‘কী হল মানুর মা?’ মাসিমা শাড়ির শোক ভুলে সিঁড়ির দিকে দৌড়োলেন।
মেজোমামা বললেন, ‘দাদা, তোমার ভিটামিন বি কমপ্লেক্স গবায় নমঃ হয়ে গেল। আসল কাটোয়ার ডেঙ্গো ছিল।’
বড়মামা বললেন, ‘নো ক্ষমা, আর ক্ষমা করা চলে না, সেই লাইনটা, অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে—’
আমরা সদলে নীচের উঠোনে নেমে এলাম। মাসিমার পেছনে ঝুলছে কুকুরে চিবোনো আঁচল। পেছনে আমি। আমার পেছনে বড়মামা। বড়মামার পেছনে মেজোমামা।।
লক্ষ্মীছাড়া লক্ষ্মী উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চোখ বুজিয়ে ডেঙ্গোর ঝাড় চিবোচ্ছে। এত চিৎকার, চেঁচামেচি কোনওদিকে কোনও দৃকপাত নেই। নিজের কাজ করে যাচ্ছে আপন মনে। ডাঁটা ঝাড়ের আধখানা চলে গেছে গলায়, বাকি অংশটা ইঞ্চি ইঞ্চি করে ঢুকছে। মাসিমা সেই বাড়তি অংশটা ধরে টানাটানি শুরু করলেন। যতটুকু পারা যায় উদ্ধারের চেষ্টা।
মেজোমামা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ছেড়ে দে কুসি। পারবি না। বোভাইন-টিথের স্ট্রাকচার জানা থাকলে তুই আর চেষ্টা করতিস না। গরুর ওপর আর নীচের পাটিতে ক’টা করে দাঁত, কী ভাবে সাজানো থাকে জানিস?’
মাসিমা বললেন, ‘তোমরা জানো, আমার জেনে দরকার নেই।’ মাসিমা পাতা ধরে টানতে লাগলেন। লক্ষ্মী চিবিয়েই চলেছে। এক ঝটকায় মাসিমাকে ডান দিক থেকে বাঁ দিকে টলমল করে দিয়ে লক্ষ্মী পেছন ফিরে দাঁড়াল। ন্যাজটা মাঝে মাঝে দুলছে। বিরক্তি ভালো লাগছেনা। তার। শান্তিতে কাটোয়ার ডাঁটা চিবোতে চায়। গরুটাকে দেখতে ছবির গরুর মতো। সাদা ধবধবে গায়ের রং। ন্যাজের দিকটা চামরের মতো। ডগাটা কালো। শিং দুটো তেলা। চোখ দুটো বড় বড়, ভাসা ভাসা।
‘বড়মামা, আপনার গরুটাকে ভারী সুন্দর দেখতে।’
‘অতি অসভ্য গরু। একগুয়ে, অবুঝ। গরুর সম্পর্কে আমার ধারণা পালটে দিয়েছে। মানুষের চেয়েও অসভ্য!’ মাসিমা কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। সামলে নিলেও ভীষণ রেগে গেছেন।
‘অনেকদিন তোমাকে বলেছি দাদা, তোমার এই গরু-কুকুর এসব হাটাও। বাড়িতে টেকা যায় না। এ আমাদের কম সর্বনাশ করেছে! আদরে আদরে বাঁদর তৈরি হয়েছে।’
বড়মামা বললেন, ‘আর মায়া নয়, আজই একে বিদায় করতে হবে। মানুর মা, আজই, এখনই তুমি এটাকে নিয়ে যাও।’
‘আমি গরু নিয়ে কী করব দাদাবাবু। আমার নিজেরই থাকার জায়গা নেই। চাল নেই। চুলো নেই।’
‘কেন, তোমার বাড়ির পাশের মাঠে বেঁধে রেখে দেবে। যখন দুধ হবে দুধ খাবে, দই খাবে, ক্ষীর খাবে, চেহারা ফিরে যাবে।’
মেজোমামা বললেন, ‘মাঝে মাঝে লাথিও খাবে। সভ্যতা এতবছর এগিয়ে গেল, গরু কিন্তু সেই গরুই রয়ে গেল। প্যালিওলিথিক গরু, নিওলিথিক গরু আর এই স্পেস এজ গরু বিবর্তনের ধারাটা কত স্লো দেখছ দাদা! আমরা কত অসম্ভবকে সম্ভব করলুম! গরু কোনওদিন ভাবতে। পেরেছিল, তার তরল দুধকে আমরা গুড়ো করে টিনে ভরে ফেলব?’
