বঙ্কিম ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। মন বললে, এ ওম্যান হ্যাজ মালটিসাইডস।
স্বপ্নের দাম
অজয়ের হঠাৎ মনে হল শরীরটা তেমন ভালো লাগছে না। ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বরজ্বর লাগছে। হাই উঠছে। মাথাটা ভার ভার। রগের পাশের শিরা দুটো টিপ টিপ করছে। অফিসে তেমন কাজ ছিল না। বসে থেকে সময় কাটানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করার নেই। অজয় ভাবলে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে একটু বিশ্রাম করা যাক। কাজ করে করে গত তিনমাস শরীরটাকে বড় বেশি খাটানো হয়েছে। বাড়ি গিয়ে এক কাপ গরম চা, একটু গল্পগুজব, রেডিয়ো শোনা, হালকা কোনও বই পড়া, বউয়ের সঙ্গে পারিবারিক কথাবার্তা—এই সবের মধ্যে নিজেকে ফেলতে। পারলে শরীর আপনিই ঠিক হয়ে যাবে। ওষুধের দরকার হবে না। বিশ্রামই হল ওষুধ। একটা মাথা ধরবার বড়ি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল এতক্ষণ। খাবে কি না ভাবছিল। ড্রয়ারে রেখে দিল। বাইরের খোলা বাতাসে মাথাটা ছাড়ে কি না দেখা যাক। শীত না এলেও বেলা ছোট হয়ে এসেছে। তিনটে কি সাড়ে তিনটে হবে। এরই মধ্যে আলো কমে এসেছে। অজয় উঠে পড়ল।
অফিসপাড়ার বিশাল বিশাল বাড়ির আড়ালে বিদায়ী সূর্য তখন হেলে পড়েছে। রাস্তায় ছায়া। নামলেও বড় বড় গাছের মাথায় তখনও রোদ লেগে আছে। বেশ ভালোই লাগছে। উত্তুরে হাওয়া বইছে। বলা যায় না আজ রাতে হয়তো শীত পড়বে। প্রথম শীত তেমন উগ্র নয়, মোলায়েম। পাখাটাখা আজ আর মনে হয় চালাতে হবে না। পাতলা সোয়েটার আর চাদরের কাল এসে গেল। ন্যাপথলিনের গন্ধ আর টারপেনটাইনের শীত শীত গন্ধ।
বাসে-ট্রামে সাংঘাতিক ভিড়। এ শহরে সব সময়েই যেন হুটোপাটি চলছে। সবাই যেন প্রাণের দায়ে শহর ছেড়ে পালাতে চাইছে। মিনিবাসে লাইন পড়েছে। তবে এঁকেবেঁকে এখনও তেমন ময়াল সাপের মতো হয়ে উঠেনি। অজয় লাইনে খাড়া হয়ে গেল। দু-নম্বর মিনিবাসে জানলার। ধারে একটা মনের মতো জায়গাও পেয়ে গেল। অজয় বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। হাত-পা খেলিয়ে আরাম করে। মিনিট পঁয়তাল্লিশের মতো নিশ্ৰুপ শান্তি। রাস্তাঘাটে দোকানপাট দেখতে দেখতে চলো। জানলার ধারে একটা জায়গা পেলে অজয় পৃথিবীর শেষ সীমা পর্যন্ত অনায়াসে চলে যেতে পারে। কুছ পরোয়া নেহি করে।
সামনের আসনে এক ভদ্রমহিলা বসেছেন। সুন্দরীই বলা চলে। সারাদিনের পর অফিস-কাছারি করেও বেশ তাজা আছেন। এইসব দেখলে অজয়ের খুব দুঃখ হয়। যৌবনটা কীভাবেই না চলে যাচ্ছে হু-হু করে। একটা করে দিন যাচ্ছে। একদিন করে বয়েস বেড়ে যাচ্ছে। চুল সাদা হচ্ছে। চামড়া কুঁচকে যাচ্ছে। অজয়ের দিকে এখন আর কেউ ফিরে তাকাবে না। অথচ তাকালে তো। বেশ ভালো লাগে। মনে হয়, আকর্ষণ এখনও কমেনি। আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। শরীরটাকে যদি সময়ের বাইরে রাখা যেত! মনটাকে হয়তো চেষ্টা করলে রাখা যায়। শরীর কিন্তু সময়ের সীমানা ছেড়ে যেতে পারে না। মার খেতে খেতে মার খেতে খেতে একদিন ফরসা। খেল খতম, পয়সা হজম।
