লক্ষ্মী সেজেগুঁজে রেডি হল। নীল নাইলনের দড়ি। গোয়াল থেকে উঠোনে এসেছে, একটু পরেই সদর দিয়ে বেরিয়ে যাবে।
‘বাবু আছেন, ডাক্তার বাবু?’ ওই যে রতন এসে গেছে। গায়ে হলদেটে ফতুয়া। নীচের দিকে দুটো পকেট, নানারকম জিনিসে ফুলে আছে। লুঙ্গিটা একটু উঁচু করে পরা। কালো তেল চুকচুকে রং, কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল।
‘এসো, রতন এসো।’ ধরাধরা গলায় রতনকে ডাকলেন।
‘বাঃ, লক্ষ্মী তোলক্ষ্মীই, বেশ চেহারাটি! গরু হলে এই রকম গরু হওয়াই উচিত।’
‘একটা রিকোয়েস্ট রতন, তুমি নজর দিও না।’
‘হাসালেন ডাক্তারবাবু, ও তো এখন থেকে আমার নজরেই থাকবে। আমি চেহারা-ফেয়ারা বুঝি না, আমি বুঝি দুদ। দুদ দিলে খাতির, না দিলে জুতো।’
‘জুতো মানে, গরুকে জুতো পেটা’? ‘না না, হিন্দুর ছেলে গরুকে জুতো মারতে পারি? মহাপাপ! গরু মেরে জুতো তৈরি হবে।’
গান্ধারী
শনিবার। সুতরাং বিলাস সকাল সকাল বাড়ি ফিরেছে। বগলে একটা বড় প্যাকেট। আরতি হাসিমুখে এগিয়ে এল, বাঃ আজ বেশ তাড়াতাড়ি এসেছ। কী আনলে গো? দেখি।
বিলাস আরতিকে এড়িরে ঘরে ঢুকে গেল—তুমি বড় বিরক্ত করো। দেখছ খেটেখুটে আসছি, আগে একটু জিরোতে দাও। এখনও ভদ্রতা শিখলে না!
আরতি লজ্জায় চুপসে গিয়ে বললে—নানা, আমি বুঝতে পারিনি তোমার শরীর খারাপ। ভুল হয়ে গেছে। কিছু মনে কোরো না।
বিলাস ইজিচেয়ারে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। আরতি একটা হাতপাখা এনে আস্তে আস্তে হাওয়া করতে লাগল।
আরতির সঙ্গে বিলাসের বিয়ে খুব বেশিদিন না হলেও বেশকিছুদিন হয়েছে কিন্তু তাদের ব্যবহারে, চালচলনে কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে। স্নেহ, প্রীতি, ভালোবাসা ইত্যাদি তাদের দুজনকে এখনও যেন নিঃশেষে মিলিয়ে দিতে পারেনি। সঙ্কোচের একটা বিরাট ব্যবধান। দুজনকে পৃথক করে রেখেছে।
বিলাস চোখ বুজিয়ে বেশ একটু কর্কশভাবেই বললে, মাথাটা টিপে দাও। স্নেহের দাবি নয়, যেন একটা প্রচণ্ড আদেশ।
আরতি পাখা রেখে মাথা টিপতে লাগল।
—জোরে জোরে। বিলাসের যেন যথেষ্ট আরাম হচ্ছে না।—আরও জোরে। বিলাস ভুরু কুঁচকে আদেশটা ছুড়ে দিল।
আরতি তার রোগা হাত দিয়ে যতদূর সম্ভব জোরে জোরে টিপতে লাগল। পরিশ্রমের বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল কপালে।
বিলাস হঠাৎ খাড়া হয়ে উঠে বসল—তোমার হাত দুটো দিন দিন লোহার খনির কুলীদের মতো খসখসে হয়ে যাচ্ছে। থাক আর দিতে হবে না।
আরতি হাঁপাতে হাঁপাতে খুব আস্তে বলল, কী করব বলো, বাসন মাজতে মাজতে আর জল তুলতে তুলতে হাতের এই অবস্থা হয়েছে। আগে কি এরকম ছিল?