উঠোনে একটা বাঁধানো বসার জায়গা ছিল, বড়মামা তার ওপর বসে পড়লেন। চুল উড়ছে। কপালের একটা পাশ গোলাপি। ফরসা চেহারায় বেশ মানিয়েছে। মাসিমা ডাঁটা উদ্ধারের আশা। ছেড়ে দিয়ে ভীষণ যেন রেগে গেলেন। সকালে বাজার এসেছে। মানুর মা সব ধুয়ে ধুয়ে রেখেছে। আলু, পটল, উচ্ছে, কুমড়ো, কাঁচালঙ্কা, পাতিলেবু।
‘এই নে সব খা, সৃষ্টি খা, তুই-ই খা’। ঝুড়িসুদ্ধ সব টান মেরে মাসিমা লক্ষ্মীর মুখের সামনে ছড়িয়ে দিলেন।
লক্ষ্মী খুব চালাক গরু, ভেবেছিলুম পটলের সঙ্গে লঙ্কা চিবিয়ে আর একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। লক্ষ্মী জানে কোনটার পর কী খেতে হয়। সে কুমড়োটা মুখে পুরেছে। ডেঙ্গো শাক কুমড়ো দিয়েই রাঁধে। এরপরই হয়তো আলু আর পটল খাবে, সঙ্গে একটা কাঁচালঙ্কা। পেটে গিয়ে হয়ে যাবে আলু-পটলের ডালনা।
মেজোমামা বললেন, ‘শিশু আর গরু বুদ্ধিবৃত্তিতে সমান স্তরের প্রাণী। যা পাবে তাই মুখে পুরবে। যত রকমের অপকর্ম আছে নির্বিবাদে করে যাবে। হ্যাঁ, শিশু আর গরু এক জিনিস, সেম থিঙ্কস, চেহারা ছাড়া সব এক।’
বড়মামা বললেন, ‘তা হলে দেখো, সেই শিশু স্নেহ পায় বলেই মানুষ হয়। গরুর বেলায় উলটো। গরু স্নেহ পায় না, তাই বড় হয়েও গরুর গরুমি যায় না। হ্যাঁরে বাংলাটা ঠিক হল তো?’
‘কী বললে, গরুমি!’ বাঁদর-বাঁদরামি, পাগল-পাগলামি, ছাগল-ছাগলামি, গরু থেকে বোধহয় গবরামি হবে। সংস্কৃত গো শব্দ থেকে উৎপত্তি। গো আর রামি।’
‘আমরা কত স্বার্থপর দেখো? গরু মানেই আমাদের কাছে দুধ, মাখন, ছানা, দই, রসগোল্লা, গব্যঘৃত, ফুলকো লুচি।’
হঠাৎ লক্ষ্মী একটা লাফ মারল। বালতি, ঝুড়ি সব উলটে-পালটে, সেই ছোট্ট উঠোনে টাটু ঘোড়ার মতো গোল হয়ে ছুটতে লাগল। মাসিমা রান্নাঘরে ঢুকে পড়লেন। মেজোমামা দোতলায় ওঠার। সিঁড়ির ধাপে, বড়মামা যে বেদিটায় বসেছিল সেইটার ওপর উঠে দাঁড়ালেন।
দোতলার বারান্দা থেকে আমি বললুম, ‘ওর ঝাল লেগেছে বড়মামা, কাঁচালঙ্কা খেয়েছে।’
‘একটু পরেই রতন আসবে।’
রতনের খাটাল আছে। মাসিমাই রতনের কথাটা বললেন। বড়মামা যেন ধড়ে প্রাণ পেলেন। বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, কুসি! রতনের ওখানে থাকলে লক্ষ্মীটি মানুষ হবে, সঙ্গী পাবে। একটা প্রতিযোগিতার ভাব আসবে। আর পাঁচটা গরুকে দুধ দিতে দেখলে নিজের দুধ দেবার ইচ্ছে হবে।’
মেজোমামা বললেন, ‘ইয়েস, কম্পিটিশন। প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকলে গরু ভালো রেজাল্ট দেখাতে পারবে।’
