। মুখে কিছু বলি না। প্রেমকে স্পর্শ করতে হয়। খুব সাবধানে এগোতে হয়, ছোট্ট নিরীহ, কালো পিপড়ের মতো। হাত বেয়ে, পা বেয়ে, ঘাড় বেয়ে উঠতে হয়। ডুমো মাছির মতো ভ্যানভ্যান করলে হয় না। বাবা হয়তো উঠে গেছেন, কি সেইদিনের মতো অফিসে চলে গেছেন, সে বসে বসে পড়ছে, আমি তখন খুব সেবা করার চেষ্টা করতুম। জল এনে দিচ্ছি, পেনসিলের শিস বেড়ে দিচ্ছি, গরম তেলেভাজা এনে খাওয়াচ্ছি। আপত্তি করত না। সেবা নিত। তার মানে, ওষুধ ধরেছে। প্রেমেও অ্যালোপ্যাথি, হোমিয়োপ্যাথি আছে। ধাত বুঝে। যদি বেড়ে যায়, মানে রেগে যায়, তার অর্থ এই নয় যে ফেঁসে গেল। হোমিয়োতে প্রথমে বাড়ে তারপরে কমে।
নির্লজ্জ না হলে প্রেম হয় না। মান-সম্মান বোধ নিয়ে অফিসের বড় কর্তা হওয়া যায়, প্রেমিক হওয়া যায় না। চোরের মতো দুর্বল জায়গায় রাতের অন্ধকারে সিঁদ কেটে প্রথমে মাথাটা গলাতে হয়। ছেলেগিরি না ফলিয়ে আমি দাসভাবে তার উপাসনা করেছিলুম। ম্যায় গুলাম, ম্যায় গুলাম। অত বড় একটা শিবঠাকুর, যাঁর পাওয়ারের কোনও সীমা ছিল না, রেগে গেলে নটরাজ, দক্ষের যজ্ঞ, দক্ষযজ্ঞ করে দিলেন যিনি, যাঁর দলে নন্দী-ভৃঙ্গি, হাতে ত্রিশূল, গলায় বিষধরের লকেট, তিনি হয়ে গেলেন চিত, বুকের পাটায় মা কালী। পদতলে পড়ে ভোলা। এই হল সারেন্ডার। মেয়েদের পায়ে পড়তে হয়। আমাদের বাড়িতে সেকালে কাপড় বিক্রি করতে আসত ফিরিঅলা। পিঠে কাপড়ের বোঝা। সামনে একটু ঝুঁকে আছে। হাতে একটা লোহার সরু ডাণ্ডা। সেটা হল গজকাঠি। নিঃশব্দে চোরের মতো কুঁজো হয়ে ঢুকল। সেই যে ঢুকল বেরোবার আর নাম নেই। নিস্তব্ধ দুপুর। ঘুঘুর বিশ্রম্ভালাপ। কর্তারা কাছারিতে। ঠান্ডা লাল মেঝেতে ছত্রাকার শাড়ি। মেয়েরা ঘিরে বসে আছে। রঙের বাহারে চিত্তজয়। মেয়েদের অন্তরে সিঁদিয়ে গেছে শাড়িওলা। প্রেমের ফিরিঅলাকেও এই কায়দাতেই ঢুকতে হয়। দুর্গাজয় বরং সহজ মেয়েদের মন জয়ের চেয়ে।
আমার ফ্রেন্ড কৈলাস বলেছিল, বর্ষাকালে ময়ূর দেখেছিস? আমি দেখেছি শান্তিনিকেতনে। সবুজে সবুজ। সাদা ফুল, হলুদ ফুল, মাধবী, কুন্দ, গুলঞ্চ, বকুল। ময়ূর হঠাৎ পেখম খুলল। আহা! সে কী দৃশ্য রে ভাই! অবিশ্বাস্য সুন্দর। ময়ূরকণ্ঠী রঙের শিহরন। গায়ে কাঁটা দেয়। ময়ূর নাচছে। ঘুরে ঘুরে। নেচেই চলেছে খড়খড়ে পায়ে। শুধুমাত্র একটি ময়ূরীর জন্যে। ধৈর্য চাই, নিষ্ঠা চাই, সাধনা চাই। ধর তক্তা মার পেরেক নয়। চা তৈরির কায়দা। একফুটের জলে, দু চামচে দার্জিলিং, ঢাকা। ঘড়ি ধরে পাঁচমিনিট ধ্যান। কাপে ঢালো। সোনালি তরল, ভুরভুরে গন্ধ, পরিমাণ মতো দুধ, চিনি। এর নাম প্রেম। রুটি সেঁকা দেখেছিস? চাটু থেকে উনুনে। ফোঁস করে ফুলল। এই ফোলাটা প্রেম। বেশিক্ষণ থাকবে না ফোলাটা থেবড়ে যাবে। এই থেবড়ানো অবস্থাটা হল দাম্পত্য জীবন। ওপর-নীচ এক। বুকে পিঠে সেঁটে গেল। এই হল থিয়োরি। এইবার প্র্যাকটিস।
