তার বদলে সার্ভিস যা পাচ্ছ চার ডবল।
আরে যাও, মাসে একশো টাকা দিয়ে একটা মেয়েছেলে রাখলে টোয়েন্টি ফোর আওয়ার্স আমার সেবা করত। তাকে হুকুম করা চলত। তটস্থ হয়ে থাকত। তোমার মতো মাথায় চড়ে বসত না। আমার ব্লাডার লিক করে দিত না। যে নৌকোয় চড়ে নদী পার হচ্ছ সেটার তলা ফাঁসাবার জন্যে আকুলিবিকুলি করত না। একে কী বলে জানো, সবোতাজ, অন্তর্ঘাত।
প্রতিমা আধখানা লাউ ধমাস করে আনাজ রাখার চুবড়িতে ফেলে, উঁহু উঁহু করে উঠল। বঙ্কিম আড়চোখে দেখল। আঙুলের মাথা থেকে উঁজিয়ে রক্ত পড়ছে। প্রতিমা উঠে দাঁড়াল। কয়েক ফোঁটা গাঢ় লাল রক্ত মেঝেতে পড়েছে। কুঁচো কুঁচো সাদা নরম লাউ জায়গায় জায়গায় লাল। বঙ্কিম আঙুলটার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, কেটেছ তো! একেবারে অকর্মণ্য। ওয়ার্থলেস টুঁ দি পাওয়ার ইনফিনিটি।
একেবারে অকর্মণ্য! সকাল থেকে কানের কাছে বক বক করে মাথা খারাপ করে দিলে! কী না একটা বালা।
প্রতিমার চোখে জল।
বঙ্কিম আবার অশ্রুজলে বড়ই কাতর হয়ে পড়ে। রক্তের ঊর্ধ্বচাপ ইতিমধ্যেই নামতে শুরু করেছে। আঙুলটার জন্যে এখুনি কিছু করা দরকার অন্তত মানবিক কারণে। বারো বছরের জীবনসঙ্গিনী। রাগ করে কতক্ষণ কথার চাবুক মারা যায়? বঙ্কিম বললে, দাঁড়াও, ডেটল দিয়ে দিই। আগে সাবান দিয়ে ধুই।
থাক থাক, আমাকে আর দরদ দেখাতে হবে না। আমার জন্যে একেই দেউলে হয়ে গেছ! আমি মরলেই তো তোমার জ্বালা জুড়োয়।
প্রতিমা হনহন করে শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। বঙ্কিম মনে মনে বললে, মানুষের মৃত্যু যদি অতই সোজা হত! কত বড় বড় দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন মানুষকে জোড়া লাগিয়ে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, এ তো সামান্য আঙুলটা একটু উসকে গেছে। সুযোগ পেয়ে গেছে, এইটাকেই এখন মূলধন করে একচোট আপারহ্যান্ড নেবে। তারপর ভাবল, দোষ কী? সে যদি বালা নিয়ে সারা সকাল মাতামাতি করতে পারে, প্রতিমা কাটা আঙুল নিয়ে লড়ে যাবে, এ তো খুব স্বাভাবিক।
বঙ্কিম সাবান দিয়ে তেল-হাত ধুয়ে তাক থেকে ডেটলের শিশি নিয়ে শোবার ঘরে যখন এসে ঢুকল প্রতিমা তখন একখানি ন্যাকড়া দিয়ে বাঁ-হাতের আঙুলটা জড়াবার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ন্যাকড়াটা ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে। পাকা কলার মতো ঠোসা ঠোসা আঙুলে কীরকম রক্ত। বঙ্কিম বললে, দাঁড়াও দাঁড়াও, কী-একটা যা-তা ন্যাকড়া ডেটল না দিয়েই আঙুলে জড়াচ্ছে। এখুনি বিষিয়ে উঠবে যে।
ওঠে উঠবে, আমার উঠবে। তোমার তাতে কী?
