অসহ্য জ্বালায় আরতি চিৎকার করে উঠল।
বিলাস বাথরুম থেকে জিগ্যেস করল কী হল?
—শিগগির এসো, আমার চোখে কী পড়েছে!
—কী আবার পড়ল। জ্বালাতন।
বিলাস কাজ সেরে ঘরে এল—কই কোথায়? আরে এ তো কার্বলিক অ্যাসিড। কী সর্বনাশ!
—চোখ দুটো জ্বলে যাচ্ছে। কী হবে গো! একবার দেখোনা।
একবার দেখোনা! সাত তাড়াতাড়ি ওখানে কী করতে গিয়েছিলে? নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। কোথায় চা খেয়ে তাড়াতাড়ি বেরোব।
-না না, তুমি চলে যাও। দেরি হয়ে যাবে তোমার।
—চোখে জল দাও।
আরতি হাতড়ে হাতড়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। বিলাস ব্যস্ত হয়ে পড়ল সাজগোজ নিয়ে। ধোপদুরস্ত ফাইন জামাকাপড় চকচকে জুতো, রুমালে সেন্ট।
আরতি হাতড়ে হাতড়ে ফিরে এল। জল দেওয়ার ফলে জ্বালা আরও বেড়ে গেছে। কপালের উপর চামড়া পুড়ে কুঁচকে গেছে।
–কমল? বিলাস কোঁচা ঠিক করতে করতে জিগ্যেস করল। আরতি দাঁতে দাঁত চেপে বলল, অনেকটা। যন্ত্রণায় তখন আর তার মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না।
নারকেল তেল লাগিয়ে দাও, আর চোখ বুজে চুপ করে সারাদিন শুয়ে থাকো। আমি চললুম, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
বিলাস বেরিয়ে গেল তার পিকনিকে।
* * *
সন্ধে পেরিয়ে রাত নামল। তারায় ভরা আকাশ তখন ঝিমঝিম করছে চারপাশে। বিলাস ফিরে এল। সারাদিনের হই-হুল্লোড়ে আরতির কথা তার মনেই ছিল না। বাড়ির সামনে আসতেই পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন,
—এই যে বিলাসবাবু, আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল।
বিলাস অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভদ্রলোক ধীরে ধীরে গুছিয়ে বললেন,
—আপনি চলে যাওয়ার পর, আপনার বাড়িতে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। মানে আপনার স্ত্রী তাকের ওপর থেকে কী পাড়তে গিয়েছিলেন এমন সময় তাঁর চোখে অ্যাসিড পড়ে যায়। আমার স্ত্রী। গিয়েছিলেন আপনার বাড়িতে। তিনিই প্রথম খবরটা জানতে পারেন। তারপর আমরা সবাই মিলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেছি।
বিলাস হতভম্ব হয়ে প্রশ্ন করল—আমি চলে যাওয়ার পর ঘটেছে?
—হ্যাঁ। আপনার স্ত্রী বললেন ঠিক আপনি বেরিয়েছেন আর সেই সময়…
—ও।
—আপনি একবার দেখে আসুন। ডাক্তার বলছিলেন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। আর একটু আগে আনলে হয়তো চোখদুটো বেঁচে যেত।
বিলাস আবার ফিরে চলল যে পথে এসেছিল সেই পথে। একটা খালি ট্যাক্সি আসছিল, উঠে বসল। হাসপাতালের বিরাট হলঘর, সারি সারি বিছানা। বিচিত্র রোগের পসরা সাজিয়ে রোগীরা অপেক্ষা করে আছে। প্রত্যেকের স্বতন্ত্র চিন্তা আর বেদনার কুয়াশায় ঘরের আলো কেমন যেন ম্লান আবছায়া হয়ে গেছে।
বিলাস টিনের চেয়ারটা সরিয়ে এনে আরতির বিছানার পাশে বসল। তার কপালে আর চোখদুটোতে পুরু ব্যান্ডেজ বাঁধা।
—কে এলে?
