চলে গেলেই পারো! বঙ্কিম ভেংচে উঠল, আহ্লাদী পুতুলের মতো কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে না ঘুরে আঙুলে ওষুধটা লাগাতে দিলেই পারো।
প্রতিমা প্রাণপণে হাতটা ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে বলল, দয়া করে আমার হাতে ওষুধটা লাগাবার চেষ্টা করে তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হবে না। আমার চরকায় আমিই তেল দেব।
ইট ইজ মাই চরকা। তেল আমাকেই দিতে হবে। বারো বছরের ইজমেন্ট রাইট। জমির মালিক আমি। ইউ আর মাই জমিদারি। বঙ্কিম ভীষণ খেপে গেছে। ওষুধ লাগাবেই।
প্রতিমা আপ্রাণ চেষ্টা করে খামচাখামচি করেও যখন দেখলে বঙ্কিমের শক্ত মুঠো আলগা হচ্ছে না তখন একেবারেই প্রাকৃতিক কায়দায় খ্যাঁক করে বঙ্কিমের হাতে কামড় বসিয়ে দিলে। খুব জোরে নয়, অনেকটা কুকুরের আদুরে কামড় কিংবা লাভ-বাইট-এর মতো। সুখের সময় এই কামড়ের আলাদা অর্থ হতে পারত। ঝগড়ার সময় এই সামান্য কুটুকুটু কামড়েরও অন্য মানে। বঙ্কিম হাত আলগা তো করলই না, বরং আরও জোরে চেপে ধরে বললে, অতই সোজা না। কামড়াও, যত পারো কামড়াও, তলপেটে ষোলোটা ইনজেকশান নেব, সে ও-ভি আচ্ছা। তবু দেখব কতটা নীচে তুমি নামতে পারো। যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। ওই দাঁত আমি হাঁ করিয়ে উকো দিয়ে ঘসে ঘসে ফোকলা করে দেব। কড়মড় করে মাংসের হাড় চিবোনো জন্মের মতো ঘুচিয়ে দেব।
প্রতিমা এতখানি হাঁ করে বঙ্কিমের হাতটা ধরেছিল ঠিকই তবে সেটা যতটা ভয় দেখাবার জন্যে ততটা কামড়াবার জন্যে নয়।
বঙ্কিমের মনে হচ্ছিল ফোকলা দিদিমা যেন তার হাতটা পাগলাচ্ছে। প্রতিমারও হয়েছে। মহাবিপদ। কতক্ষণ কামড়ে বসে থাকবে। সে তো আর কচ্ছপ নয় যে মেঘ ডাকলে তবে ছাড়বে। বঙ্কিম ডেডলক অবস্থাটা কাটাবার জন্যে বললে, যত চাপ পড়বে তত রক্ত বেশি বেরোবে। ছেলেমানুষি করার বয়েস আর আমাদের নেই। মাথা ঠান্ডা করো। যে-কোনও এক পক্ষকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। যেহেতু তুমি আহত সেই হেতু পরাজয় তোমারই। আমি তোমার ভালো করতে এসেছি, ভালোরই জয় হয়। ধর্মে, নাটকে, উপন্যাসে, সর্বত্রই এক বিধান।
প্রতিমা বাধ্য হয়েই পাগলাপাগলি বন্ধ করে মুখ সরিয়ে নিল। মুখের লালায় বঙ্কিমের হাত ভিজে। পরাজিত প্রতিমা খাটের ওপর ধড়াস করে শুয়ে পড়ল। এ ছাড়া কী আর করবে! গোহারান। হেরেছে। বঙ্কিম ওষুধ লাগিয়ে দিল। ইশ, বেশ কেটেছে! কয়েকদিন জবরদস্ত ভুগবে। আলমারি খুলে ফাস্ট-এড বক্স থেকে ব্যান্ডেজ বার করে বঙ্কিম দক্ষহস্তে আঙুলে জড়িয়ে দিল। আমার কাজ শেষ। এ টি এস দিতে হবে নাকি? লম্বা বঁটির কাটায় কি আর অমন হতে পারে? হলে বুঝতে হবে ভাগ্য।
বঙ্কিম বাথরুমে ঢুকে পড়ল। পেটটাকে এখন খোঁচাখুঁচি করতে হবে। সলিড পাথরের মতো হয়ে আছে। নাঃ, বয়েস সত্যিই বাড়ছে! সামান্য খাওয়াও সহ্য হচ্ছে না। তলপেটে গোটাকতক ঘুসি চালাল। প্যাঁক প্যাঁক করে বার কতক টিপল। নাঃ পেটও অভিমান করে বসে আছে। নিজের
