বঙ্কিম মেঝেতে সতরঞ্চির ওপর নেমে এল। এটা নিজের পয়সায় কেনা। এখানে সে বুক ফুলিয়ে, তাল ঠুকে মরতে পারে। দেহটাও আমার, সতরঞ্চিটাও আমার। কোনও শ্যালকের সম্পত্তি নয়। মেঝেতে শুয়ে তেমন দেহিক আরাম না হলেও বেশ মানসিক আরাম বোধ করল। ভেতর থেকে তার অন্তরাত্মা বলে উঠল, আরে ইয়ার, তলায় শক্ত জমি মাথার ওপর নীল আকাশব্যস, এর চে ভালো কী আছে। সকাল থেকেই তো পবন আহার করে ওহারী। এ যাত্রা যদি বেঁচে যাও এই শুদ্ধ শরীরের ওপরই আগামী বিশুদ্ধ জীবনের ফাউন্ডেশান স্টোন প্যাঁ প্যাঁ প্যাঁপোর পোঁ করে লে কর। জীবনটাকে ওই প্রতিমা, বালা, বিয়ে, ভাত, শ্রাদ্ধে বরবাদ কোরো না। আমাকে বেরোতে দাও, ফাটতে দাও, ফাটতে দাও, গ্রেট, গ্রেটার, গ্রেটেস্ট হতে দাও।
তুমি হঠাৎ নেমে শুলে কেন? প্রায় দশ ঘণ্টা পরে প্রতিমার কণ্ঠে যেন একটু দরদ।
হাউ হু আর কী? আমার আর হবে না দেরি আমি শুনেছি ওই শুনেছি ওই বাজে, বাজে তোমার ভেরি। আমি শুনতে পাচ্ছি, ডাক এসেছে, চলে আয়। বঙ্কিম কুঁই কুঁই করে বললে।
প্রতিমা আকুল ব্যান্ডেজ করা হাত বঙ্কিমের কপালে রাখল। বঙ্কিম তখন বলছে, তাই তো নেমে এলুম। খাট আর বিছানাটাতো আমার নয়। ওতো চলে যাবে। এখান থেকে বের করার সুবিধে। সতরঞ্জিতে রোল করে খাঁটিয়ায় লাদাই করে দাও।
প্রতিমা নাকটানার মতো একটু শব্দ করল। হাতটা মাথার চুলে স্থির। বঙ্কিম আর একটু অ্যাড। করল, বাড়িটা রইল, কিছু টাকাও রইল। অবশ্য তোমার ভোগে লাগবে না। তোমার ভাইয়েরা দখল করে তোমাকে লাথি মারবে। ছেলেটা আর মেয়েটার জন্যেই ভাবনা। মামাদের ছেলে মেয়ে ধরে, ফাইফরমাস খেটে পাতকুড়োনো হয়তো একটু জুটবে। বড় হলে ফুটপাথ গতি। হা হা, হা। ভগবান।
বঙ্কিমের কথা বলতে প্রকৃতই কষ্ট হচ্ছে। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। তা না হলে ভবিষ্যতের ছবি আরও গাঢ় রঙে রেখায় আঁকার ইচ্ছে ছিল। প্রতিমা ইতিমধ্যে বেশ বার কতক ফোঁসফোঁস করেছে। বঙ্কিম উপুড় হয়ে একপাশে ঘাড় কাত করে চোখ বুজিয়ে শুয়ে আছে। খাও, মাঝরাতে ভ্রাতার বউভাতে হাঁড়ি হাঁড়ি দই খাও। সর্দি হবে না? নিউমোনিয়া হবে। এখন আর কী? আহ্লাদের সময়। বাপের বাড়ি, অসুখ, সেবা, ডাক্তার, বদ্যি, শ্বশুরবাড়ি। তখন বঙ্কিম আছে, গামছা আছে, বঙ্কিমের ঘাড় আছে, শাশুড়ি আছে। প্রতিমার সর্দি নয়। আসলে সে অল্প অল্প কাঁদছে। মনে দুঃখ হয়েছে। বঙ্কিম একটু মৃত্যু-দৃত্যুর কথা বলছে। সাদা থান, শাঁখাহীন হাত, সিঁদুরশূন্য সিঁথি, মাছশূন্য দিন। আহা বড় কষ্ট গো! পঙ্গু হয়েও ঘোষবাবুর মতো পড়ে থাকো বেডসোর নিয়ে।
সেবাটেবা আমার ধাতে নেই। সকাল-সন্ধে দুমুঠো গিলিয়ে দেব। তারপর মা-র দেওয়া জর্দা আর দুখিলি পান মুখে ঠুসে সিনেমা, যাত্রা, হ্যাল্লা, ফ্যালা।
প্রতিমা কানের কাছে মুখ এনে জিগ্যেস করল, এইবার একটু ঘোল খাবে?