বিলাস নীচু গলায় বলল—আমি! এখন কেমন আছ?
—ওই আছি এক রকম। আরতির মুখে ফিকে হাসি। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল— বোধহয় অন্ধ হয়ে যাব। তখন কী হবে বলো তো?
—কী আবার হবে! দেখতে পাবে না।
আরতি বিলাসের জবাব দেওয়ার ধরন দেখে চুপ করে রইল। কিন্তু অজস্র চিন্তা তাকে আবার সবাক করে তুলল।
—এমন হবে জানলে তোমাকে শেষবারের মতো ভালো করে একবার দেখে নিতুম। আর তো তোমাকে দেখতে পাব না। কী গো? চুপ করে রইলে? ভাবছ বোধহয় অনেক খরচ হয়ে যাবে তোমার। এই হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধ?
বিলাস যেন একটু চমকে উঠল—না না, কী যা-তা বলছ! তাড়তাড়ি ভালো হয়ে ওঠো।
—ভালো হয়ে উঠলেও তোমার কোনও কাজেই তো আমি আর লাগব না। আমি তো অন্ধ হয়ে যাব।
—সে দেখা যাবে।
—তুমি বরং আর একটা বিয়ে করো।
—হ্যাঁ, ওসব এই নির্ভর আশ্রয়ে থেকে কল্পনা করতেই ভালো লাগে। একটা বিয়ে করেই হিমসিম! আবার আর একটা করে না খেয়ে মরি।
—আমি না হয় ভিক্ষে করে খাব।
—ওসব তোমার মনের আশঙ্কা। আমার মনটাকে যাচাই করে দেখছ। করলে কি তোমার সত্যি ভালো লাগবে?
—কেন লাগবে না? তুমি সুখি হও এই আমি চাই।
–বাজে বোকোনা, চুপ করে শোও।
—আমার বোধহয় মরে যাওয়াই ভালো। এ জীবন আর কী কাজে লাগবে?
—ভালো হতে পারে, কিন্তু তুমি করবে না। যাক আমি এখন চলি। আবার কাল আসা যাবে।
—একবার কাছে সরে এসো না, একটু হাত দিয়ে তোমাকে দেখি।
—না না, ওসব ছেলেমানুষির কোনও মানে হয় না।
বিলাস চলে এল। আরতির দীর্ঘ হাসপাতাল জীবন বিলাসের অমনি ছাড়া ছাড়া সহানুভূতিহীন আসা-যাওয়ার মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে গেল। বিলাসের হাত ধরে সে ফিরে এল তার ঘরে। কত দীর্ঘ পরিচিত পরিবেশের মাঝে শুরু হল অপরিচিত জীবন।
বিলাস কখন আসে কখন যায় আরতি টের পায় না। কেবল গভীর রাতে বিছানায় তার উপস্থিতি আরতি বুঝতে পারে। তখন আরতির জগৎ আবার ফিরে আসে ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে। তখন মনে হয় সে পৃথিবীতেই আছে, পৃথিবীর কামনা-বাসনাময় অতি পরিচিত ভোগরাজ্যে। কিন্তু অন্য সময়। মনে হয় সে যেন পৃথিবীর বহু দূরে। অস্পষ্ট শব্দ আর জীবনের কলরব যেন বিগত জীবনের স্বপ্ন! চোখ দিয়ে যা দেখা যায় না, মন দিয়ে তার নাগাল পেতেই দিন কেটে যায়।
আরতির কাছে আরতির জীবন মরে গেছে। কিন্তু বিলাস বেঁচে আছে। সে যেন নতুন করে জীবন পেয়েছে। তার সব ইন্দ্রিয়ে যৌবনের জোয়ার খেলছে। বাইরের রূপ-রস-গ্রাহ্য জগতের সঙ্গে তার গভীর আত্মীয়তা। তাই আরতি যখন মাঝে মাঝে বলে,
—আজ একটু বোসোনা গো আমার পাশে। দুটো কথা বলি।