মহিলা খোঁপাটি বেশ কায়দা করে জড়িয়েছেন। একটু তুলে বাঁধা। মিনিবাসের আসনের পেছন। দিকটা অস্বাভাবিক উঁচু না হলে, ঘাড় কাঁধ সবই দেখা যেত। এসব যত দেখব যৌবন তত স্থায়ী হবে। ওই জন্যে শাস্ত্রে আছে বার্ধক্যে যুবতি রমণী টনিকের কাজ করে। কোথায় পাবে সেই। টনিক! এই তো, দুরে বসে থাকা, বসে বসে ভাবা। এর বেশি আর কী হবে! এমন যদি হত, যাকেই ভালো লাগে তার সঙ্গে আলাপ হবে। দিনকতক ঘুরে বেড়ানো যাবে। সে-ও তো মনেরই ব্যাপার। অজয়ের যাকে এই মুহূর্তে মনে ধরেছে তার মনে অজয় হয়তো স্থান নাও পেতে পারে! হয়তো কেন? সেইটাই হয়। আহা! তার যদি সম্মােহন বিদ্যা জানা থাকত বেশ হত।
মহিলা ভাড়া দেওয়ার জন্য ব্যাগ থেকে পয়সা বের করছিলেন। অসাবধানে বেশ বড় মতো একটা কিছু পায়ের কাছে পড়ে গেল। দশ পয়সা পাঁচপয়সা নয়, হয় টাকা, না হয় আধুলি। অজয়ের জানা আছে, খুচরো পয়সার ধর্ম হল, পড়েই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। মনে হচ্ছে পায়ের কাছেই তো পড়ল, পড়লে কী হবে, সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল ফোর্থ ডাইমেনশানে। ফোর্থ ডাইমেনশান শব্দটা আজকাল প্রায়ই শোনা যায়। মানুষবোঝাই জাহাজ, বিমান আজকাল রহস্যজনক ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। কোথায় গেল? ফোর্থ ডাইমেনশানে। কে না পড়েছে বারমুডা ট্যাঙ্গেলের বিচিত্র কাহিনি। মহিলার পয়সারও সেই এক হাল হল। পায়ের কাছে নেই। পাশে যে ভদ্রলোক আছেন, তাঁর মহা উৎসাহ। কেন হবে না! একে তো মহিলা, তায় সুন্দরী। সামনে ঝুঁকে, পাশেশরীর ঝুলিয়ে হরেকরকম কসরত করে পয়সা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। মহিলা তাঁর খোঁজার ধরনের মাঝে মাঝে বিব্রত হয়ে পড়ছেন। কারণ তিনি অতি উৎসাহে মহিলার পায়ের কাছে শাড়ি তুলে তুলে পয়সা উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। আমরা যেমন চাদর তুলে খাটের তলা দেখার চেষ্টা করি। মহিলার পা তো খাটের পায়া নয়। এই হল মুশকিল। তিনি যতই বলেন ছেড়ে দিন, আর খুঁজতে হবে না। ভদ্রলোক ততই তাঁর পায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলেন ছেড়ে দিলেই হল, পড়ল তো এখানে, যাবে কোথায়?
অজয়ের খুব হিংসে হচ্ছিল। সে যদি লাইনের একেবারে ডগায় না থাকত তা হলে জানালার ধারে বসে, সে-ও হয়তো ওই মহিলার পাশে গা ঘেঁষে বসার সুযোগ পেত। তখন সে-ও ওইরকম। ডান পাশে, বাঁ-পাশে কেতরে কেতরে পয়সা খুঁজত। তারপর পেয়ে যেত। তারপর হাসি হাসি মুখে মহিলার হাতের তালুতে ফেলে দিয়ে বলত, এই নিন আপনার পয়সা। পাব না মানে? মহিলা অমনি হেসে বলতেন, ধন্যবাদ।