পেটই কথা শুনছে না। ডিসওবিডিয়েন্ট। পরের বাড়ির মেয়ে কথা শুনবে? গ্রেট এক্সপেকটেশন, বন্ধু। গুমোট পেট নিয়ে কি আর রাস্তায় বেরোনো যায়? বাড়িতে বসে থাকারও উপায় নেই। আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি। যাক, চানটা তো করা যাক।
স্নান সেরে বঙ্কিম ঢকঢক করে কয়েক গেলাস জল খেল। ছচামচ ভাস্কর লবণ। একেই বলে সুখে। থাকতে ভূতে কিলোননা। বাবুরা সব বিয়ে করবেন আর ছাইপাঁশ খাইয়ে মানুষের সুস্থ শরীরকে ব্যস্ত করে তুলবেন। অনেকটা সেই ইললিসিট লিকার খাওয়ার মতো কেস। না খেলে বলবে। বড়লোকি চাল হয়েছে শালার। এইবার আসছে পর পর অন্নপ্রাশন। বড়বাজারের স্টিলের। বাসনের দোকান তো বাঁধাই আছে। আজকাল দোকানে গিয়ে দাঁড়ালেই কাজ হয়ে যায়। মালিক জানে লোকে কী চায়। একটা ছোট থালা, পুঁচকে গেলাস আর বাটি। প্যাক করে দাও। সোনালি রোলেক্স রিবনের বাহার। প্যাকিং চার্জ একট্রা টু রুপিজ বাবু। আবার সেই লুচি, ঘি-ভাত, আঁশটে মাছ, এঁচোড়, টেনে ছেড়া যায় না মাংস, দই, বোঁদে, পাঁপড়, চাটনি, রসগোল্লা! ওয়াক!
খাবার কথা মনে হতেই গা গুলিয়ে উঠেছে। ওয়াক। চার গেলাস জল পেটে ঢেউ খেলিয়ে দিচ্ছে। তার ওপর ভাসমান ভাস্কর লবণ। হিংয়ের ভেঁকুর উঠছে। সংসারেও মিউটিনি। পেটেও মিউটিনি। বড় এক গেলাস লেবুর জল খেতে পারলে হত। কে করে দেবে! বিদ্রোহী প্রতিমার আঙুল ফুলে কলাগাছ। তিনি এখন নতুন চাল চালার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছেন। যত বেলা বাড়ছে বঙ্কিমচন্দ্র ততই কাবু হয়ে পড়ছে। ঘন ঘন ভেঁকুর। ওয়াক ওয়াক করে সব ওয়াক আউট করে পেটের অ্যাসেমব্লি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাথরুম ঘর, ঘর বাথরুম,—ঘণ্টাখানেক এই চলল। ওঃ আই। অ্যাম টেরিবলি সিক মাই লর্ড। সকালের মতো টান টান বুক নেই। গলা দিয়ে চি চি শব্দ বেরোচ্ছে। হায় ভগবান! ক্রমশই কুঁজো হয়ে আসছি। অদ্যই শেষ রজনী মাগো।
ফন ফন করে পাখা ঘুরছে। বঙ্কিম খাটে চিৎপাত। ঘণ্টাখানেক হিসেব রাখতে পেরেছিল। তুমি আঙুল কেটে টেক্কা মারতে চেয়েছিলে। আমি মিনি কলেরা দিয়ে স্কোর করে বেরিয়ে গেলুম! একবারে দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যেয়ো না মানিক। অন্ত-বঙ্কিমকে বঙ্কিমের রিকোয়েস্ট। দিন ক্রমশ বাদুড়ের ডানার মতো ঝুলে আসছে। প্রতিমা আশেপাশে আছে। কাছাকাছি নেই। দুজনের মাঝখানে সোনার বালার গোল ফোকর। স্বর্ণ ব্যবধান। শেষের সেদিন অতি ভয়ংকর। পা দুটো ঠান্ডা হয়ে আসছে। ও খাট আর বিছানাটা তো শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি। এর ওপর মরাটা তো ঠিক হবে না। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা থেকে দাম কেটে নেবে। নেমে শুই বাবা।
