না, এতে ধন্যবাদ জানাবার কী আছে?
বাঃ, আপনি কষ্ট করে খুঁজে দিলেন।
হে হে এতে আর কষ্ট কী! এর চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট আমি করতে পারি। একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন।
আমি এইটাকেই অনেক কষ্ট, যথেষ্ট কষ্ট বলে মনে করি। নীচু হয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে সিটের তলায় ঢুকে যেভাবে আধুলিটা বের করে আনলেন! কে করত মশাই এত কষ্ট!
আমিই করতুম না আমার জন্যে। যাক গে বলে নেমে যেতুম।
আপনার আঙুলে কত ময়লা লেগে গেছে। নিন, এই রুমালটায় পুঁচুন।
না, এই তো আমার রুমাল আছে। আপনার অমন সুন্দর রুমাল। কেন নষ্ট করব?
নিশ্চয়ই করবেন। আপনার সাদা রুমালে ওই ময়লা পুঁছবেন নাকি? আমার ব্যাগে দ্বিতীয় আর একটা রুমাল আছে। কোনও অসুবিধে হবে না।
তা থাক। যে রুমালে একবার আপনি মুখ পুঁছেছেন, সে রুমালে আমি নোংরা মাখাতে পারব না।
আহা! ঢং। যা বলি শুনুন।
অ্যাঁ, আপনি ঢং বললেন, অহো কী আনন্দ! আর আমি দূরে নেই। একেবারে কাছে। হৃদয়ের পাশে!
হ্যাঁ, তো। আমি লোককে অত পর ভাবতে পারি না। দু-চারটে কথার পরই আপনার হয়ে যায়। কী নাম আপনার?
অজয়।
আমার নাম জয়া।
কী করেন?
চাকরি।
কোথায়?
জি পি ও-তে।
আমি কাজ করি ব্যাঙ্কে। আপনি ম্যারেড?
ম্যারেড। তবে সেরকম ম্যারেড নয়!
তার মানে?
মনের মতো নয় আর কি। তাড়াহুড়ো করে একটা জগাখিচুড়ি। ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। ব্যাচেলারও বলতে পারেন।
আরে আমারও তো ওই একই অবস্থা। আমারও সেই এক খ্যাচাখই বিয়ে। যত গর্জায় তত বর্ষায় না।
মিলবে ভালো, কী বলেন?
তাই তো মনে হচ্ছে। মনের মানুষ কখন যে কীভাবে পাশে এসে বসে! সবই ভগবানের খেলা। কী বলেন?
কোথায় থাকেন?
উত্তরে।
আরে আমিও তো উত্তরেই থাকি। প্রায় কাছাকাছি।
কী ভাগ্য!
এখন তাহলে আমরা কী করব?
আমরা যা খুশি তাই করব, হইহই রইরই।
যাঃ, ওসব আপনি পারবেন না। আপনার বয়েস হয়ে গেছে। কটি ছেলেমেয়ে?
সে তেমন কিছু নয়, হিসেবের মধ্যে না ধরলেও চলে।
তবু শুনি না। লজ্জা কীসের! সব কথা যখন খোলাখুলি হচ্ছে।
ওই এক ছেলে এক মেয়ে।
কে বড়?
ছেলে।
বয়েস কত? এমন কিছু নয়। সবে আর কি
আহা চাপছেন কেন?
এই সাবালক হয়েছে আর কি–
তা হলে?
তা হলে মানে?
আপনি তো বুড়ো। হইহই রইরইয়ের বয়েসই আর নেই। কোমরে বাত, চোখে চালসে, চুলে পাক। রাত জাগতে পারবেন না, প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারবেন না।
ক্যা বলেছে?
আমি বলছি।
বললেই হল! আমি রাত জেগে পড়ি জানেন কি?
জানি। ওইটাই তো বুড়োদের ধর্ম।
যুবকদের ধর্মটা তা হলে কী?
সে-ও আপনি জানেন। যৌবনে তো বিয়ে করেছিলেন।
ও হ্যাঁ হ্যাঁ। বুঝেছি। সে আমি এখনও পারি।
পারলেও আপনি বুড়ো।
তা হলে বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলি, পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
আমরা যদি ধরা পড়ে যাই?
