—তুমি যেন কী! এই তো মাত্র তোমার মতো বারোখানাই ভেজেছি। আরতি একটু হাসবার চেষ্টা করল। বড় করুণ আর ফিকে।
—একটু বুঝতে শেখো। সারাদিন যারা মাথার কাজ করে তাদের একটু করে ঘি না খেলে চলে না। যারা বাড়ি বসে থাকে, মাথার কাজ করে না তাদের শাকপাতা যা হোক খেলেই চলে— বুঝেছ?
—সে তো আমি বুঝি। আমার জন্যে আর কবে লুচি ভেজেছি?
—ওই, ওই দেখো। ঠিক বেঁকা রাস্তায় গেলে। মেয়েদের আর কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যায় না। যা পাচ্ছো তা অনেক বাড়িতেই মিলবে না। একটু লুচি খাচ্ছি, অমনি হিংসে! তাও শখ করে নয় নিতান্তই স্বাস্থ্যের জন্যে। আশ্চর্য!
—কী বলছ তুমি? তোমার মন এত নীচু! আমি কী বললুম আর তুমি কী মানে করলে?
—ঠিক বুঝেছি। তোমার মনের কথা আমি বুঝি না! এতদিন ঘর করচি। আরতি আর কথা না বাড়িয়ে, বিলাসকে খেতে দিল। নিজের ভাগে জুটল এক কাপ চা।
—এই দেখো। বিলাস একটু শ্লেষের হাসি হেসে বলল। আরতি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল–কী হয়েছে?
—তোমাকে হাজার দিন বলেছি, এত বড় বড় কাপে পুরো এক কাপ চা দেবার কোনও দরকার নেই। সেই এক কাপ চা!
—ভাবলুম তোমার শরীর খারাপ, তাই একদিন দিয়েছি।
—তোমার দিতে আর কী? রোজগার তো আর করতে হয় না। এদিকে মাসে মাসে চায়ের খরচ জোগাতে আমার জিভ বেরিয়ে যায়।
—ঠিক আছে আমি চা খাওয়া ছেড়েই দেব। তাহলে তোমার খরচ বেঁচে যাবে।
—ওই, কথায় কথায় অভিমান। বাপ-মা তো আর সংসার কী করে চালাতে হয় শেখাননি, খালি নাচতে আর গাইতে শিখিয়েছেন।
—সব দেখে-শুনেই তো বিয়ে করেছিলে।
–সামান্য ভদ্রতাও তো শেখোনি। অনবরত মুখে মুখে জবাব আর তক্ক।
বিলাস বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছিল।
আরতি ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল—তুমি বেরিয়ে যাচ্ছ? এখুনি আসবে তো?
-কেন?
–বাজার ফুরিয়েছে। বাজার না করলে রান্না হবে না।
বিলাস কোনও উত্তর না দিয়েই চটপট করে বেরিয়ে গেল।
***
শনিবার শনিবার জোর আড্ডা জমে। নাটুকে দল ভাড়া করা মেয়ে এনে রিহার্সাল দেয়। বিলাস সটান সেখানে গিয়ে হাজির হল। বন্ধুরা হইহই করে উঠল, —আরে এসো এসো, ঠিক সময়ে এসেছব্রাদার। পাঁচটা টাকা জলদি ছাড়ো দেখি।
—কী হবে টাকা?
—আরে ব্রাদার টাকাতে কী না হয়!
চিত্রা পার্ট মুখস্থ করবার ফাঁকে একবার আড়চোখে বিলাসের দিকে তাকাল। তারপর একটু সরে এসে বলল,টাকায় কী হবে আমার কাছে শুনুন।
–বলুন। বিলাস একগাল হেসে একেবারে যেন গলে গেল।
—আজ শনিবার জানেন তো?
—খুব জানি, ঘাড়ে যা বারবেলা চেপেছিল।
-ও, তাই নাকি?