বিলাস তিড়বিড় করে উঠল—তোমার ওই এক কথা। খোঁটা দিতে পারলে আর ছাড়োনা। আমার অবস্থায় কুলোয় না, তাই ঝি রাখতে পারি না। এই কথাটা সময়ে-অসময়ে তুলে খোঁটা দিতে পারলেই তোমার শান্তি
আরতি কাপড়ের আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে, ভয়ে ভয়ে বলল–না না, আমি অতসব ভেবে বলিনি। সত্যি বিশ্বাস করো।
বিলাস কিছুমাত্র নরম না হয়ে বলল—তা ছাড়া কী? থেকে থেকে তোমার ওই এক কথা। আমি বুঝি না ভাবো? তোমার হাত কবে নরম ছিল? মধ্যবিত্ত ঘরের বউ-ঝিরা দেখগে যাও তোমার। চেয়ে ভারী ভারী কাজ করেও কেমন সুন্দর তাদের একটা লাবণ্য আছে। তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। আর তোমার!
আরতি শোনাই যায় না এমনই মৃদুকণ্ঠে বলল— সে কি আমি অস্বীকার করছি? আমি তো বলছি আমাকে দেখতে সুন্দর না। তুমি দয়া করে বিয়ে করেছ।
—কী, কী বললে, এক মুহূর্তও কি বাড়িতে শান্তিতে থাকতে দেবে না? যখনই আসব এই চুলোচুলি। বিলাস রেগে উঠে পড়ল—ঠিক আছে আমি চললুম। ঘরের চেয়ে আমার রাস্তাই ভালো। অনেক শান্তি।
আরতি ভয়ে দৌড়ে এসে পথ আটকে দাঁড়াল নানা, যেয়ো না। এই দেখো তিন সত্যি করছি, আর যদি কখনও কোনও কথা বলি। আমার অন্যায় হয়েছে। তুমি বোসো, চা-জলখাবার খাও।
বিলাস কোনও উত্তর দিল না। একে একে অফিসের ধরাচুড়ো খুলতে লাগল। আরতি ইতিমধ্যে স্টোভ জ্বেলে ফেলেছে। তৈরি হবে লুচি আর আলুভাজা। বিলাস বাথরুমের তোলাজলে চান সেরে ঘরে এল। আরতি একবার আড়চোখে দেখে নিয়ে ভয়ে ভয়ে বললে–তোমার সাবানটা আজকে একটু দেবে? অনেকদিন সাবান মাখিনি।
—কেন, তোমাকে তো ওমাসে একটা সাবান এনে দিয়েছি!
—ওমাসে নয়তো, তারও আগের মাসে।
—ওই একই হল।
—একটা সাবান তিন মাসের বেশি চলে না।
—তোমার সাবানের খরচ জোগানো আমার সাধ্যের বাইরে। একটা জমিদারি থাকলে চেষ্টা করে দেখতুম। তা যখন নেই শুধুই গা ধোও।
বিলাস তার নিজের ভালো শৌখিন সাবান আলমারিতে চাবি দিয়ে রাখল। আরতি দ্বিতীয় আর। কোনও কথা না বলে আপনমনে লুচি ভাজতে লাগল। বিলাস ভালো জামাকাপড় পরে ইজিচেয়ারে এসে বসল। বেশভূষায় সে অতিশয় শৌখিন। মিহি ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি। কানে আতর। মুখে কিছু স্নো এবং পাউডারের প্রলেপ।
ও কী হচ্ছে? বিলাসের আকস্মিক প্রশ্নে আরতি চমকে মুখ তুলে তাকাল।
—কেন তোমার লুচি ভাজছি তো!
কজন খাবে শুনি? ও তো তুমি পঞ্চাশজনের মতো ভেজেছ। তোমার মতো লম্বা হাতে গরিবের সংসার চলে না। কতদিন বলেছি ওই একটিন ঘিয়ে পুরো মাস চালাতে হবে। সারাদিন অফিসে মাথার কাজ। সারা মাস একটু ঘি খেয়ে সামলে নেব, তোমার জন্যে তারও উপায় নেই। ধুমধাড়াক্কা সাতদিনেই সব শেষ করে দেবে দেখছি।