ধরা পড়ব কেন? পড়লেই হল। রোজ বিকেলে তোমার অফিস থেকে তুমি বেরোবে, আমার অফিস থেকে আমি। তারপর গুটি গুটি হেঁটে গিয়ে আমরা ইডেনে একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকব। অনেকক্ষণ, অনেকক্ষণ। যতক্ষণ না মনে হচ্ছে, আঃ খুব হল।
ঝোপের মধ্যে শুধু শুধু বসে থেকে কী হবে?
কী আবার হবে? তুমি আমাকে গল্প শোনাবে, আমি তোমাকে গল্প শোনাব।
কীসের গল্প? ভূতের?
যাঃ, ভুত ছাড়া কি গল্প হয় না?
কিন্তু, ওখানে গিয়ে যদি দেখেন, আপনার ছেলে বসে কাউকে নিয়ে—
তাহলে চিনতে পারব না। সে-ও আমাকে চিনবে না, আমিও তাকে চিনব না।
ধরুন যদি কোনও বদমাইশ এসে সব ছিনতাই করে নিয়ে যায়?
কী আর নেবে? ঘড়িটড়ি সব খুলে রেখে যাব।
যদি পুলিশ ধরে?
বলব আমরা দুজনে বসে আছি তাতে তোমাদের কী অসুবিধা হচ্ছে বাছা?
যদি বলে, তোমরা দুজন কে বাছা?
আমরা দুজন, আমরা দুজন।
তখন কান ধরে থাপ্পড় মেরে ওরা বলবে, বুড়ো খুব রস হয়েছে, কয়েকদিন মামার বাড়ি থাকলেই। রস শুকিয়ে যাবে। আপনার ছেলে বউ যখন জামিনে ছাড়াতে যাবে তখন কেমন লাগবে?
ই হেঃ, সেটা খুব ভালো লাগবে না। তাহলে ইডেনে না বসাই ভালো। পুজোর ছুটিটাকে একটু। বাড়িয়ে আমরা সিমলা চলে যাব। মুসৌরিতেও যেতে পারি। সেখানে আমরা দেওয়াদারের বনে। দুজনে পাশাপাশি বসে থাকব। তুমি গুনগুন করে গান গাইবে। আমি মাঝে মাঝে গলা মেলাব। কোরাস! মাঝে মাঝে পাখি ডেকে যাবে। শীত শীত হাওয়া উঠবে শেষ বেলায়। আমি তখন এমনি করে তোমাকে বুকে টেনে নেব দেহের গরমে!
আরে হেই হেই মশাই। সোজা হয়ে বসুন। নয়তো উঠে দাঁড়ান। তখন থেকে কেতরে পড়ে খুব ঘুম হচ্ছে, ঘুম! আমি কি আপনার বেড রোল? ডান হাত দিয়ে আবার পাশ বালিশের মতো জড়িয়ে ধরা হচ্ছে। অজয় ধড়মড় করে সোজা হয়ে সবল। খুব এক ঘুম লাগিয়েছে যা হোক। শরীরটা ভালো ছিল না। ফুরফুরে বাতাসে চোখ জুড়ে এসেছে কখন! অজয় সামনের আসনের। দিকে তাকাল। কোথায় সেই মহিলা! কোথায় সেই খোঁপার বাহার! পাকা পাকা চুলের এক বুড়ি বসে আছেন, এই এত অল্প বয়সে বুড়ি হয়ে গেলেন! কখন কোথায় সেই সুন্দরী নেমে গেছেন।
কনডাকটার এসে রুক্ষ গলায় জিগ্যেস করলেন, এই যে দাদা, কোথায় নামবেন?
কেন ভাই ষষ্ঠীতলায়।
আরও পঁয়ষট্টি পয়সা ছাড়ুন।
কেন ভাই?
কেন ভাই? ষষ্ঠীতলা পড়ে আছে চার স্টপেজ আগে।
অ্যাাঁ সে কী!
হ্যাঁ সে কী! দিন পঁয়ষট্টি পয়সা।
অজয়ের কী খেয়াল হল, নীচের দিকে তাকাল। পায়ের কাছে ওটা কী? সামনে আর একটু হেঁট হল। একটা আধুলি। সেই মহিলার ব্যাগ থেকে ছিটকে পড়া পয়সা। যাক বাবা, সেই ভদ্রলোক অনেক কারদানি করছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করতে পারেননি। অজয় পঞ্চাশ পয়সা তুলে নিল, নিজের পনেরো যোগ করে বেশি পথ চলে আসার গুনগার দিল।