ঘোল? ঘোল আর মুখে কেন, এতকাল তো মাথাতেই ঢেলে এসেছ।
আঃ, এই অসুস্থ অবস্থায় বাঁকা বাঁকা কথা বলতে নেই। শরীরে আর কিছু নেই। কয়েকদিন একটু শক্তি করে নাও, তারপর আবার হবে।
ভূতের মুখে রাম নাম। এ যাত্রা যদি টিকে যাই, সন্দেহ আছে, তাহলে সাফ বলে রাখছি তোমার বাপের বাড়িতে জল পর্যন্ত খাব না। সব বিষাক্ত। তুমি যাবে, সন্দেশের বক্স আর উপহারের। মোড়কটি নামাবে। থাকতে হয় থাকবে তুমি। আমি আর ওর মধ্যে নেই। তবে একটা সুবিধে, এমনি ওঁরা কখনওই আদর করে ডাকেন না, এই বিয়ে পালা পার্বণেই জামাইয়ের খোঁজ পড়ে। লাটের টাকায় লাটের মালের আদর হয়ে যায়। উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ।
প্রতিমার দাঁত কিড়মিড় করছিল। অন্য সময় হলে লেগে যেত। কোনওরকমে সামলে নিল। সামলে নিয়ে বললে, বালার শোকটা ভোলার চেষ্টা করো। বালার ডবল আমি বাগিয়ে এনেছি। পরে হিসেব করে দেখো। প্রণামীর কাপড়, যেটা আমাকে দিয়েছে, ষাট-সত্তর টাকা হবে। কালকে প্রেজেন্টেশান যা পেয়েছিল তার থেকে দুটো শাড়ি, একটা লেডিজ রিস্টওয়াচ কেঁপে এনেছি। তাহলে ষাট, আর আর ষাট কত হল?
একশো আশি।
হ্যাঁ, একশো আশি আর ঘড়িটা ধরো দুশো, তাহলে তিনশো আশি। তাছাড়া বিয়ের আগে ছোড়দা এমনি দেড়শো দিয়েছিল।
সেটা তো আবার মেজদার ধার শোধে চলে গেল।
ও হ্যাঁ, তাহলে ফোল্ডিং ছাতাটা ধরো, ষাট-সত্তর টাকা হবে। তারপর একটা বড় স্টেনলেস স্টিলের থালা আর বাটি আটকে রেখেছি। ওগুলোও দেব না।
বঙ্কিমের ভেতরে যেন একটু শক্তি আসছে। দুর্বল ভাবটা যেন কেটে যাচ্ছে। মাথাটা মেঝে থেকে অল্প একটু তুলে দেখল, না, তেমন বোঁ করে ঘুরে গেল না।
প্রতিমা বললে, আমাকে কি তুমি এতই ক্যাবলা ভাবো? তুমি কি ভাবো আমি মাল চিনি না। তোমার সব শালাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। একহাতে যেমন দিচ্ছি, আর এক হাতে তেমনি আদায় করে নিচ্ছি। দু-চার টাকা এদিক-ওদিক হতে পারে। তা-ও ঠিক উশুল করে নেব। মার। পঞ্চত্নের আংটিটা বাগাবার তালে আছি। আর এবার থেকে বলে রাখছি, ভাতে স্টেনলেস নয়, স্রেফ ওই অ্যালুমিনিয়াম।
বঙ্কিম উপুড় থেকে চিত হয়ে বললে, কাঁচকলা দিয়ে ন্যাংলা সিঙ্গি মাছের ঝোল আর সরু চালের ভাত খাব।
প্রতিমা বললে, রাত নটার সময় ন্যাংলা আর পাবে কোথায়? এখন চিঁড়ে-দই দিয়ে চটকে খাও। কাল সকালে দাম বুঝে মাছের ব্যবস্থা হবে। তা না হলে স্রেফ গাঁদাল পাতার পাতলা ঝোল।
