বিলাস লাফিয়ে ওঠে—আমার অত সময় নেই। ক্লাবে যেতে হবে। ওই বামুনদির সঙ্গে কথা বলো।
—ও বুড়িমানুষ রান্নায় ব্যস্ত থাকে।
—আমার সঙ্গে রাত্তিরে বোলো।
—বাবা, রাত্তিরে কি কথা বলার মতো অবস্থা থাকে তোমার! কীসব ছাইপাঁশ খেয়ে আসো। তারপর আমাকে এমন পাগলের মতো জড়িয়ে ধরো। আমার বাপু তখন যেন কেমন ভয় ভয় করে। ইচ্ছে করে তোমার চেহারাটা তখন কেমন হয় একবার দেখি।
—সারাদিন নিষ্কর্মার মতো বসে থেকে দিন দিন যাচ্ছেতাই অশ্লীল হয়ে যাচ্ছ তুমি।
—কেন যা ঘটে তা মুখে বললেই বুঝি অশ্লীল হয়ে যায়!
—তোমার সঙ্গে তর্ক করার সময় আমার নেই।
বিলাস বেরিয়ে গেল। আরতি ডুবে গেল চিন্তার অন্ধকার রাজ্যে, বিলাস চলে গেল ক্লাবে।
* * *
–এসো এসো বিলাসচন্দ্র, আজ এত দেরি?
—আর বলো কেন ভাই, ঝামেল কি একরকম! উনি ঠিক বেরোবার মুখে বললেন, আবদারই বলতে পারো—এসো, পাশে বসে একটু গল্প করি।
বন্ধুরা হো হো করে হেসে উঠল।
—আরে তুমি বলেই ভাই এইসব বেয়ার করো। একটা অন্ধ মেয়েকে সারাজীবন বয়ে বেড়াও। তুমি ভাই আদর্শ স্বামী—আইডিয়াল হাজব্যান্ড।
চিত্রা রসিকতা করে বলল—আরে মশাই, কানা মেয়েও মেয়ে। তার চোখদুটো যেতে পারে কিন্তু শরীরের আর পাঁচটা জিনিস দিয়ে সে পুরুষের দাবি মেটাতে পারে। বিলাসবাবু চালাক লোক, সব বোঝে।
বিলাস বলল—ওর চোখদুটো গিয়ে একদিকে বেশ ভালোই হয়েছে। আগে আমার ওপর ওর একটা দাবি ছিল। এখানে নিয়ে চলো, ওখানে নিয়ে চলো। এই দাও, ওই দাও। এখন আর তা নয়। এখন আমার দয়ার ওপর নির্ভর করে আছে। ভয়, পাছে আর একটা বিয়ে করে ফেলি।
বন্ধুরা একদফা হাসলেন। বিলাসের কথাটা তাঁরা রসিকতা ভাবলেন বোধহয়। আরতির নির্জন গৃহকোণের দর্শন এইসব চক্ষুষ্মানদের কাছে উপেক্ষিত। এখানে সবাই চোখ দিয়ে দেখে, মন। দিয়ে উপভোগ করে। এখানে প্রলোভন আর আনন্দের ছড়াছড়ি। এই জগতে রোজ রোজ বিলাস অবগাহন করে। ইন্দ্রিয় ভরে নেয় উত্তাপে। তারপর ফিরে যায় তার গৃহকোণে। সেখানে প্রস্তুত আছে নারী তার উত্তপ্ত যৌবনভরা দেহ নিয়ে। নাই বা থাকল তার দুটি ডাগর চোখ। রাতের গভীর অন্ধকারে বিলোল কটাক্ষের কী-ই বা প্রয়োজন! কে শুনতে চায় তার সারাদিনের চিন্তা অথবা গভীর দার্শনিক কথা? পৃথিবীর মানুষ তাকে নামিয়ে আনে। প্রয়োজনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে। সেখানে সবাই ধৃতরাষ্ট্র, সেখানে সবাই গান্ধারী।
গুদোমে গুমখুন
