—ও ওরই মধ্যে প্যাকেট খুলে দেখা হয়ে গেছে! আর হিংসেয় জ্বলতে আরম্ভ করেছ!
—খুলে দেখতে যাব কেন? ওই তো দেখাই যাচ্ছে ছেড়া প্যাকেটের ফাঁক দিয়ে।
—বাইরে ভদ্রসমাজে মিশতে গেলে ফরসা ভালো জামা-কাপড় না পরলে মান থাকে না, সে বুদ্ধি তোমার আছে?
—পরো না, কে বারণ করেছে। কিন্তু তোমার তো আট-দশখানা কাপড়। আর আমি বললেই বলো—এমাসে বড় টানাটানি। আসছে মাসে…তার মানে আমায় পরীক্ষা করতে চাও। আজ কতদিন সিনেমা দেখিনি! কতদিন একটু ভালো খাইনি। তুমি তো রোজই বাইরে বেশ ভালো ভালো খেয়ে আসো।
বিলাস আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল—সারারাত তুমি কোঁদল করো। আমাকে এখন ঘুমোতে দাও সারাদিন খাটুনির পর।
ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। তারার আবছা আলোয় আরতির ছায়ামূর্তি জানালার ধারে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল।
—তাহলে তুমি আমাকে খেতে দিলে না আজ, বেশ।
আরতি অন্ধকারেই ভাতের হাঁড়িতে এক ঘটি জল ঢেলে দিয়ে এল।
হঠাৎ পাশের বাড়িতে সকলে এক সঙ্গে সজোরে কেঁদে উঠল। আরতি তাড়াতাড়ি জানালার ধারে এসে দাঁড়াল। বিলাস বিছানায় একটু উশখুশ করে অবশেষে জিগ্যেস করল, —কী হল ও বাড়িতে?
—জিতেনবাবুর বউ ভুগছিলেন। বোধহয় এক্ষুনি মারা গেলেন। ওই তো বাড়ির সামনে ডাক্তারের গাড়ি দাঁড়িয়ে। আহা এই সেদিন বিয়ে হয়েছিল।
—ও। যাক ভদ্রলোক বেঁচে গেলেন। আবার একটা বিয়ে করলেই হল। জানালাটা বন্ধ করে দাও।
—কেন, থাক না খোলা।
—না, ওসব প্যানপ্যানানি রাতদুপুরে ভালো লাগে না।
আরতি জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে ওপাশের জানলার ধারে সরে গেল। তার মনটা কেমন যেন ধু-ধু হু-হু করছে। ফুটফুটে সুন্দর বউটা এই তো কেমন চলে গেল। জিতেনবাবু তো প্রাণের চেয়ে ভালোবাসতেন শোনা যায়। কই ধরে রাখতে পারলেন?
ওপাশের বড় তিনতলা বাড়ির জানালায় আলো জ্বলজ্বল করছে। ওই ঘর থেকে হঠাৎ তবলার তেহাই আর ঘুঙুরের ঝমঝম শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রের ঐকতান।
–কী কী? বিলাস অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
—ওই তিনতলা বাড়িটায় সেই সিনেমার নাচিয়ে মেয়েটা থাকে না। আজ শনিবার, দেখো না বাড়িটার সামনে কত বড় বড় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কত বড় বড় লোককে যে মেয়েটা নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে।
—জানালাটা বন্ধ করে দাও।
—থাক না, বেশ হাওয়া আসছে।
—না ভদ্রপাড়ায় ওসব বেলেল্লাপনা চলবে না। বন্ধ করো, বন্ধ করো।
আরতি জানলাটা বন্ধ করে সরে এল। ঘরের ভেতরে মৃদু কান্না আর সংগীত একই সঙ্গে ভেসে বেড়াতে লাগল।
—নাও, একবার আলোটা জ্বেলে চট করে খেয়ে নাও।
—নাঃ আজ আর খেতে ভালো লাগছে না সত্যি বলছি। তাছাড়া ভাতেও জল ঢেলে দিয়েছি। আজ শুয়ে পড়ি। আরতি পা গুটিয়ে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ল।