প্রতিমার কথায় চাবুক খাওয়া লোকের মতো বঙ্কিম টান টান হয়ে গেল। ইশ, বচনের ছিরি দেখো! হারব বললেই হারেগা, খামচে খুমচে মারেগা। বঙ্কিম হু হু করে একটু শীতল হাসির ঢেউ তুলে বললে, আমার কী, তাই না? একটা কিছু হলে তখন কোন সম্বন্ধী দেখবে? কোনও শালা আসবে না। এই শর্মাকেই ডাক্তার-বদ্যি করতে হবে চাঁদু।
তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। তোমার পয়সা ব্যাঙ্কে ডিম পাড়ুক। আমার জন্যে অনেক করেছ। আর করতে হবে না। আমার লজ্জা নেই তাই পড়ে পড়ে মার খাচ্ছি। আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই হাল হত? জেনেই গেছ আমার তো কোনও যাওয়ার জায়গা নেই, তাই অষ্টপ্রহর ধামসে যাচ্ছ। প্রতিমা বঙ্কিমের দিকে পেছন ফিরে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগল।
বঙ্কিম মনে মনে বলল, কান্না তোমাদের হাত ধরা। সারা জীবনের অশ্রুজল ধরে রাখতে পারলে ভারতবর্ষে সেচ সেবিত এলাকা আরও বেড়ে যেত। না, তা কী করে হয়! চোখের জল তো আবার স্যালাইন। সামুদ্রিক মাছের চাষ হতে পারত। হাঙর কিংবা তিমি লাট খেত। তুলো ডেটলে চুবিয়ে এগিয়ে গেল, অফিসের বারোটা বেজে গেল। আচ্ছা ফাঁপরে পড়েছি।
বঙ্কিম তুলো আর শিশি হাতে প্রতিমার পেছন থেকে সামনে এগিয়ে গেল। উত্তরটা ঠিকই দিল। আঙুল কাটতে পারে, তাবলে যা খুশি তাই বলে পার পেয়ে যাবে তা তো হয় না। বঙ্কিম বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার বাবা বেঁচে থাকলে সব হত। তিনি এসে লাউ কুটে দিতেন কারণ মেয়ে বঁটি ব্যবহার করতে জানে না। তিনি থাকলে উনুন ধরিয়ে দিতেন কারণ মেয়ে অন্যের মনে ছাড়া আগুন ধরাতে জানে না। তিনি বেঁচে থাকলে স্বর্গে অপ্সরারা নৃত্যগীত করত, দুন্দুভি বাজাত আর আকাশ থেকে তাক করে এই বাড়ির ওপর পুষ্পবৃষ্টি করত। দেখি আঙুল থেকে তোমার ন্যাস্টি ন্যাকড়াটা সরাও।
প্রতিমা বড় দোকানের শোকেসের ঘূর্ণায়মান প্রদর্শনী চাকতির মতো কিংবা আহ্লাদী পুতুলের মতো আবার ঘুরে গেল। তুলো হাতে ভ্যাবাচ্যাকা বঙ্কিম আবার পেছনে সরে গেল। বঙ্কিম ছাড়বে না। অ্যান্টিসেপটিক লোশন লাগিয়ে নিজের হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে স্বামীর কর্তব্য সে করবেই। এমন কোনও লুপ হোলস সে রাখবে না যার ফাঁক দিয়ে বিবেক বেরিয়ে এসে বলবে, নির্দয়, হৃদয়হীন, পাষণ্ড। প্রতিমাকেও পরে খোঁচা মারার সুযোগ সে দেবে না। বঙ্কিম চক্রাকারে ঘুরে আবার সামনে গেল। প্রতিমা আবার ঘুরে গেল। তিনশো ষাট ডিগ্রির খেলা চলেছে। ঘড়ির কাঁটাও এদিকে ঘুরছে। শেষে আর কোনও উপায় না দেখে বঙ্কিম খপ করে প্রতিমার হাত চেপে ধরল, চালাকি পেয়েছ, না? বুড়ি বয়সে ইয়ার্কি হচ্ছে? জানো আমার সময়ের দাম আছে, অফিস বেরোতে হবে।
প্রতিমা হাতটা ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে বললে, কে তোমাকে আটকে রেখেছে। যাও না। অফিসে, চলে গেলেই পারো!