পাল্লার একদিকে সুখ আর একদিকে দুঃখ। দুঃখের দিকটাই ঝুলে আছে। সুখ যে একেবারেই নেই, বলি কী করে! বেঁচে তো আছি, মরে তো যাইনি। দু-বেলা দুমুঠো জুটছে। মাথার উপরে ছাদ আছে। চেয়ার আছে, টেবিল আছে। বিছানা আছে। তবে চাদরটা সরাবেন না। তোশকে একটা-দুটো খাবলা দেখতে পাবেন। তুলোর ডেলা দাঁত বের করে আছে। তা হবে না। ফর্টি ইয়ারস ফেইথফুল সার্ভিস দিয়ে আসছে। আমার বউয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেছিল। আমার বউ আমার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে এসেছিল আগে। একদিন পরে একটা লরি চেপে এসেছিল যাবতীয় ফাউ। বউয়ের ফাউ সাধারণত যা আসে। চাইলেও আসে, না চাইলেও আসে। একটা খাটের বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ফুলশয্যার খাট খোলা অবস্থাতেই আসে। মাথার দিক, পায়ের দিক, দুটো সাইড, দু-পিস চালি, আটখণ্ডে ছতরি। পরে ফিট করে নিতে হয়। একমাত্র মড়ার খাটই ফিট হয়ে আসে। এইসব জানা কথা আর জানিয়ে লাভ নেই। অবান্তর সেন্টিমেন্ট। চল্লিশ বছর আগে বয়েস যখন পঁচিশ, কে আর ভেবেছিল মরতে হবে। খাটের সঙ্গে ড্রেসিং টেবিল এসেছিল, একটা লোহার আলমারি, তাগড়া একটা ছোবড়ার গদি, লেপ, তোশক, বালিশ। মনে আছে, সাইলেনসার ফাটা লরিটা যখন বিকট শব্দ করে আসছিল আমি তখন নতুন ধুতি, কোরা গেঞ্জি পরে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলুম। ঢ্যাঙা আলমারিটা দুলছিল বিজ্ঞের মতো। যেন কথা বলছিল, হুঁ হুঁ বাব্বা, আমি আসছি। খাঁজে খাঁজে, ভাঁজে ভাঁজে, পাটে পাটে ভরবে জীবনের আবর্জনা। ধুতি, শাড়ি, জামা, প্যান্ট, শাল, সোয়েটার, কার্ডিগান। লকারে কিছু গয়না। নগদ দু একশো, ইনশিয়োরেনসের পলিসি, বার্থ সার্টিফিকেট। পাল্লাটা যতবার খুলবে, ধড়াস শব্দ। জীবনের ওইটাই জাতীয় সংগীত। বেশ আছ। বেশ আছ, হঠাৎ ধড়াস। শ্বশুরমশাই একটা ইজি চেয়ারও দিয়েছিলেন। কেন তা জানি না। হয়তো ওই ত্রিভঙ্গের ভাষায় বলতে চেয়েছিলেন, বাবাজীবন, টেক ইট ইজি। সারাজীবন একটা বুটিদার এঁচোড়কেই তো আলিঙ্গন করতে হবে। সারফেসটা রাফ। আঠা আছে। তেল মেখে ছাড়াতে হবে। তেল হল ধৈর্য, সহনশীলতা। আর মেজাজের গরমমশলা দিয়ে ভালো করে কষতে পারলে বেশ সুস্বাদু। বাবাজীবন, টেক ইট ইজি। ছোবল মারবে, তবে মরবে না, নেশা হবে। তখন এই ত্রিভঙ্গে দেহভার এলিয়ে দিয়েও আরাম। পাবে।
সেই সব জিনিস চল্লিশ বছর ধরে রয়েছে। এখন অবশ্য দাঁত বের করে আছে। প্রাচীন হয়েছে তো। রং, পালিশ চটে গেছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় মুখ সুপার ইম্পোজ করলে মনে হয় পক্স হয়েছিল। কালো কালো দাগ। দিশি কাচের শেষ অবস্থাটা এইরকমই। তবে আয়না জিনিসটা খুব সহজ নয়। ঘোর দার্শনিক। আত্মদর্শন করায়। মানুষ সব দেখতে পায় না। নিজের মুখ দেখতে পায় না। আয়না দেখায়। যুবকের পালিশ করা মুখ, প্রৌঢ়ের তোবড়া মুখ, বৃদ্ধের বিদায়ী মুখ। শেষ অবস্থায় ফেড আউট। আয়না আর কিছু দেখাবে না, প্রয়োজন নেই। তুমিও যাচ্ছ, আয়নাও যাচ্ছে।