—হ্যাঁ, শেষে পালিয়ে এসে বাঁচি।
—ও হো, বউদি বুঝি সিনেমার আবদার ধরেছিলেন? যাক শুনুন, আজ শনিবার, সবাই চাঁদা দিন। একটু ভোজের ব্যবস্থা করা যাক।
—উত্তম প্রস্তাব। তা পাঁচ টাকাতেই হবে তো?
–দশ টাকা দিলে আরও ভালো হয়।
—তা নিন না। বিলাস এক কথায় ঝট করে দশটাকার একখানা নোট বুকপকেট থেকে বার করে চিত্রার হাতে গুঁজে দিল।
—হুর-রে। থ্রি চিয়ার্স ফর বিলাসচন্দ্র।
চিৎকারে ঘর ফেটে গেল।
বিলাস সিগারেট ধরিয়ে এক কোণে ব্রিজ খেলতে বসে গেল। দেখতে দেখতে খেলা বেশ জমে উঠল। তন্ময় খেলোয়ারদের অলক্ষে ঘড়ির কাঁটা ঘুরে চলল পাকে পাকে।
রাত তখন অনেক। বিলাস বাড়ি ফিরল, লুচি, কষা মাংস আর রাবড়ির ভেঁকুর তুলতে তুলতে।
বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে একটু ব্র্যান্ডি খেয়েছিল। বেশ একটা গোলাপি নেশা হয়েছে। শরীর গরম, মনও বেশ শরিফ। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘরে ঢুকল।
আরতি জানালার গরাদে মাথা রেখে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবছিল, ঘাড় না ফিরিয়েই জিগ্যেস করল—এত রাত হল?
—হ্যাঁ, তা একটু হল। কী করা যাবে?
—ভাত যে এদিকে জুড়িয়ে জল হয়ে গেল।
—যাকগে। আমি আর খাব না। খেয়ে এসেছি।
—সত্যি! ভালো হয়েছে। আজকে যা অখাদ্য রান্না হয়েছে তুমি খেতে পারতে না।
—তাড়াতাড়ি আলো নিভিয়ে দাও, আমি এখুনি শুতে চাই।
–দাঁড়াও, তুমি তো ভালোমন্দ খেয়ে এলে, আমি দুটো পিণ্ডি গিলে নিই।
বিলাস জামা-কাপড় ছাড়ছিল, ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল হ্যাঁ, আমার সংসারের সামান্য জিনিস তো তোমার কাছে পিণ্ডিই হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার তো আর করতে হয় না। তোমাকে। আমি আজ সাফ বলে রাখছি এর চে ভালো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য যদি আর কোথাও পাও, বিনা দ্বিধায় তুমি চলে যেতে পারো।
—ইশ, তুমি কী বলছ যা-তা কথা, ছিঃ ছিঃ।
—ঠিকই বলছি। ভাবো তোমার মনের কথা বুঝতে পারি না। মেয়েদের পরীক্ষার, মেয়েদের সততা আর চরিত্র পরীক্ষার সবচেয়ে ভালো উপায়-দারিদ্র, অভাব!
—তুমি কি তাই আমায় পরীক্ষা করছ? আজ দু-বছর হল একখানা কাপড় দাওনি। আমি ছেঁড়া আর ময়লা কাপড় পরে ঘরে বসে থাকি, কোথাও যেতে পারি না। ও বাড়ির দিদি এসে কত কথা বলে—তোমার স্বামী এত বড় চাকুরে, তুমি এমন ঘেঁড়া ময়লা কাপড় পরে থাকো কেন? আমি কোনওরকমে কাটিয়ে দিই—ভালো কাপড় তোলা আছে দিদি। কাজকম্মে এত ভালো কাপড় পরে আর কী হবে?
—থামাও তোমার মহাভারত। রাত বারোটার সময় ঘ্যানঘ্যান আর ভালো লাগে না।
—থামাব কেন? তুমিই তো আরম্ভ করালে। এই সেদিন তুমি নিজের জন্যে এক জোড়া ভালো কাপড় এনেছ আবার আজ এনেছ আর এক জোড়া। এদিকে আমার কাপড় আর সেলাই করে করে চলছে না।