—আজ সারাদিন ভয়ানক ঘোরাঘুরি গেছে।
—কেন অত ঘুরলে? আরতি বিলাসের কপালে হাত রাখল।
—আর বোলো কেন? মাথাটা একটু টিপে দাও না।
আরতি নিঃশব্দে মাথা টিপতে লাগল। বাইরের নানারকম শব্দ ঘরে ভেসে আসছে—উচ্ছ্বসিত হাসি, মর্মন্তুদ কান্না, আবার সমের মুখে তবলা ঘুঙুর আর বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত আঘাত। সব পাশাপাশি অত্যন্ত সুস্পষ্ট।
রাত বাড়তে লাগল। ব্র্যান্ডি, মাংস আর প্রবৃত্তি সব মিলেমিশেবিলাসের মধ্যে এক কনসার্ট শুরু করে দেয়। স্বামী হিসেবে আরতির কাছ থেকে তার রাতের সব পাওনা আদায় করে নেয়। ছাড়ে না কিছুতেই রাত গড়িয়ে চলে, অন্ধকার চন্দ্রাতপের তলায়। ক্লান্ত বিলাস এখন ঘুমে অচেতন। আরতির চোখে ঘুম নেই। ভাবনা কেবল সাংসারিক সুখ-দুঃখ আর জীবনস্বপ্নকে ঘিরে পল্লবিত হয়। পরিপূর্ণ একটি সংসারের, শান্তি দিয়ে ঘেরা সুখের একটি সংসারের ছবি যেন সোনার হরিণের মতো তার সামনে দিয়ে পালিয়ে যেতে চায়।
এক সময়ে শেষরাতে হয়তো একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল, বিলাসের ধাক্কায় ধড়মড় করে উঠে বসল।
—নাও নাও ওঠো। মনে নেই আমাকে আজ সকালেই বেরোতে হবে।
আরতি চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে পড়ল। চোখ দুটো তার জ্বালা করছে। শরীরে যেন তার কোনও শক্তি নেই। স্রেফ মনের জোরে চলছে। সে একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
—আজ তো রবিবার।
—হ্যাঁ রবিবার তো, আজ আমাদের ডায়মন্ডহারবারে স্টিমার-পার্টি আছে না!
—আজ আর যেয়ো না। চলো আমরা দুজনে কোথাও ঘুরে আসি। অনেকদিন একসঙ্গে বেরোইনি।
—ওসব বাজে কথা রাখো। চট করে একটু চা করে দাও। বিলাস ব্রাশ করতে করতে মুখ ধুতে চলে গেল।
আরতি চোখে-মুখে একটু জল দিয়ে নিল। চোখ দুটো ভীষণ কড়কড় করছে। মনে মনে ভাবল চোখ দুটো একবার ডাক্তারকে দেখাতে হয়। প্রায়ই মাথা ধরে, একটু পড়াশোনা করলেই জল। গড়ায়, ঝাপসা দেখে। কাল রাতে খোলা জানালার পাশে অতক্ষণ না দাঁড়ালেই হত। ঠান্ডা লেগে গেছে।
এখুনি স্টোভ ধরাতে হবে। বিলাসের চা চাই, ডিমসেদ্ধ চাই, টোস্ট চাই। এখুনি সে বেরোবে। স্টোভ নেড়ে দেখল, তেল আছে, চলে যাবে। স্পিরিটের শিশি খালি। বড় শিশিটা উঁচু তাকে। তোলা আছে। ভালো হাত পায় না। বিলাসের জন্যে অপেক্ষা করতে হলে দেরি হয়ে যাবে। আর দেরি মানেই গালাগাল। পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে দেহটাকে যতদূর সম্ভব উঁচু করে আরতি স্পিরিটের শিশিটা নাগালের মধ্যে পেতে চাইল। হাত লেগে পাশের একটা ছোট্ট শিশি। কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ল। আলগা কাঁচের ছিপি ঠিকরে পড়ল মেঝের ওপর। শিশির তরল পদার্থ তাক থেকে গড়িয়ে আরতির কপালে, সেখান থেকে তার দুচোখে।
